পাইয়ে দেওয়া নয়, চাই বদলে দেওয়ার উদ্যোগ

চাষি বনাম পাইকার, সরকার কার পক্ষে

অর্থনীতির নিয়ম এক দিকে, উল্টো দিকে পশ্চিমবঙ্গ। অঘ্রান-পৌষে ধানের জোগান প্রচুর, দাম কম। তখন চড়া দাম দিয়েও ধান পেল না সরকার। এই ফাল্গুনে যখন দাম চড়া, তখন হুহু করে ধান ঢুকছে সরকারের ঘরে।

Advertisement

স্বাতী ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৭ মার্চ ২০১৭ ০০:০০
Share:

অর্থনীতির নিয়ম এক দিকে, উল্টো দিকে পশ্চিমবঙ্গ। অঘ্রান-পৌষে ধানের জোগান প্রচুর, দাম কম। তখন চড়া দাম দিয়েও ধান পেল না সরকার। এই ফাল্গুনে যখন দাম চড়া, তখন হুহু করে ধান ঢুকছে সরকারের ঘরে।

Advertisement

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঁদুরে মেঘ দেখেছেন। ধান কেন দিচ্ছে না চাষি, জানতে বিশ্বস্ত আমলাদের পাঠিয়েছিলেন জেলায় জেলায়। টানটা রাজনীতির। ছোট চাষিই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে পাশে ছিল তাঁর। ক্ষমতায় এসে মমতাও চাষিকে গুরুত্ব দেন। চাষের জমি বণ্টনের সুযোগ সামান্য। তিনি চেয়েছিলেন চাষির পুঁজি বাড়াতে।

এতে কৃষিক্ষেত্রেও সংস্কার হত। সুগত বসুর মতো গবেষকরা দেখিয়েছেন, ভূমি সংস্কার আইন তৈরির আগে থেকেই জমি-মালিকরা মহাজন-পাইকার হয়ে ওঠে। চড়া সুদে ধার নিয়ে অল্প দামে ফসল বিক্রির চাকায় বাঁধা রইল চাষিরা। মমতা এসে পাইকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। প্রতি ব্লকে ধান কিনবে সরকার, চেক পাবে চাষি। পাঁচ বছর পর দেখা গেল, অবস্থা যথাপূর্বং।

Advertisement

কী করে? মিল মালিক অনুগত কিছু চাষির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তালিকা দিচ্ছেন। তা ধরে চেক দিচ্ছেন জরুরি পণ্য নিগমের কর্মীরা। অ্যাকাউন্ট মালিকদের দিয়ে টাকা তোলার স্লিপে আগাম সই করিয়ে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। চেক জমা দিয়ে টাকা তুলে নিচ্ছেন নিজেরাই।

যে ধান যেত সরকারের ঘরে, তা বস্তুত ছোট চাষির অভাবী বিক্রির ধান। পাইকার মিল মালিককে, মিল মালিক আবার সরকারকে তা বিক্রি করেন, তফাতটা হয় কুইন্টালে আড়াইশো-তিনশো টাকার। সহায়ক মূল্যের গুড় খেয়ে যায় ব্যবসায়ী আর মিল মালিক। ছোট চাষি অভাবী বিক্রির নোনা জল হজম করে। গরিব চাষিকে সহায়তার জন্য গত বছর খরচ হয়েছে ৫৪৩ কোটি টাকা। তার কতটা ব্যবসায়ীর বাক্সে গিয়েছে, সে আন্দাজ কঠিন। কেউ বলেন মাত্র পাঁচ শতাংশ টাকা যায় চাষির ঘরে, কেউ বলেন দশ-বারো শতাংশ।

Advertisement

এ বছর ব্রেক কষেছিল খাদ্য দফতর। ঠিক হল, চেক আর নয়। সরাসরি চাষির অ্যাকাউন্টে টাকা যাবে। খরিদ করবেন ফুড ইনস্পেক্টর। নামের তালিকা থাকবে অনলাইনে। দুর্নীতির নজরদারি করতে পারবে উপরমহল, সরকারি কর্মী তার জন্য ব্যক্তিগত দায়বদ্ধ থাকবেন।

এর পরেই ধান খরিদে ভাটা। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সংগ্রহ হল পাঁচ-ছয় লক্ষ টন, গত বছরের সিকিভাগ। শোরগোল উঠল, টান পড়বে রেশনের চালে। রেশন গ্রাহকের স্বার্থে সব শর্ত তুলে দিতে হবে। তাতে গলা মেলালেন দাপুটে কিছু আমলাও।

সরকার টেন্ডার করে চাল কিনেও চাহিদা মেটাতে পারত। তা না করে নিঃশর্তে নতজানু হল। বিশে ফেব্রুয়ারি বজ্র আঁটুনি হয়ে গেল ফস্কা গেরো। কোনও কাগজ দেখাতে হবে না, যে কেউ বিক্রি করতে পারে ধান। যত ইচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে গেল ধান বিক্রি। পয়লা ডিসেম্বর সরকার ধান কিনতে নামার পর প্রথম ৮২ দিনে যত ধান বিক্রি হয়েছে, পরের ১৫ দিনে বিক্রি হল তার প্রায় দেড়গুণ। বাজারে ধানের দাম সরকারি দর ছুঁইছুঁই, তবুও। এমন মওকার জন্য যারা ওত পেতে বসেছিল, তারা কি ছোট চাষি?

‘পাইকারদের জন্য দরজা খুলে দিল সরকার,’ বলছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের কৃষক সভার নেতা বিশ্বনাথ শাসমল। উত্তরবঙ্গের একটি জেলার চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট নিজেও চাল ব্যবসায়ী। বললেন, ‘পাইকারের চালে এখন ভাল চলছে মান্ডি।’ নদিয়ার করিমপুরে নাবার্ডের সঙ্গে যুক্ত এক কৃষক সংগঠকের কথায়, ‘ধান, পাট, সবই সরকারকে দেয় পাইকার। চাষিকে হঠিয়ে দেয়।’

কী ভাবে? তার একটা পদ্ধতি তৈরি আছে।

এক, ধান কেনা সরকার শুরুই করে অঘ্রান পার করে। তত দিনে ছোট চাষির ধান পাইকারের গোলায়। মালদহের হবিবপুরের হাটের অফিসকর্তারা বললেন, এ বছরও সরকার ধান কিনতে নামার আগেই অধিকাংশ ধান বিক্রি হয়ে গিয়েছে হাটে। পুরনো নোটে দাম একটু বেশি মিলেছে, নতুন নোটে কম।

দুই, অকারণ ঘোরানো হয় চাষিকে। হবিবপুরে প্রকাশ মণ্ডল দেখালেন একটি চিরকুট। জানুয়ারির ৮ তারিখ মান্ডিতে নাম লেখাতে গিয়ে পেয়েছেন সেটি, তাতে ১৫ মার্চে আসতে বলা হয়েছে। পাশে একটি দুর্বোধ্য স্বাক্ষর। ‘‘কে বসে থাকবে? চল্লিশ মণ ধান বিক্রি করলাম হাটে।’’ দর কুইন্টাল ১১২৫ টাকা। যেখানে সরকারি দর ১৪৯০ টাকা।

তিন, প্রতি কুইন্টালে তিন-ছয় কিলোগ্রাম ধান বাদ যায় কেনার সময়, জলীয় অংশ থাকার কারণে। তৃণমূলের এক কর্মাধ্যক্ষ নিজে মিল মালিক। বললেন, ‘ময়েশ্চার মার্কার’ যন্ত্র নেই, ফলে বেশি বাদ পড়ল কি না, তা বোঝার উপায় চাষির নেই। ‘ঢাল’ বা ‘ঢলতা’ কাটা হচ্ছে শুকনো ধানেও। কুইন্টালে ৩০-৫০ টাকা বাদ, চাষি বিরক্ত।

চার, ধান বিক্রি করলেও টাকা কবে মিলবে, তা নিয়ে আশঙ্কা চাষির মনে। চেক বাউন্স হয়, নইলে টাকা মিলতে তিন-চার মাস লাগে, এমন অভিযোগ গ্রামে গ্রামে। কতটা সত্য, কতটা হাওয়ায় ভাসানো হচ্ছে চাষিকে নিরস্ত করতে, বলা কঠিন।

এ বছর হঠে-যাওয়া চাষিকে ফের সরকারি প্রক্রিয়াতে যুক্ত করার একটা উদ্যোগ নিয়েছিল খাদ্য দফতর। আড়াই মাসে হঠে গেলেন খাদ্য সচিব। টিকে গেল মধ্যস্বত্বভোগী। এখানেই বাম আমলের সঙ্গে এই সময়ের অ-পরিবর্তন। বাম জমানার চাইতে বেড়েছে ধানের গুদাম। তখন মাত্র ৬২ হাজার টন ধান রাখা যেত, এখন পাঁচ লক্ষ টনেরও বেশি। সরকার তাই ধান কিনছেও বেশি। কিন্তু তাতে বেশি চাষির লাভ না হয়ে যদি কিছু ব্যবসায়ীর বেশি লাভ হয়, তবে ভাল হল না মন্দ?

এমন নয় যে তৃণমূল জমানায় চাষির জন্য কিছুই করা হয়নি। চাষে যন্ত্রের ব্যবহার, নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ, লাভজনক বিকল্প চাষ, চাষের প্রশিক্ষণ-অনুদান সবই তৃণমূল আমলে বেড়েছে, বলছে সরকারি তথ্য। কিন্তু পাইয়ে দেওয়ার বাইরে যে বদলে দেওয়া, যাতে কৃষির রাশ বিপণনকারীর হাত থেকে আসে উৎপাদকের হাতে, যার প্রভাব ভূমি-সংস্কারের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে, তা এখনও দেখেনি পশ্চিমবঙ্গ।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement