প্রবন্ধ ১

এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সচলতার প্রতীক

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় যাঁরা নষ্ট করতে চান, তাঁরা জানেন না যে, ইতিহাস বলছে, এই নানামুখী চলাচল-নির্ভর সামাজিক পরিসর থেকে উঠে আসা প্রশ্ন-মতামত-বিরুদ্ধতার কণ্ঠরোধ করলে জ্ঞানার্জন তো সম্ভব নয়ই, রাষ্ট্রগঠনও সম্ভব নয়। বা স্তববাদী হোন, দাবি করুন অসম্ভবকে।— এ রকমই সব অচেনা স্লোগানে মেতে উঠেছিল ১৯৬৮ সালের মে মাসে প্যারিস শহর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস তেতে উঠেছিল সরাসরি রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগানে। উত্তেজক সে-সব শব্দকল্প ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বব্যাপী। বিক্ষিপ্ত ভাবে এ দেশেও স্বপ্নরাষ্ট্রের আশা-আকাঙ্ক্ষার অনুরণন শোনা গিয়েছিল। রাষ্ট্রগঠনের উদ্দেশ্য মাথায় রেখে, এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৬৯ সালে স্থাপিত হয়েছিল দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisement

অভিজিৎ কুণ্ডু

শেষ আপডেট: ১০ মার্চ ২০১৬ ০০:৪৩
Share:

প্রশ্নতীক্ষ্ণ। প্যারিসের রাস্তায় বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা, ৩০ মে, ১৯৬৮। গেটি ইমেজেস

বা স্তববাদী হোন, দাবি করুন অসম্ভবকে।— এ রকমই সব অচেনা স্লোগানে মেতে উঠেছিল ১৯৬৮ সালের মে মাসে প্যারিস শহর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস তেতে উঠেছিল সরাসরি রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগানে। উত্তেজক সে-সব শব্দকল্প ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বব্যাপী। বিক্ষিপ্ত ভাবে এ দেশেও স্বপ্নরাষ্ট্রের আশা-আকাঙ্ক্ষার অনুরণন শোনা গিয়েছিল। রাষ্ট্রগঠনের উদ্দেশ্য মাথায় রেখে, এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৬৯ সালে স্থাপিত হয়েছিল দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisement

বিজ্ঞান, ফলিত বিজ্ঞান, নানা কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রগঠনে অপরিহার্য অবদানের কথা ভেবে সামনের সারিতে চলে এল সমাজবিজ্ঞানের শাখা-প্রশাখা। সমাজ-দর্শন, ইতিহাসচর্চা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক— বিশ্ববীক্ষাপুষ্ট জ্ঞানসম্ভার ছাড়া রাষ্ট্র-সমাজ গঠনের কাজটা অসম্ভব। তাই প্রধানত এই কাজটাকেই লক্ষ্য করে যাত্রা শুরু জেএনইউ-র। ইনক্লুসিভ জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা জওহরলাল নেহরুর কল্পিত আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির।

কেবল বিশ্ববিদ্যালয় নয়, আধুনিক সমাজের নানা নাগরিক প্রতিষ্ঠানই চায়, যাতে বিবিধ চিন্তাধারা, বিপরীতধর্মী জ্ঞানচর্চা, নৈরাজ্যবাদ সৃষ্টি না করে। এক অর্থে, এই সব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র আর সমাজের মধ্যে সংযোগকারী হিসেবে কাজ করতে ইচ্ছুক। ভাবনা-সংঘাতের নিরাপদ বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ভারতের মতো বহুমুখী বৈষম্যে বিভক্ত সমাজের দেশে তো এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব তাই অত্যন্ত বেশি। জেএনইউ-র সাম্প্রতিক বিতর্কটিকেই সেই আলোতেই দেখা দরকার।

Advertisement

জেএনইউ চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয় তামাম ভারতবর্ষের সমাজ-বিজ্ঞান, ভাষা-শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পঠন-পাঠনের সেরা ছাত্র-শিক্ষকের গন্তব্যস্থল হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-সহ মোট নয়টি স্কুল আর চারটি বিশেষ সেন্টার নিয়ে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঠামো। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আই আই টি, আই আই এম, আই আই এস-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গোটা বিশ্বে কারিগরি, ম্যানেজমেন্ট, বিজ্ঞানের বিশিষ্ট শিক্ষা-গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে ভারতবর্ষের মুখ। ঠিক একই ভাবে, হিউম্যানিটিজ স্টাডিজ-এ সারা বিশ্বে এ দেশের পরিচয় অনেকটাই জেএনইউ-এর সূত্রে। এমন এক প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি কালে যে সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে, তার মধ্যে আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রগঠন বা বিকাশের প্রতি একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ রয়েেছ।

যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন-গবেষণা দু’ভাবে চলতে পারে। এক, সেটা হতে পারে ‘ক্রিটিকাল থিংকিং’ (সমালোচনামূলক চিন্তাধারা)-সমৃদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডার গঠন, যা রাষ্ট্র-সমাজ গঠনে ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে নাগরিক চেতনার পাশে এসে দাঁড়াবে। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি হয়ে উঠবে রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার নাট্যমঞ্চ। অন্যথা বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন এমন ভাবে চলতে পারে যে তা রাষ্ট্র-পরিচালিত এক ‘আইডিয়োলজিকাল অ্যাপারেটাস’-এ পরিণত হবে। কেবল ‘রাষ্ট্র-পরিচালিত’ই নয়। আরও বিপজ্জনক ভাবে, পরিণত হবে বিশেষ বিশেষ সরকারের আইডিয়োলজিকাল বৈধতাদানের পরিসরে।

Advertisement

সভ্যতার ক্রমবিকাশ আর বিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্রপাত ও ভূমিকাও এই প্রসঙ্গে একটু ফিরে দেখা যেতে পারে। বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী/শ্রেণি বিকাশের ইতিহাস মধ্যযুগের ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় বিকাশের মূল প্রণোদনাটি এসেছিল ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার বিপরীতে মানব-সম্পর্কিত ভিন্ন ধরনের অধ্যয়নের প্রয়োজন থেকে। সেই ‘হিউম্যানিস্টিক’ অধ্যয়নের ধারক আর বাহক ছিল এমন এক সামাজিক গোষ্ঠী, যা যাজক-শ্রেণির থেকে অনেকটা আলাদা। সমাজের বিস্তৃত পরিসর থেকে এই বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীতে যোগদান সম্ভব। অর্থাৎ এ হল এমন এক গোষ্ঠী, যা শাসকশ্রেণি, সামন্ত শ্রেণি বা যাজক শ্রেণি, সব থেকেই বিযুক্ত। এই যে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি/গোষ্ঠী, তার থেকেই জন্ম নিয়েছিল আলোকপ্রাপ্ত চিন্তাবিদরা; বিশেষত ফ্রান্সে। সাবেক গির্জাশাসন আর শাসকশ্রেণির বিপরীত মেরুতে অবস্থিত এই শ্রেণিই সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিটিক্‌স অব সোসাইটি বা সমাজ-সমালোচক হিসেবে সংগঠিত হয়।

সে দিক থেকে, রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া এই যে Clash of Ideas বা ভাবনা-দ্বন্দ্ব, তা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চার সহায়ক নয়। কে জাতীয়তাবাদী আর কে জাতীয়বিরোধী, সোজাসাপ্টা এই দুই-ভাগবিশিষ্ট সমাজ-ইতিহাসবোধ নিঃসন্দেহে বৌদ্ধিক জ্ঞানচর্চার বিরোধী। জ্ঞানচর্চা অনেক বেশি সফল হতে পারে সেই সব প্রতিষ্ঠানে, যেখানে আদান-প্রদানের শর্ত নমনীয়, চরম বিপরীতধর্মী আদর্শও সেখানে গবেষণামূলক জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। জাতি, জনগোষ্ঠী, রাষ্ট্র— এ সব কিছুরই একটা ঐতিহাসিক সত্তা আছে, প্রেক্ষিত আছে। ইতিহাসের সেই সক্রিয়তাকে বিকল করে, সব রকমের জনসমষ্টিকেই ফসিলে পরিণত করে দিয়ে জ্ঞানার্জন তো সম্ভব নয়ই, রাষ্ট্রগঠনও সম্ভব নয়।

নেশন আর রাষ্ট্র যে একই জিনিস নয়, সেটা নিয়ে নতুন আলোচনার দিন আর নেই। মুশকিল হল, এই দুইয়ের মধ্যে টেনশনের কারণে অনেক বেশি শক্তিধর হয়ে উঠছে রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রের আওতায় থেকে সত্যিকারের স্বাধীন নাগরিক হয়ে ওঠা সহজ কাজ নয়। সমাজতাত্ত্বিকরা যেমন বলছেন: সংবিধান ঘোষিত হওয়ার দিন আমরা এক ধাক্কায় স্বাধীন নাগরিক হয়ে উঠি না। স্বাধীনতা একটা লম্বা প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত পরাধীনতার বন্ধনগুলো কাটিয়ে উঠতে পারি।

অন্য দিকে, সেই Clash of Ideas-কে ইন্ধন দিতে তৈরি হয় গতে বাঁধা অতিরঞ্জিত কিছু জেএনউ চিত্রকল্প। মনে হয়, জেএনইউ বুঝি এক উগ্র, নৈরাজ্যবাদী ‘শখের লীলাক্ষেত্র’ প্রতিষ্ঠান। মজা হল, এলিট মানেই যদিও আমাদের মনের গভীরে ভেসে ওঠে সমাজের উচ্চকোটির বিত্তবান এক শ্রেণি, আবার উৎকৃষ্ট মানবগুণাবলিসম্পন্ন জ্ঞানচর্চার কোনও প্রতিষ্ঠানকেও তো ‘এলিট’ বা অভিজাত হিসেবে ভাবা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষা/জ্ঞান মূলধন করেই তৈরি হয় সামাজিক মূলধন।

জেএনইউ-এর ছাত্রছাত্রীদের আর্থ-সামাজিক রেখচিত্রে চোখ বুলালে বোঝা যাবে যে, আর পাঁচটা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো শুধুমাত্র সংরক্ষণনীতির মাধ্যমেই সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশকে এখানে শামিল করা হয়নি। সুচিন্তিত ভাবে Deprivation Point বা বঞ্চনা-সূচকের মাধ্যমে পিছিয়ে-পড়া জেলা, রাজ্য, সামাজিক ক্ষেত্রকে এখানে স্থান দেওয়া হয়েছে, যেমন কাশ্মীর, যেমন ভারতীয় সেনায় ত্যাগ স্বীকারকারী পরিবারগুলিকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বেশি জায়গা করে দেওয়া হয়। এই ভাবেই প্রতিষ্ঠানটি স্বকীয়, অনন্য হয়ে ওঠে।

এই আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছেলে-মেয়েরা যোগ দেয়। জুলাই মাসে রাজধানী শহরের নয়াদিল্লি, পুরনো দিল্লি বা নিজামুদ্দিন রেল স্টেশনে দূরপাল্লার ট্রেনের স্লিপার ক্লাস, এমনকী অসংরক্ষিত কামরা থেকেই নেমে আসে জেএনইউ শিক্ষাপ্রার্থীর এক বিরাট অংশ। তারা এসে মিশে যায় এক বৃহত্তর জনসমুদ্রে, নাম-গোত্রহীন এক জনসমাজে। সামাজিক সচলতার আবর্তেই এই ‘এলিট’ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্ভর, তার প্রধান আকর্ষণ। প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে আসার প্রিয় মঞ্চ জেএনইউ। এমন আরও অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন এ ভাবেই ভারতীয় সমাজে গতিময়তা ও আশা-পূরণের মঞ্চ হয়ে উঠেছে।

এমন একটি প্রতিষ্ঠানের মৃত্যু যারা চায়, ‘শাট ডাউন জেএনইউ’ প্রচারে যারা নাগরিক পরিসর রুদ্ধ করতে চায়, তারা আসলে প্রকারান্তরে আঘাত হানতে চাইছে ভারতের এই বহু-আকাঙ্ক্ষিত সামাজিক সচলতার নাট্যমঞ্চের উপরেই, এই নিম্নবর্গ, পশ্চাৎপদ, প্রান্তিক মানুষের সক্রিয়তা ও আশাপূরণের প্রকল্পের উপরেই।

তাই, জেএনইউ-পন্থী ‘ক্রিটিকাল’ সমালোচনামূলক চিন্তাধারা স্তব্ধ করে দেওয়ার অর্থ হল, ভারতের বৃহত্তর সামাজিক সচলতার গতি রোধ করা। মূলধারার সঙ্গে প্রান্তিকতার যে দেওয়া-নেওয়া, নিম্নবর্গের উত্তরণ, ভিন্নমতের পাশাপাশি অবস্থান ও তাদের মধ্যে বিজড়িত প্রত্যয়— এ সব কিছুর উপরেই নির্দয় কুঠারাঘাত করা। জেএনইউ এখানে কেবল একটি বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠান নয়, তার চেয়ে অনেক বড় কোনও পরিসরের প্রতীক।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্বের শিক্ষক

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement