বিধানসভা নির্বাচনের মরসুমে কৌশিক সেন (‘প্রশ্ন তুলুন, বিনিময়ে পাবেন একাকিত্ব’, ৩১-৩) নানা তথ্য দিয়ে আনন্দবাজারের পাঠকদের স্মৃতি উসকে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য থেকে যে উপসংহার হাতে পাওয়া যায়, তা হল, এই প্রতিবেদনে পুরোপুরি প্রভাবিত হয়ে আমাদের সকলের নোটা (NOTA) বোতাম টেপা উচিত। কেননা, আদর্শ বা নীতির প্রশ্নে কোনও দলেরই স্বচ্ছতা নেই।
কৌশিকবাবু সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। ডান বাম নির্বিশেষে সুকঠিন বাক্যবাণের চাবুক হানতে পারেন কিন্তু রাজনীতির কঠিন বাস্তবটা অন্য রকম। রাজনীতি কখনওই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না বা একই খাতে প্রবাহিত হয় না। তাঁর প্রতিবেদন মূলত শহুরে শিক্ষিত মানুষদের চর্চার কারণ হতে পারে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ শুধু শহর কলকাতা নয়। তিনি ও আরও অনেক বিদ্বজ্জনের আন্দোলন থেকে সরকারের পতন এসেছিল। কিন্তু এই পতনের পিছনে এ রাজ্যের বড় সংখ্যক সাধারণ মানুষের একটা ভূমিকা ছিল। গ্রামে শহরে পরিবর্তনের কান্ডারি সেই বিশাল সংখ্যক মানুষের বড় একটা অংশের আবার এই পরিবর্তনের পরিবর্তন-আকুতি। ফলে জোট। অবশ্যই চাপিয়ে দেওয়া নয়। নিচুতলার মানুষজনদের স্বতঃস্ফূর্ত জোট।
কিন্তু শহর কলকাতা থেকে প্রত্যন্ত মানুষজনের চাহিদাটা বোঝা সম্ভব নয়। শেক্সপিয়র, উৎপল দত্ত বা কৌশিক সেন, এ সব নাম এঁদের কাছে অপরিচিত। তাঁরা পরিবর্তন চান। কী ভাবে হবে, সে সিদ্ধান্ত নিচুতলায় তাঁরা নিয়ে বসে আছেন— নেতা বা নেতৃত্ব তুমি মানলে মানো, নয়তো নিচুতলায় আমরা একজোট হয়ে ওঁদের প্রতিরোধ করব। যে কোনও বাস্তববাদী মানুষের প্রধান মতই থাকে অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগতে থাকা মানুষের ডাকে সাড়া দেওয়ার পক্ষে। উৎপল দত্ত বেঁচে থাকলে আজকের এই প্রেক্ষাপটে আদর্শ বা নীতির প্রশ্নে সামান্য আপস করে, হয়তো বা নতুন আঙ্গিকে নাটক লিখে, রাস্তায় নামতেন।
শেক্সপিয়র, উৎপল দত্ত, এ সব আলোচনা করার সময় অঢেল আছে সামনের দিনে। ভুল থাক, আদর্শ বা নৈতিকতার সঙ্গে আপস হলেও হোক, তবুও বলি, কঠিন বাস্তব অনেক সত্যকে পরিস্থিতির নিরিখে সাময়িক অস্বীকার করে। এ রাজ্যের পরিস্থিতিই সেটার জ্বলন্ত প্রমাণ।
বিকাশ বসু। কলকাতা-১০৬
॥ ২ ॥
কৌশিক সেন লিখেছেন, ‘তৃণমূলের কোনও দর্শনগত ভিত্তি নেই, কিন্তু কোন দর্শন বা আদর্শের ভিত্তিতে বামপন্থীদের মনে হল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট সম্ভব?’
বুলগেরীয় কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি জিয়র্জি দিমিত্রভ, কমিনটার্নের সপ্তম কংগ্রেসে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। লক্ষ্য ছিল, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখা।
দিমিত্রভের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৩৫ সালে স্পেনে সমাজতন্ত্রী কমিউনিস্ট এবং অ্যানার্কিস্টদের মহাজোট গঠিত হয়। এই জোট রাজতন্ত্রী প্রতিক্রিয়াশীল এবং ফ্যাসিস্টদের জোটকে নির্বাচনে পরাস্ত করে। তার পরেই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে জেনারেল ফ্রাঙ্কো। শুরু হয় স্পেনের গৃহযুদ্ধ। ফ্রাঙ্কোর অসুর বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধে শামিল হন সারা বিশ্বের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেন ক্রিস্টোফার কডওয়েল, র্যাল্ফ ফক্স, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। মতাদর্শে কডওয়েল বা ফক্সের সঙ্গে হেমিংওয়ের দুস্তর ব্যবধান, কিন্তু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তা বাধা হয়নি।
একই ভাবে ফ্রান্সে গঠিত হয় পপুলার ফ্রন্ট সরকার। সাম্রাজ্যবাদী জাপান যখন চিন আক্রমণ করে, চিয়াং কাই শেক-এর নেতৃত্বাধীন চরম প্রতিক্রিয়াশীল কমিউনিস্ট-বিদ্বেষী এবং হাজার হাজার কমিউনিস্ট নিধনকারী কুয়োমিনতাং-এর সঙ্গে হাত মেলায় চিনের কমিউনিস্ট পার্টি।
বিজেপি-র হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী রাজনীতি এবং তৃণমূলের নীতিহীন স্বৈরতান্ত্রিক শাসন দেশ এবং রাজ্যের শ্রমজীবী জনগণের পক্ষে সবচেয়ে বড় বিপদ। সুতরাং বামপন্থীদের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট অনৈতিক নয়, বরং সময়ের দাবি।
ফ্যাসিবাদী বীভৎসতার চিত্র উন্মোচনকারী ফ্রিডরিশ উলফ-এর ‘প্রফেসর মামলক’ নাটকের চেতাবনি মনে রাখা প্রয়োজন। ‘যখন লড়াই করা দরকার, তখন লড়াই এড়ানোর চেয়ে বড় অপরাধ আর নেই।’ প্রসঙ্গত, এই নাটকটি অনুবাদ করে মঞ্চস্থ করেন উৎপল দত্ত।
শিবাজী ভাদুড়ি।
সাঁত্রাগাছি, হাওড়া-৪
॥ ৩ ॥
সংস্কৃতি ও রাজনীতির এই ডামাডোলের বাজারে কৌশিক সেনের যুক্তি ও বিবেকশুদ্ধ অবস্থানটি অত্যন্ত স্পষ্ট। তবুও এই নিবন্ধের প্রেক্ষিতে দু-একটি প্রশ্ন জরুরি।
লেখক সংশয় প্রকাশ করেছেন, সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের আন্দোলনের সময় পরিবর্তনের পক্ষে তৃণমূলকে সরাসরি সমর্থন জানানো লেখক, শিল্পীদের একমাত্র কর্তব্য ছিল কি না? এ ক্ষেত্রে বলা ভাল, সে সময়ের বহু আন্দোলনকারীই দলীয় নিরপেক্ষতার অবস্থান থেকেই তৃণমূলকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। এই অবস্থান মোটেই স্ববিরোধী নয়। তাঁরা জানতেন তৃণমূলের লুম্পেন প্রলেতারিয়েত নির্ভর চরিত্রটি স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠার পক্ষে অনুকুল নয়, কিন্তু তবুও তাঁদের বেশি বিপজ্জনক মনে হয়েছিল সিপিআইএম-এর সংঘবদ্ধ নিরেট দলতান্ত্রিক দাম্ভিক একগুঁয়ে চরিত্র, যা কোনও সুপরামর্শই শুনতে চায় না। তাঁরা অত্যন্ত ঠিক বুঝেছিলেন সিপিআইএম যদি আবার ক্ষমতায় আসে, তার ফল হবে মারাত্মক।
বামেরা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধেছে বলে লেখক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এ ক্ষোভের কি সত্যি কোনও কারণ আছে? ‘সেজ’ সমর্থন করে বামেরা, সমর্থন করে এফডিআই, চাষিদের জমি কেড়ে নিয়ে তারা তুলে দিতে চায় কর্পোরেট হাউসের হাতে। কী তফাত রইল তা হলে আজ বামের সঙ্গে কংগ্রেসের? কংগ্রেসের রাজত্বকালে বামেরা তাদের হাতে লাঞ্ছিত নিপীড়িত হয়েছিল, সুতরাং তাদের সঙ্গে জোট বাঁধা যাবে না— এ যুক্তিও ধোপে টিকবে না। সিপিআইএমের হাতেই বামফ্রন্টের অন্যান্য শরিক দলের অসংখ্য কর্মী নিহত ও লাঞ্ছিত হয়েছেন। সে ক্ষেত্রেও কিন্তু পরস্পর জোট বাঁধতে অসুবিধা হয়নি। আজ যদি তৃণমূলের নীতিহীন বোধবুদ্ধিহীন শাসনকে উৎখাত করার জন্য কংগ্রেস-সিপিএম জোট বাঁধে, আপত্তি কোথায়? কিন্তু জিতে ফিরে আসার পর বামেরা কি আর আত্মসমীক্ষা করবে? নিশ্চয়ই না। বিপর্যয়ের পর তারা যেটা করেনি, জিতে ফিরে আসার পর কেন তা করবে? গুন্ডাপুষ্ট যে রাজনীতির উত্তরাধিকার বামেদের কাছ থেকে তৃণমূল পেয়েছিল, সেই উত্তরাধিকারই সে আবার ফিরিয়ে দেবে বামকে।
কৌশিক সেন ঠিকই বলেছেন, বিদ্বজ্জনেরা এই সর্বনাশা ক্ষমতাসর্বস্বতার বিরুদ্ধে নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে একটা উজ্জ্বল সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছিলেন, দলহীন নৈতিকতার যে লড়াই রাজ্যবাসী আগে দেখেননি, কিন্তু ক্ষমতার ফাঁদে পড়ে সেই বিদ্বজ্জনদের একাংশ যে ভাবে
বর্তমান শাসক দলের অন্যায়ের সমর্থনে রাস্তায় নেমেছেন তাতে হতবু্দ্ধি হয়ে যেতে হয়। তবুও সে দিন পরিবর্তনের স্বপক্ষে তৃণমূলকে সমর্থন করার ডাক দিয়ে ভুল করেননি তাঁরা। কাউকে এক বার সমর্থন জানালেই চিরকাল তাকে সমর্থন জানাতে হবে এমন দাসখত কেউ লিখে দেয়নি। আজ তাঁরা তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ডাক দিতেই পারেন, পরিবর্তে কাকে ভোট দিতে হবে সে বিষয়ে নিশ্চুপ থেকেও।
অভিজিৎ সেনগুপ্ত। বারাসত, উত্তর চব্বিশ পরগনা
থিয়েটার ওয়ার্কশপ
কৌশিক সেন একটি নাট্যদলের উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তার নামটি উহ্য রেখেছেন। তবে যেহেতু বলেছেন, ওই দল প্রতি বছর শ্রেষ্ঠ নাট্যকারকে ‘সত্যেন মিত্র পুরস্কার’ দিয়ে থাকেন, তাই স্পষ্টতই তিনি থিয়েটার ওয়ার্কশপ-এর কথাই বলেছেন। কিন্তু সেই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, এ রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একটা সময় নাট্যদলটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই তথ্য ঠিক নয়। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রচিত ‘পোকা’ নাটকটি প্রযোজনা করা হয়েছিল ২০০৯ সালে, বেশ কয়েকটি অভিনয়ও হয়েছিল। বুদ্ধদেববাবু আমাদের নাট্যদলের সঙ্গে কোনও দিনই যুক্ত ছিলেন না।
স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্পাদক, থিয়েটার ওয়ার্কশপ, কলকাতা-৪