এই সফরে তিস্তা সমস্যার সমাধান করিয়া স্বদেশে ফিরিবেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চয় এমন প্রত্যাশা লইয়া গত সপ্তাহে ভারতে আসেন নাই। কিন্তু তিস্তা চুক্তি এক পা অগ্রসর হইল না, বরং নদীজল বিভাজনের প্রস্তুতি নূতন করিয়া শুরু করিবার প্রস্তাব উঠিল, ইহাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রসন্ন বোধ করিবার কারণ নাই। উদ্বেগের কারণও যে যথেষ্ট, তাহা বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া ইতিমধ্যেই প্রমাণ করিয়াছেন। তিস্তা চুক্তি অসম্পাদনের খবর পৌঁছনোমাত্র তিনি কামান দাগিয়াছেন যে হাসিনা ‘ভারতের কাছে দেশকে বিক্রয় করিয়া দেওয়া’ সত্ত্বেও অভীষ্ট সিদ্ধ হইল না, হাসিনার শিরোবস্ত্রে পালকযোগ হইল না! বাস্তবিক বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে এই অভিযোগ মাথায় লইয়াই পরের বৎসর বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন লড়িতে হইবে। প্রতিবেশী ‘বিগ-ব্রাদার’ ভারতের সহিত বাংলাদেশের সম্পর্ক গত কয়েক বৎসরে প্রীতি-সৌহার্দ্যের মাত্রা অতিক্রম করিয়া প্রায় পারস্পরিক নির্ভরতার স্তরে পৌঁছাইয়াছে, মৌলবাদী সন্ত্রাস দমনে ভারতের একেবারে পাশে আসিয়া হাসিনার দেশ দাঁড়াইয়াছে, হাসিনা সরকার মুক্তিযুদ্ধের ‘রাজাকার’দের বিচারের পাশাপাশি ঢাকার তরুণ জঙ্গিবাহিনীর মোকাবিলায় উঠিয়া-পড়িয়া লাগিয়াছে, কট্টর ইসলামের চক্ষুশূল হইয়াছে। এমতাবস্থায় ভারত হইতে শূন্য হাতে প্রত্যাবর্তনের ফলে দেশের ভিতরের শত্রুরা প্রধানমন্ত্রীকে ছাড়িয়া কথা বলিবে না। নির্বাচনী লড়াই তাঁহার পক্ষে কঠিন হইয়া যাইবে, ইহাও ঠিক।
এতৎসত্ত্বেও তিস্তা-বৃত্তান্তটিকে কেবলই হাসিনার রাজনৈতিক ‘অভিসন্ধি’রূপে দেখিলে তাহা বিকৃত হইবে। তিস্তা অববাহিকার ভারতীয় ও বাংলাদেশি ভাগের মধ্যে জলবণ্টনের অনুপাতের বিষয়টি গুরুতর, ইহার সঙ্গে দুই উত্তরবঙ্গেরই জনজীবনের যোগ অতি গভীর। ও পারে রংপুর অঞ্চলে তিস্তাপার প্রায় মরুভূমিতে পরিণত, কৃষিকার্য দূরস্থান, জীবন অতিবাহনই কষ্টকর। সুতরাং ইহা নেহাত রাজনৈতিক সমস্যা নয়, মানবিক সমস্যাও বটে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। সেই দিক দিয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিরোধকেও শুধু পাকা খেলা কাঁচাইয়া ভন্ডুল করিবার দুর্বুদ্ধি রূপে না দেখিয়া অন্য ভাবে দেখা দরকার। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের জীবনযাপন ধ্বস্ত করিবার প্রস্তাব পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে মানিয়া লওয়া কঠিন: ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইহা দেখিতে না পাইতে পারেন। তবে তাহাতে সমাধান কিছুমাত্র আগাইবে না। ২০১১ সালে যে ভাবে পূর্বতন ইউপিএ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ও শেখ হাসিনার মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হইতে বসিয়াছিল পশ্চিমবঙ্গের মতামত ছাড়াই, তাহা কেবল যুক্তরাষ্ট্রীয় ক্ষমতারবিন্যাসের যুক্তিতে অন্যায় নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক যুক্তিতেও অন্যায়। আঞ্চলিক মতের অপেক্ষা না করিয়াই দুই প্রধানমন্ত্রী দূর প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য নিজেরা নির্ণয় করিয়া দিতে পারেন না। ইহা মমতা বা হাসিনার নিজ নিজ ইগোর প্রশ্ন নয়। অগণিত বাঙালির বাঁচনমরণের প্রশ্ন, সীমানার দু’পারে।
একটি বিতর্কিত পথের দুই দিকের বক্তব্যে সারাৎসার থাকিলে অন্য বিকল্প পথে সমাধানের চেষ্টাই ভাল। মমতার প্রস্তাবিত তোর্সা-পথটি অস্বীকৃত হইলেও এই প্রস্তাব কিন্তু একটি উপকার করিয়া গেল। বহু-আলোচিত এবং সংকট-কণ্টকিত তিস্তার বাহিরে আলোচনার পরিসরটিকে টানিয়া লইয়া গেল। তিস্তা অববাহিকাকে তিস্তা ছাড়া অন্য কোনও উপায়ে জলশীল করা যায় কি না, সেই ভাবনার প্রথম পদক্ষেপ হইয়া রহিল। ইহাকে একটি আঞ্চলিক গেরো হিসাবে না দেখিয়া একটি বৃহত্তর পরিবেশ গেরো হিসাবে দেখা হউক: যে কোনও অঞ্চলের যে কোনও নদীই এমন গেরো বাঁধাইতে পারে, কাবেরী-নর্মদা অধ্যুষিত ভারত তাহা জানে। যদি সব দিকেই সদিচ্ছা থাকে, বিকল্প পথ মিলিবে।