Farmers

সম্পাদক সমীপেষু: কৃষির সম্মান

বিশেষ উল্লেখযোগ্য দেশের নামী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করে আসা তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। এত দিন উচ্চশিক্ষার সঙ্গে গ্রাম ও কৃষির সম্পর্ককে প্রায় বিচ্ছিন্ন বলেই ধরে নেওয়া হয়েছে, এই উদ্যোগ সেই ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়।

শেষ আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৪
Share:

স্বাতী ভট্টাচার্যের লেখা ‘মুক্তির খোঁজে স্বপ্নের খামার’ (২৭-১২) সাম্প্রতিক সময়ের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রচনা। কেবল বিকল্প কৃষিপদ্ধতির বর্ণনা নয়, বরং আমাদের উন্নয়ন-ভাবনা, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক গভীর পুনর্বিবেচনার দাবি তোলে এই লেখা। প্রবন্ধকারের দীর্ঘ গবেষণা, মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং তথ্যনিষ্ঠ উপস্থাপনা রচনাটিকে বিশেষ বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে। এই লেখার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিক— কৃষক, শিক্ষিত তরুণ এবং প্রযুক্তি— এই তিনের সমন্বয়ে একটি সহযোগিতামূলক ও সম্মানভিত্তিক মডেলের কথা উঠে এসেছে। এই মডেলে কৃষক কেবল উৎপাদক নন; তিনি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ধারক এবং সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়ার অংশীদার।

বিশেষ উল্লেখযোগ্য দেশের নামী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করে আসা তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। এত দিন উচ্চশিক্ষার সঙ্গে গ্রাম ও কৃষির সম্পর্ককে প্রায় বিচ্ছিন্ন বলেই ধরে নেওয়া হয়েছে, এই উদ্যোগ সেই ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়। কর্পোরেট চাকরি বা বিদেশমুখী সাফল্যের বাইরে গিয়ে তাঁরা দেখিয়েছেন, প্রযুক্তিগত জ্ঞান যদি মাটির সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তা শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, কৃষকের আত্মমর্যাদা ও সামাজিক স্থিতিও ফিরিয়ে আনে।

এখানে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার যান্ত্রিক আধিপত্যের প্রতীক নয়। তথ্যভিত্তিক চাষ, মাটির স্বাস্থ্যের যত্ন, জল সংরক্ষণ, রাসায়নিক নির্ভরতা কমিয়ে আনা এবং পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির মাধ্যমে প্রযুক্তি মানুষের সহায়ক হয়ে উঠেছে, শাসক নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছোট পরিসরে নতুন ফল ও ফসল উৎপাদনের পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টা, যেখানে সীমিত জমি ও সম্পদের মধ্যেও উদ্ভাবনী চিন্তা ও বৈজ্ঞানিক বোধের স্পষ্ট পরিচয় মেলে। এই ধরনের উদ্যোগ দেখিয়ে দেয়, বড় জমি বা কর্পোরেট পরিকাঠামো নয়, জ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার সংযোগই কৃষির ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্ষম। এই প্রেক্ষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। কৃষি স্বভাবগত ভাবে অলাভজনক নয়, কিন্তু বর্তমান বাজার ও নীতিকাঠামোতে উৎপাদনের ঝুঁকি মূলত কৃষকের উপরই এসে পড়ে, আর লাভের বড় অংশ চলে যায় ব্যবস্থার অন্য স্তরে। ফলে কৃষি নয়, কৃষককেই ক্রমশ অলাভজনক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এই কারণেই এমন বিকল্প ও সহযোগিতামূলক মডেলের প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

এখানেই রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তিশিক্ষা এবং মাঠপর্যায়ের কৃষকের অভিজ্ঞতার মধ্যে দীর্ঘ দিনের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কমানো রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। এই ‘স্বপ্নের খামার’ দেখিয়ে দেয়, যদি নীতিনির্ধারণে স্থানীয় বাস্তবতা, শিক্ষিত তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দেওয়া যায়, তবে কৃষি ভর্তুকিনির্ভর বা অনিশ্চিত পেশা হয়ে থাকবে না। বরং তা অবশেষে সম্মানজনক, দীর্ঘমেয়াদি ও ন্যায্য জীবিকার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

অলোক কুমার মুখোপাধ্যায়, উত্তর ২৪ পরগনা

স্মৃতির বাগান

স্বাতী ভট্টাচার্যের ‘মুক্তির খোঁজে স্বপ্নের খামার’ প্রবন্ধ পড়ে গভীর ভাবে উৎসাহিত হলাম। যেন স্মৃতির দুয়ার হঠাৎ খুলে গেল। আমি গ্রামের ছেলে। ছোটবেলায় বাবা আমাদের বাগানের কিছুটা করে অংশ ভাই-বোনদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন। আমরা প্রত্যেকে নিজের অংশটুকু কোদাল দিয়ে কুপিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে কেউ ফুলকপি, কেউ বাঁধাকপি, কেউ টমেটো, লঙ্কা বা বেগুনের চারা লাগাতাম। চারাগুলিকে বেড়ে ওঠার মতো যথাযথ দূরত্বে বসাতে হত। এক সারি থেকে অন্য সারির মাঝখানে নালা করে দিতে হত। প্রতিটি গাছের গোড়ায় গোবর সার দিতাম। নিয়মিত জল দেওয়া, আগাছা পরিষ্কারের কাজও করতাম। কোনও ওষুধ বা রাসায়নিক সার ছাড়াই গাছগুলো বড় হয়ে উঠত। এই প্রকৃতিবান্ধব আনাজ খেতে ছিল অসাধারণ সুস্বাদু এবং শরীরের পক্ষে অত্যন্ত পুষ্টিকর। সে কারণেই আমরা তখন খুব একটা অসুখ-বিসুখে ভুগিনি। পুকুরের মিষ্টি স্বাদের মাছের কথা আজও মনে পড়ে। উচ্চশিক্ষা ও চাকরিজীবন কেটেছে শহরে। মাঝেমধ্যে গ্রামে গিয়ে কয়েক দিন থেকে বাড়ি ও বাগান পরিষ্কার করি, কিন্তু চাষ আর করা হয় না। পরিবারের সবাই এখন রাসায়নিক সার, বিষাক্ত ওষুধ এবং সতেজ রাখার রাসায়নিকযুক্ত আনাজ নিয়মিত খাচ্ছি। ফলত নানা রকম অসুখে ভুগছি। অথচ গ্রামের বাস্তুভিটে পড়ে আছে খালি।

ভাবছি, আবার গ্রামে চাষবাস শুরু করব। আমাদের গ্রামে বহু মানুষ শহরে চলে আসায় অনেক বাগানই জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই এখনও যোগাযোগ আছে। গ্রামে আবার বাগান করার জন্য তাঁদের উৎসাহিত করব। কয়েক জনকে পাশে পেলে কাজটা নিশ্চয়ই ভাল ভাবে এগিয়ে যাবে।

গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর

মায়াজাল

‘দুর্গা অঙ্গনের শিলান্যাস, নিজেকে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করলেন মমতা’ (৩০-১২) প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। প্রশাসনের দাবি, মন্দির গড়ে উঠলে সেখানে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হবে; দোকানপাট গড়ে উঠবে, কেনাবেচা বাড়বে; কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হবে এবং পর্যটন শিল্পের উন্নতি ঘটবে।

তা হলে আজ শিল্প বলতে কি আমরা মন্দির-মসজিদ নির্ভর পর্যটন শিল্পকেই বুঝতে শুরু করেছি? এই মন্দির-মসজিদ নির্মাণের রাজনীতি আসলে এক অন্তহীন খেলার সুগভীর মায়াজাল। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, এতে সরকারি টাকার ব্যবহার কেন অপরিহার্য হয়ে উঠছে? তবে কি ধরে নেওয়া যায় যে, প্রকৃত শিল্পায়নে পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে খরার কবলে বলেই এই ধরনের মন্দির-মসজিদ নির্মাণকে সামনে রেখে প্রশাসন জনপ্রিয়তার সহজতম পথ বেছে নিচ্ছে? আখেরে এর ফলে বাংলার অর্থনীতি একবিন্দুও এগোবে না।

তপন কুমার দাস, কলকাতা-১২২

সঙ্কটে শৈশব

সমাজের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার শিশুদের অবস্থানে। তারা কতটা নিরাপদ, কতটা স্বাধীন, কতটা আনন্দময় পরিবেশে বেড়ে উঠছে, এই প্রশ্নগুলির উত্তরেই ধরা পড়ে একটি সমাজের নৈতিক মানচিত্র। তাই শৈশব রক্ষা মানে কেবল শিশুদের রক্ষা নয়; আসলে পুরো সমাজের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।

আজ বাহ্যিক ভাবে শিশুদের চার পাশে সুযোগ-সুবিধার অভাব নেই, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও বিনোদনের উপকরণ সবই হাতের নাগালে। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, কেন শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে? কেন উদ্বেগ ও অবসাদ আজ অল্প বয়সেই শিশুদের জীবনের অংশ হয়ে উঠছে? এক সময় শৈশব মানেই ছিল খেলাধুলা, প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় পরিচয়, নির্ভার হাসি আর ভুল করার স্বাধীনতা। আজ সেই শৈশব ধুঁকছে পরীক্ষার চাপ, প্রতিযোগিতা এবং ‘সফল’ হওয়ার সামাজিক তাগিদে। শিশুরা যেন খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে উঠছে, কিন্তু পরিণত হওয়ার যথাযথ সুযোগ পাচ্ছে না।

এই রূপান্তরের মূলে আমাদের সম্মিলিত দায় এড়ানো যায় না। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম থেকে সামাজিক পরিবেশ, সব ক্ষেত্রেই শিশুর উপর প্রত্যাশার বোঝা ক্রমশ বাড়ছে। আজকের শিশুসমাজ সহিংসতা ও বিভাজনেরও নীরব সাক্ষী। এই বাস্তবতার প্রভাব শিশুদের মননে গভীর ছাপ ফেলছে। শিশু নির্যাতন, অপুষ্টি ও শিক্ষায় বৈষম্য— এগুলি আসলে সামাজিক ব্যর্থতারই প্রতিফলন। যে সমাজ নিজের শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ, সেই সমাজের ভিত অনিবার্য ভাবেই নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

আইন ও প্রশাসনের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতাই সবচেয়ে জরুরি। শৈশবকে রক্ষা করতে পারলেই আমরা সত্যিকারের মানবিক ও সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারব।

সুদীপ গুহ, বনগাঁ, উত্তর ২৪ পরগনা

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন