সম্পাদক সমীপেষু: অমিত বঙ্কিম কথা


বঙ্কিমচন্দ্রের নামে যে স্মারক-বক্তৃতা, তাতে প্রধান বক্তা হওয়ার যোগ্যতা সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলের হিন্দিভাষী (এবং সম্ভবত বাংলাভাষা পড়তে বা লিখতে না-জানা) তথা সাহিত্যের সঙ্গে বিন্দুমাত্র-সংসর্গহীন সভাপতির আছে কি না, সেটা আয়োজকরাই জানেন। তবে উনিশ শতকের নবজাগরণের ভরকেন্দ্র কলকাতায় বসে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের ছবি সামনে রেখে যে সব ইতিহাসবিরোধী বক্তব্য গলা উঁচিয়ে বলে গেলেন, তাতে আমরা স্তম্ভিত।

সে দিনের মঞ্চে হাজির বিদ্বজ্জনরা, যাঁরা হয়তো ওই দিনের প্রধান বক্তার থেকে বঙ্কিমচন্দ্র বিষয়ে কোনও নতুন ভাবনার দিগন্তকে স্পর্শ করার অভিলাষে ওই সাড়ম্বর সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা কোনও অপরাধবোধে আদৌ আক্রান্ত কি না তার হদিস আমরা জানি না। তাঁর সে দিনের বক্তব্যের নির্যাস— ‘বন্দে মাতরম’-এর পুরো অংশ গাইতে না দেওয়ার সঙ্গে দেশভাগের বিচিত্র সূত্র আবিষ্কার— চূড়ান্ত এক অভিসন্ধিময় অনৈতিহাসিক ধারণার প্রকাশ, যাকে সর্বতো ভাবে নিন্দা জানানো প্রয়োজন।

আসলে বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার পাদপূরণের জন্য এই কবিতা রচনা করেন ১৮৭০-এ, পরে ১৮৮২-তে সেটি ‘আনন্দ মঠ’ উপন্যাসে ব্যবহার করেন কবিতা হিসেবেই। সেই সময়ে যদুনাথ ভট্টাচার্যকে এর সুর করার জন্য বঙ্কিম অনুরোধ করলেও, সেই সুরের কোনও হদিস পাওয়া যায় না। কারণ, সেই সময় রেকর্ডিং প্রযুক্তি এই দেশে আসেনি। পরে রবীন্দ্রনাথ গানটিতে প্রথম সুরারোপ করে (প্রথম দুই স্তবক) সেটি গ্রামোফোন ডিস্কে রেকর্ড করেন (১৯০৭), প্রযুক্তিগত কারণেই সম্পূর্ণ গানটি রেকর্ড করা সম্ভব ছিল না। এর পরে বহু শিল্পী এই কবিতায় সুর করেছেন এবং সেটা প্রথম দুই স্তবকেই।

সুতরাং গান হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’-এর জন্মই হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রয়াণের পর। আর স্বাধীনতার লড়াইয়ে এই লেখাটি গান হিসেবেই লোকপ্রিয় ও জাতীয়তাবোধের উদ্বোধক হিসেবে অনুঘটকের ভূমিকা নিয়েছে এবং সেখানেও তার আবেদন সীমিত ছিল প্রথম দুই স্তবকের মধ্যে, কারণ বাকি অংশটিতে সুরারোপ করা হয়েছিল, এমন কোনও তথ্য আমাদের জানা নেই। তা হলে তার খণ্ডাংশ বাদ দেওয়ার প্রশ্ন এল কোথা থেকে, ‘বঙ্কিম গবেষক’ নেতা এই বিষয়ে আলোকপাত করলে ভাল করতেন।

জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এই গানের মহতী ভূমিকার কথা মনে রেখে ১৯৩৭ সালে কংগ্রেসের অধিবেশনে এই গানের প্রথম দু’টি স্তবক ‘ন্যাশনাল সং’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তার আগে রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে একটি কমিটি এই প্রস্তাবকে আলোচনা করে অনুমোদন করেন। এই সব যখন ঘটছিল, তখন বিজেপির আদি পিতা আরএসএস নীরব ছিল, কারণ ‘বন্দে মাতরম’ গলায় নিয়ে তাদের এক জন নেতাও রাজদ্রোহে গ্রেফতার হননি বা ফাঁসিতে ঝোলেননি, নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তাঁরা বরং বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অনুগামীর ভূমিকা পালন করে গিয়েছেন। আজ তাঁদের উত্তরসূরির মুখে এই সব আবোলতাবোল কথা আমাদের বিচারবোধ ও ইতিহাসচেতনাকে আহত করে।

বঙ্কিমচন্দ্রকে সামনে রেখে এই সব বক্তব্য রাখার একটা দিক হল, এই ভুল ইতিহাসের সঙ্গে তাঁকে সুকৌশলে জড়িয়ে নেওয়া। আমরা বঙ্কিমচন্দ্রকে এক জন প্রথম শ্রেণির গদ্যশিল্পী বলেই ভাবতে অভ্যস্ত, তিনি বাংলা আখ্যানসাহিত্যের প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করে দিয়ে আমাদের ঋণী করেছেন। তাঁর সময়কালে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ পূর্ণ পুষ্টি পায়নি, তবু আমাদের চেতনায় দেশপ্রেমের বীজ যেমন তিনি বপন করেছেন, তেমনই বাংলা গদ্যে যে লাবণ্যময় মানবিক সাহিত্যের সৃজন সম্ভব, সম্ভব নানা সামাজিক বিষয়ের বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন নির্মাণ, তা তিনি হাতে ধরে দেখিয়ে বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।

এর পরেও তাঁকে সামনে রেখে যাঁরা ভেদবুদ্ধির সর্বনাশা খেলায় মেতেছেন এবং যাঁরা একে প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে উদ্বাহু প্রশ্রয় দিচ্ছেন, নিখাদ ধিক্কার ছাড়া তাদের জন্য আর কিছুই পড়ে থাকে না।

প্রবুদ্ধ বাগচী  কলকাতা-৫২

 

পুকুর বুজিয়ে

বাসযোগ্য জমির চাহিদা যতই বাড়ছে, আধা শহর থেকে শুরু করে, অজ পাড়াগাঁয়েও পুকুর বোজানো পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। জলাশয়ের মালিক প্রোমোটারের কৌশল মতো প্রথমে পুকুর পরিষ্কার না করে, জল পচিয়ে ব্যবহারের অযোগ্য করে তোলেন, আশপাশের মানুষ আবর্জনা ফেলতে থাকে, তাতেও মালিকের আপত্তি থাকে না। স্থানীয় মানুষ ভাবে, পচা জলে পরিবেশ দূষিত হবে, তার চেয়ে বুজে যাওয়া ভাল। কিছুটা বুজে যাওয়ার পর জলাশয়ের চার পাশ টিন দিয়ে ঘিরে লোকচক্ষুর আড়াল করা হয়। রাতারাতি মাটি অথবা সাদা বালি দিয়ে বাকি অংশ ভরাট করা হয়। ইতিমধ্যেই চলতে থাকে প্রোমোটারের সঙ্গে স্থানীয় ক্লাবের দাদা, এমনকি জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের রসালো রফা। দিঘির বুকে দাঁড়িয়ে পড়ে সুদীর্ঘ অট্টালিকা, আকাশ আটকে যায় আমাদেরই উদাসীনতায়।

স্বপনকুমার ঘোষ  মধ্য ঝোড়হাট, হাওড়া

 

একটি প্রশ্ন

রাস্তায় যেতে যেতে এক কালী মন্দিরে দেখলাম মা কালীর মূর্তির মুখ বস্ত্রাচ্ছাদিত। কৌতূহলের উত্তরে জানলাম যে অম্বুবাচি চলছে, তাই মূর্তির মুখ দেখা যাবে না। এই অধমের পাপ ও অজ্ঞানতাপূর্ণ মনে ক’টি প্রশ্ন জেগেছে।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে অম্বুবাচির সময়ে মাতা বসুন্ধরা ঋতুমতী হন। তাই এই তিন দিন কৃষকরা ধরণীর বুকে কর্ষণের কাজ বন্ধ রাখেন। এর সঙ্গে সমস্ত মন্দিরের দেবীমূর্তির মুখ বস্ত্রাচ্ছাদিত করার বিধান কে দিলেন? তা হলে কি ওই দিনে একই সঙ্গে সমস্ত দেবীরা ঋতুমতী হন? দেবীরাও কি মানবীর মতো ঋতুমতী হন? সমস্ত দেবদেবীর জন্মই তো অযোনিজ। তা হলে কী ভাবে তাঁদের শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলি মানবানুসারী হবে? তাঁরা তো জাগতিক এই প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে!

সর্বোপরি যে প্রশ্নটি মনে জাগছে: কোনও মানবী যখন ঋতুমতী হন, তিনি কি এই সাধারণ ও স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার জন্য তাঁর সন্তান ও পরিজন তথা অন্য মানুষদের সামনে এ ভাবে বস্ত্রাচ্ছাদিত মুখে নিজেকে উপস্থাপিত করেন? কোনও প্রাজ্ঞ ব্যক্তি এই সন্দেহ নিরসন করলে বাধিত হব।

পরিমল সমাদ্দার  কলকাতা-৯৬

 

গণ্ডিতে নেই

 ‘সমাবর্তনে ধর্ম কেন’ (২৮-৬) শীর্ষক নির্মল সাহার চিঠির প্রেক্ষিতে এই চিঠি। উনি লিখেছেন, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বেদগান, স্বামী আত্মপ্রিয়ানন্দের দীক্ষান্ত ভাষণ— এগুলি ধর্মীয় আচার এবং উদার জ্ঞানচর্চার পথের কাঁটা। এই প্রসঙ্গে বলি, যে কোনও দেশে কিছু অনুষ্ঠান, কিছু উচ্চারণ যুগের পর যুগ ধরে পালিত হতে হতে তা ওই দেশের ঐতিহ্যে পরিণত হয়, সেটা আর বিশেষ কোনও ধর্মের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না। প্রাচীন কাল থেকে ভারতে কিছু অনুষ্ঠান চলে আসছে— বেদগান, সরস্বতী পুজো এগুলো তাই ভারতের ঐতিহ্য; রবীন্দ্রনাথ এ সব ভাল করেই জানতেন। সে জন্যই তিনি এই পদ্ধতিগুলো বিশ্বভারতীর অঙ্গ করে নিয়েছিলেন।

বিনয়ভূষণ দাশ  গোপজান, মুর্শিদাবাদ

 

বিশ্বকাপ

মাঝে মাঝেই বিশ্বকাপ ফুটবল হলে, এ দেশে ক্রিকেটের দাপটটা একটু কমে! লোকে বোঝে, পৃথিবীতে অন্য খেলাও অাছে।

প্রিয়ম সাহা  কলকাতা-৩৩

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ই-মেলে পাঠানো হলেও।