Education System in Bengal

সম্পাদক সমীপেষু: নাগরিক প্রত্যাশা

এক দিকে যেমন আট হাজারের উপর সরকারি ও সরকারপোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উঠে গিয়েছে, তেমনই স্কুলছুটের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে।

শেষ আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ ০৭:৫৯
Share:

দিলীপ ঘোষের ‘দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা’ (১৩-৫) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে কিছু প্রত্যাশা মানুষের থাকবে, বিশেষত যেখানে আগের সরকার বিষয়ে জনগণের অভিজ্ঞতা খুব ভাল নয়। প্রথম প্রত্যাশা ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন। এ প্রসঙ্গে প্রবন্ধকার ২০০৫-এর বিহারের আইনশৃঙ্খলার কথা বলেছেন। সত্যিই তখন বিহার একটি অবক্ষয়ী আইনের শাসনের দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিহারের উপর দিয়ে যাওয়া দূরপাল্লার ট্রেনগুলি রাতের দিকে নিরাপদ ছিল না। সেই বিহারে ধীরে ধীরে হলেও আইনের লাগাম পরিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। সাধারণ মানুষের চাহিদা খুব অল্প, প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে সেটি পূরণ করতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। পুলিশকে দলদাসে পরিণত না করে তাকে নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করতে দেওয়া হোক, যাতে পুলিশের উপর মানুষের ভরসা ফিরে আসে। রাজ্যে আইনের শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হলে, সমাজে অপরাধ ও অপরাধীর সংখ্যা কমবে।

গত জমানায় সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছিল সরকারি শিক্ষায়। এক দিকে যেমন আট হাজারের উপর সরকারি ও সরকারপোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উঠে গিয়েছে, তেমনই স্কুলছুটের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। স্কুলগুলি উপযুক্ত সংখ্যক শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে। শিক্ষক নিয়োগের নিয়মমাফিক প্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়ে পড়ে ছিল দীর্ঘ দিন। উচ্চশিক্ষার দিকে ছাত্রছাত্রীরা যাচ্ছে কম, কারণ তারা দেখেছে শিক্ষক নিয়োগে কী চরম দুর্নীতি এই রাজ্যে ঘটে গিয়েছে। সুতরাং সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর দিকে মন দিয়ে অন্তত তাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সরকারের আশু কর্তব্য।

একই সঙ্গে কৃষক যাতে ফসলের ন্যায্য মূল্য পান, মধ্যস্বত্বভোগীরা যাতে কৃষকের লাভের পথে কাঁটা হয়ে না দাঁড়ান, যথেষ্ট হিমঘর গড়ে তুলে ফসল যাতে অনেক দিন পর্যন্ত সেখানে রাখা যায়, তার ব্যবস্থা করা উচিত। একই সঙ্গে রাজ্যে মাঝারি থেকে বড় শিল্পের আগমনও একান্ত ভাবেই প্রয়োজন। শুধু প্রতিযোগিতামূলক ভাতা নীতি ছেড়ে মানুষের কর্মসংস্থানের পরিসর বাড়ানো এখন গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

দিলীপ কুমার সেনগুপ্তবিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

প্রকৃত ছবি

দিলীপ ঘোষ তাঁর ‘দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা’ প্রবন্ধে সরকারের কাছে এক প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের চারটি প্রত্যাশার কথা শুনেছিলেন। প্রবন্ধকার উপলব্ধি করেছেন যে, ‘প্রান্তিক শ্রমজীবী’ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তিনি লিখেছেন, “রাজ্যের নতুন শাসকদের কাছে আমার আবেদন— এই অসম্পূর্ণ, অথচ মৌলিক প্রত্যাশাগুলোকেই যেন অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।”

এই প্রসঙ্গে কিছু কথা। প্রথমত, ভারতের সংবিধানে এবং ডেভলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর গঠনকাঠামোয় কি ‘শাসক’ শব্দটি কোথাও আছে? ভারতের সংবিধান একটি প্রজাতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যা শাসকের পরিবর্তে রাষ্ট্রপ্রধান, অর্থাৎ ভারতের রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের মাধ্যমে মৌলিক ভাবে সংজ্ঞায়িত। সকলেই জানেন যে, সংবিধান অনুসারে সর্বোচ্চ ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তা প্রয়োগ করা হয়, যার লক্ষ্য একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। সুতরাং, গণমাধ্যমে বহুল প্রচলিত ‘শাসক’ শব্দটি নির্বাচিত প্রতিনিধি ও নির্বাচকদের মধ্যে রাজা-প্রজার সম্পর্কের ভ্রান্ত ধারণার জন্ম দেয়, যা সংবিধানের মূল দর্শন-বিরোধী।

দ্বিতীয়ত, প্রবন্ধে আছে “প্রথম প্রত্যাশা— ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন।” যদিও ভারতীয় ঐতিহ্যে ন্যায়শাস্ত্র এবং ন্যায়বিচারের ধারণা পুরোপুরি এক নয়, কিন্তু এ দু’টি গভীর ভাবে সম্পর্কিত। ভারতীয় আইন ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার ঐতিহ্যে, ‘ন্যায়’ বলতে ন্যায়বিচারের প্রকৃত অভিজ্ঞতা বা ‘বাস্তবায়িত ন্যায়বিচার’কে বোঝায়। অমর্ত্য সেনের মতে, এই বিষয়টি বোঝার জন্য নীতি ও ন্যায়ের মধ্যে পার্থক্যই মূল চাবিকাঠি। ‘নীতি’ বলতে প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচার, নিয়মকানুন এবং কার্যপ্রণালীকে বোঝায়। ‘ন্যায়’ শব্দটি ব্যাপক ও বাস্তবায়িত ন্যায়বিচারকে বোঝায়, যা ফলাফলের উপর আলোকপাত করে। প্রশ্ন, প্রবন্ধকার কোন ধরনের ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন? তিনি কি আইন ভাঙার জন্য অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার প্রতিশোধমূলক ন্যায়বিচার পদ্ধতি প্রত্যাশা করেন, না কি সংলাপ এবং পুনর্বাসনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করার পুনরুদ্ধারমূলক ন্যায়বিচার প্রত্যাশী?

তৃতীয়ত, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে ‘ভবিষ্যতের সমতা ও সক্ষমতার বীজ বপন হয়’— এই বক্তব্যটি কোন সমতার কথা বলল? সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম ২০২৩’-এর তথ্য অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গে ৬.৩% মেয়ের ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয় এবং সংবাদপত্রের ‘পাত্রপাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপনে বিবাহের প্রাথমিক শর্তে থাকে জাত-গোত্র পরিচয়। শিক্ষাগত ও কর্মগত যোগ্যতা স্থান পায় পরবর্তী শর্তে। এই সংস্কৃতিতে কি আদৌ ‘সমতা ও সক্ষমতার বীজ বপন’ হওয়া নিশ্চিত হবে?

চতুর্থত, স্বাস্থ্যপরিষেবা সংক্রান্ত ভাবনায় হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন কমানোর পরামর্শটি সুন্দর। কিন্তু সেটি নিশ্চিত করতে গেলে জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত যে আন্দোলন বিগত সাত দশক ধরে গড়ে ওঠা প্রয়োজন ছিল এবং যা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি, সেই বিষয়ে প্রবন্ধকার নীরব থাকায়, প্রত্যাশা পূরণের দাবিটি কি দিশাহীন হয়ে গেল না?

অনিরুদ্ধ রাহা, কলকাতা-১০

পরিবর্তনের রায়

‘দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা’ প্রবন্ধটি বাস্তবধর্মী। মানুষের বিপুল সমর্থন নিয়ে রাজ্যে নতুন সরকার এসেছে। ভূতপূর্ব সরকারের আমলে নাগরিক অধিকারের প্রধান পাঁচটি স্তম্ভ— শিক্ষা স্বাস্থ্য খাদ্য বাসস্থান এবং কর্মসংস্থান বাংলার মানুষকে হতাশ করেছে। এই হতাশায় কিছুটা প্রলেপ দেওয়ার জন্য তৃণমূল সরকার দান-খয়রাতিতে বেশি মনোনিবেশ করেছিল। শুরু হয়েছিল বিভিন্ন জনমোহিনী প্রকল্প। কিন্তু এই পনেরো বছরে বিভিন্ন দফতরে দুর্নীতি ছাড়া রাজ্যে বড় কোনও শিল্প আসেনি, হয়নি কোনও উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান। উল্টে স্কুল-কলেজগুলির বেহাল দশা। তাই বিভিন্ন ভাতার সুবিধা পেলেও নাগরিক নিজের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায়, শুধু ভাতা দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায় না, দেনা-পাওনা রাজনীতির মুখ্য বিষয় হতে পারে না।

স্বপন আদিত্য কুমার বিশ্বাস, অশোকনগর, উত্তর ২৪ পরগনা

আস্থা জরুরি

গণতন্ত্র রক্ষার বীজমন্ত্র সুশাসন। যদিও গণতন্ত্রে শাসকের পরিবর্তে ‘পরিচালক’ কথাটি বেশি যুক্তিযুক্ত। এ বারের ভোটের ফলাফলে বোঝা গেল দয়া নয়, প্রয়োজন আস্থা অর্জন। সন্তুষ্টি নয়, মানুষ চায় উন্নয়ন। স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত চাহিদা— এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। কেননা মুক্ত বুদ্ধি মানুষের মৌলিক চাহিদার ভিতকে দৃঢ় করে। এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র জোগায়। খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের পাশাপাশি দরকার সুশিক্ষা।

গত দশ বছরে বাংলার প্রশাসন ভেঙে পড়েছিল। দুর্নীতির জাঁতাকলে পিষে যাচ্ছিল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা। বঞ্চিত হচ্ছিল শিক্ষিত সমাজ। সরকারি ব্যবস্থার প্রতি বাড়ছিল অনাস্থা। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল। দল আর প্রশাসনকে গুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের প্রত্যাশা, বর্তমান সরকার অন্তত সেই নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেবে। নিয়ম মানার অভ্যাসটি যেন গড়ে ওঠে সর্বত্র। নয়তো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অর্থহীন হয়ে পড়বে।

দীপায়ন প্রামাণিক, গোবরডাঙা, উত্তর ২৪ পরগনা

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন