সম্পাদক সমীপেষু: বঙ্কিম সাম্প্রদায়িক!


প্রসঙ্গ ‘সাম্প্রদায়িক বঙ্কিম’ (২৮-৮) শীর্ষক চিঠি। লেখক হেলালউদ্দীন মহাশয়ের যুক্তি বড় একপেশে। ‘আনন্দমঠ’-এর পটভূমি হল ১৭৭২-এর সন্ন্যাসী বিদ্রোহ। ১৭৬৪-তে বক্সারের যুদ্ধের পর মিরজাফরের পুনরায় মসনদ আরোহণ এবং তাঁর দেওয়া দেওয়ানিতে বিনা শুল্কে বাণিজ্যের নামে ইংরেজের যথেচ্ছাচার সন্ন্যাসীদের উত্থানের কারণ। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পটভূমিকায় একদল সন্ন্যাসী যদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করার জন্য পৌত্তলিকতা বা দুর্গার আশ্রয় নিয়েই থাকেন, সেখানে দেশপ্রেমের তুলনায় সাম্প্রদায়িকতাকে বড় করে দেখা দুর্ভাগ্যজনক। রাষ্ট্রে তখন যদি হিন্দুশক্তি থাকত, আর সন্ন্যাসীদের জায়গায় কোনও ইসলামি বিপ্লবী যদি ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি তুলে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতেন, মন্বন্তরে বেঁচে যাওয়া হিন্দুরা বোধ করি আপত্তি করতেন না। এক জন ঔপন্যাসিকের কাজই হল উপন্যাসের চরিত্র এবং সে সময়ের সমাজকে জীবন্ত করে তোলা। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ভবানন্দের মুখে তাই এই গানই স্বাভাবিক নয় কি?

বন্দে মাতরম্ সম্পর্কে অরবিন্দ ঘোষ লিখেছেন, ''the mantra has been given and in a single day a whole people had been converted to the religion of patriotism.'' ‘বন্দে মাতরম্’ একটি মন্ত্র। বোধ করি এটি সে সময়ের মুসলিমদেরও হিন্দুধর্মে নয়, স্বদেশধর্মে দীক্ষিত করেছিল।

রমেশচন্দ্র দত্ত লিখেছেন, "the greatest moral of 'Ananda Math', then, is that British rule and British education are to be accepted as the only alternative to Mussulman oppression." আজকের অসহিষ্ণুতার যুগে যদি একই কথা গোঁড়া হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধেওকেউ বলতে পারেন, তিনি স্বাগত, তিনি বাস্তববাদী।

সায়ক সিনহা

কলকাতা-১১০

 

বক্তব্য চরিত্রের

হেলালউদ্দীন সাহেবের চিঠিতে উদ্ধৃত ‘‘ভাই এমন দিন কি হইবে, মসজিদ ভাঙ্গিয়া রাধা মাধবের মন্দির গড়িব?’’ সংলাপটি ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে বর্ণিত অসংখ্য সন্তানের জমায়েত থেকে ভেসে আসা কোনও এক জনের উচ্ছ্বাসমাত্র (তৃতীয় খণ্ড, অষ্টম পরিচ্ছেদ, ৯৭ পৃষ্ঠা)। বিশেষ বক্তব্যটির আগেপিছে সন্তানদের আরও অনেক সংলাপ রয়েছে— যা চরিত্রগুলির সঙ্গে মানানসই। কিন্তু পত্রলেখক বিশেষ বক্তব্যটিকেই লেখক বঙ্কিমচন্দ্রের স্বপ্ন বলে চালিয়ে দিলেন। চরিত্রের বক্তব্য যদি লেখকের বক্তব্য বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, তবে তো চরিত্র রচনা করাই অসম্ভব হয়ে পড়বে।

স্মরণে রাখা প্রয়োজন, সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিকায় ‘আনন্দমঠ’ রচিত। পলাশির যুদ্ধ সবে শেষ, বাংলায় অরাজক অবস্থা। মিরজাফর আর ইংরেজদের অত্যাচারে রাজপথে হাজার হাজার ক্ষুধার্ত শিশু। নারীপুরুষের মৃতদেহ শিয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খাচ্ছে। আসলে ইংরেজদের ক্ষেত্রে যেমন খ্রিস্টান না বলে ইংরেজ বা ব্রিটিশ বলা হয়, ইসলাম শাসন-কাঠামোকে তেমনটা বলার সু্যোগ নেই। তাই ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ‘মুসলমান’ শব্দটি বার বার ব্যবহৃত।

ইংরেজরা এ দেশে ধর্মকর্ম বা ধর্মস্থানে তেমন আঘাত না করলেও, মুসলিম শাসকরা শয়ে শয়ে মন্দির ধ্বংস করেছেন, ধর্মগুরুদের হত্যা করেছেন, জিজিয়া কর, ধর্মান্তরকরণের মাধ্যমে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের জীবন অতিষ্ঠ করেছেন। তা হলে ইসলামি শাসনে অত্যাচারিত, বিদ্রোহী চরিত্রগুলির সংলাপ মুসলিম-বিদ্বেষী হবে, এটাই তো স্বাভাবিক।

পত্রলেখক ‘বন্দে মাতরম্’কে পৌত্তলিক, সাম্প্রদায়িক বলেছেন। স্বামীজির কাছে ভারতবর্ষ মাতৃস্বরূপ ছিল। বহু বিপ্লবীর প্রেরণা ছিল গীতা। তাঁরা মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিতেন কালীমন্দিরে। তা হলে তো তাঁদের সবাইকেই সাম্প্রদায়িক বলতে হয়।

পিছিয়ে পড়া শ্রেণি, শোষিত মুসলিমদের নিয়েও বঙ্কিমচন্দ্রের অনেক রচনা রয়েছে। সেগুলির উল্লেখ না করে, কেবলমাত্র সনাতন ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতির ওপর রচিত সাহিত্যগুলির মাধ্যমেই হেলালউদ্দীন সাহেব বঙ্কিমদর্শন করেছেন। আসলে ভণ্ড সেকুলারিজ়মের দোহাই দিয়ে হাজার হাজার বছরের প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিকে সাম্প্রদায়িক বলে দাগিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা এখনও প্রবল ভাবে বিদ্যমান। উনি সম্ভবত সেই স্রোতেই গা ভাসিয়েছেন।

মন্দার গোস্বামী

খাগড়া, মুর্শিদাবাদ

 

‘হিন্দু’ ধর্ম নয়

কেবলমাত্র ‘আনন্দমঠ’ বই দিয়ে বিচার করেই কিন্তু আমরা বঙ্কিমচন্দ্রকে সাম্প্রদায়িক বলতে পারি না। মনে রাখতে হবে, ‘আনন্দমঠ’ বিশেষ ভাবে সন্ন্যাসী বিদ্রোহঘটিত দেশজোড়া লুটতরাজের ভূমিকাতেই রচিত। আসল কথা, তুর্কি বিভীষিকার যে কোনও সমালোচনাই এ যুগে ‘মুসলিম বিদ্বেষ’ হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করেছে। বঙ্কিমচন্দ্র ‘আনন্দমঠ’ বইয়ে একটা ঐতিহাসিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতেই চেয়েছেন। তার মধ্যে ব্যক্তিগত ঘৃণার কোনও স্থান ছিল না।

আর ‘হিন্দু’ কোনও ধর্ম নয়, এ কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘হিন্দু শব্দে এবং মুসলমান শব্দে একই পর্যায়ের পরিচয়কে বুঝায় না। মুসলমান একটি বিশেষ ধর্ম, কিন্তু হিন্দু কোনও বিশেষ ধর্ম নহে। হিন্দু ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি জাতিগত পরিণাম।’’ (রবীন্দ্র রচনাবলি, ১৩ খণ্ড, পৃ ১৭৫)। সুতরাং বঙ্কিমচন্দ্র যদি ভারতীয় ও হিন্দুকে একই অর্থে ব্যবহার করে থাকেন তবে তা ভুল নয়।

ভারতীয় সংবিধানে ভারতীয় সংস্কৃতিকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাই আমরা দেখতে পাই মূল সংবিধানে শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের ছবি রয়েছে। বন্দে মাতরম্ স্তোত্রে ভারতমাতার সঙ্গে মা দুর্গার তুলনা করা হয়েছে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো ভারতমাতারও রূপদান করেছেন তুলির সাহায্যে।

তরুণ কুমার পণ্ডিত

কাঞ্চন তার, মালদহ

 

ইংরেজপ্রেমী

মুসলমান জাতির প্রতি বঙ্কিমের ধারণা কী ছিল তার একটা নমুনা: ‘‘ঢাকাতে দুইচারিদিন বাস করিলেই তিনটি বস্তু দর্শকদের নয়নপথের পথিক হইবে— কাক, কুকুর এবং মুসলমান। এই তিনটিই সমভাবে কলহপ্রিয়, অতি দুর্দ্দম, অজেয়। ক্রিয়া বাড়ীতে কাক আর কুকুর, আদালতে মুসলমান।’’ (বঙ্গদর্শন)। শুধু সাম্প্রদায়িক নয়, বঙ্কিমকে ইংরেজপ্রেমিক এবং দেশদ্রোহী বলতেও বাধা নেই। আনন্দমঠে লিখেছেন, ‘‘মুসলমানের পর ইংরেজ রাজা হইল, হিন্দু প্রজা তাহাতে কথা কহিল না। বরং হিন্দুরাই রাজ্য জয় করিয়া ইংরাজকে দিল। কেননা হিন্দুর ইংরাজের উপর ভিন্ন জাতীয় বলিয়া কোন দ্বেষ নাই।’’ দেশবাসীর স্বাধীনতার স্বপ্নকে বঙ্কিম ব্যঙ্গ করে লিখলেন, ‘‘স্বাধীনতা দেশী কথা নহে, বিলাতী আমদানী, লিবার্টি শব্দের অনুবাদ... ইহার এমন তাৎপর্য্য নয় যে, রাজা স্বদেশীয় হইতেই হইবে।’’ আরও লিখলেন, ‘‘ইংরেজ ভারতবর্ষের পরম উপকারী। ইংরেজ আমাদিগকে নতুন কথা শিখাইতেছে... যে সকল শিক্ষার মধ্যে অনেক শিক্ষা অমূল্য। যে সকল অমূল্য রত্ন আমরা ইংরেজদের চিত্তভাণ্ডার হইতে লাভ করিতেছি, তাহার মধ্যে দুইটি... স্বাতন্ত্র্যপ্রিয়তা এবং জাতিপ্রতিষ্ঠা। ইহা কাহাকে বলে হিন্দু জানিত না।’’ (বঙ্কিম রচনাবলি, পৃ ২৪০)।

দেশের তাঁতশিল্পকে ধ্বংস করে সরকার গরিব মুসলিম তাঁতশিল্পীদের ভাতে মারল। বঙ্কিম লিখলেন, ‘‘তাহার তাঁত বোনা ব্যবসায় লোপ পাইয়াছে বটে, কিন্তু সে অন্য ব্যবসা করুক না কেন?... তাঁত বুনিয়া আর খাইতে পায় না, কিন্তু ধান বুনিয়া খাইবার কোন বাধা নাই।’’ (বঙ্কিম রচনাবলি, ২য় খণ্ড, পৃ ৩১১)।

ইংরেজপ্রেমিক বঙ্কিম ১৮৯৪ সালে মৃত্যুর মাত্র কিছু দিন পূর্বে সরকারের কাছ থেকে সিআইই (কম্প্যানিয়ন অব দি ইন্ডিয়ান এম্পায়ার) খেতাব লাভ করেন, যার অর্থ ‘ভারত সাম্রাজ্যের সহযোগী’।

মনিরুল ইসলাম তপন

বসিরহাট, উত্তর ২৪ পরগনা

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।