সম্পাদকীয় ২

(অ)সাধারণ

আগামী মাসের প্রথম দিন হইতে ভারতীয় জনপথ লালবাতি-মুক্ত হইবে। অর্থাৎ, এ যাবৎকাল যাঁহারা ‘অ-সাধারণ’ হইবার সুবিধাটি পূর্ণমাত্রায় ভোগ করিয়া আসিয়াছেন, তাঁহারা অতঃপর ‘সাধারণ’-এ উপনীত হইবেন। ঘোষণাটি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০১৭ ০০:৪৩
Share:

আগামী মাসের প্রথম দিন হইতে ভারতীয় জনপথ লালবাতি-মুক্ত হইবে। অর্থাৎ, এ যাবৎকাল যাঁহারা ‘অ-সাধারণ’ হইবার সুবিধাটি পূর্ণমাত্রায় ভোগ করিয়া আসিয়াছেন, তাঁহারা অতঃপর ‘সাধারণ’-এ উপনীত হইবেন। ঘোষণাটি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি জানাইয়াছেন, পুলিশ, সেনা ও জরুরি পরিষেবা ব্যতীত কোনও ‘ভিআইপি’-ই আর লালবাতির অধিকারী হইবেন না। লক্ষণীয়, উক্ত ভিআইপি তালিকাটি কম ওজনদার নহে। মাননীয় রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিচারপতি, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা তালিকা আলো করিয়া আছেন। অবশ্য, ইঁহাদের অনেকেই ব্যতিক্রম। দীর্ঘ দিন তাঁহারা লালবাতি-বিরোধী ভাবমূর্তি বজায় রাখিয়াছেন। কাহারও কাহারও অনাড়ম্বর যাপনের বাড়াবাড়িকে লোকদেখানো মনে হইতে পারে। কিন্তু এমন অতিরঞ্জনে দোষ নাই, কারণ লোকশিক্ষার পক্ষে তাহা শুভ। তবে এ হেন ব্যতিক্রমীরা ব্যতিক্রমই। সামগ্রিক ভাবে লালবাতির ব্যবহার কমানো যায় নাই। এখন সেই ব্যবহার একেবারে বন্ধের লক্ষ্যে নির্দেশ জারির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী একটি জরুরি কথাও বলিয়াছেন— সব ভারতীয়ই ভিআইপি।

Advertisement

কথাটি জরুরি, লালবাতি-গর্বী মন্ত্রী-আমলাদের তাহা স্মরণ করাইয়া দিবার প্রয়োজন পড়িয়াছিল। এ কথা তাঁহারা বহু দিনই ভুলিয়াছেন কিনা। ভুলিয়াছেন বলিয়াই যানজটের চাপে যখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে, অসুস্থ ব্যক্তির প্রাণসংশয় হয়, তখন তাঁহারা ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করিয়া গন্তব্যে ছোটেন। অথচ এই মানুষগুলির স্বার্থ রক্ষাই নাকি তাঁহাদের একমাত্র দায়িত্ব। বাস্তবে সেই দায়িত্ব পালনের আগ্রহ অপেক্ষা নবলব্ধ ক্ষমতার আস্ফালন চোখে পড়ে অনেক বেশি। লালবাতি সেই আস্ফালনেরই নামান্তর মাত্র। এবং বিভাজনেরও বটে। বিভাজন পদাধিকারের, ক্ষমতারও। যে মন্ত্রী, নেতা মঞ্চের বক্তৃতায় জাতপাতহীন, অ-সাম্প্রদায়িক ভারতের স্বপ্ন দেখান, তিনিই অন্তরের অন্তঃস্থল হইতে সেই বিভাজনেরই কট্টর সমর্থক। গুরুত্বের বিচারে ইহা ধর্ম, জাত, বর্ণ অপেক্ষা কিছু কম নহে। বরং তুলনায় অনেক বেশি উদ্বেগের। অন্যগুলি লইয়া যে পরিমাণ চর্চা হয়, তাহার সিকিভাগও এ ক্ষেত্রে হয় না। এবং হয় না বলিয়াই ইহা সবার অলক্ষ্যে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়াইয়া পড়িয়াছে।

বিভাজনের এই আগ্রাসী চরিত্র দেখিয়া আশঙ্কা হয়, যে উদ্দেশ্য লইয়া এই উদ্যোগ লওয়া হইল, তাহা আদৌ সফল হইবে তো? প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা-অন্তে মাথা হইতে লালবাতি সরাইবার হিড়িক পড়িয়াছে। কিন্তু তাহা তো নিছক প্রতীকমাত্র। একটি জড় বস্তু, যাহাকে অপসারিত করিবার কাজটি সহজ। কিন্তু হাতে ক্ষমতা পাইলে, বা সামাজিক মর্যাদায় এক ধাপ উঠিলে নিজেকে ‘বিশেষ’ ভাবিবার প্রবণতার অপসারণ সহজ নহে। এই প্রবণতা হইতেই তো সাধারণ মানুষকে অপদস্থ করিবার, তাঁহাদের নিকট হইতে পবিত্র দূরত্ব বজায় রাখিবার মোক্ষম ইচ্ছাটি জন্ম লয়। কে বলিতে পারে, যাঁহারা চিত্রসাংবাদিক ডাকাইয়া বাতি খুলিবার নাটকটির অংশী হইলেন, তাঁহারাই আগামী দিনে ধর্মস্থানে প্রবেশের জন্য নির্বিকার চিত্তে ভিআইপি দরজার সংক্ষিপ্ততম লাইনে দাঁড়াইয়া পড়িবেন না, বা প্রেক্ষাগৃহের শ্রেষ্ঠ আসনটি দখল করিবেন না? মানুষ-পূজার দেশে ইহা আর এমন কী আশ্চর্যের!

Advertisement
(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন