দলের মধ্যে থেকেই সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলে শিম্পাঞ্জিরা। —ফাইল চিত্র।
জীবনে চলার পথে কত জনের সঙ্গেই না আমাদের আলাপ হয়! কোনও পরিচয় আলাপেই থেমে থাকে, কোনওটি আরও নিবিড় হয়। পছন্দের ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে আমরা বন্ধুত্ব পাতাই। ছোটবেলায় স্কুল বা কলেজের সহপাঠীদের নিয়ে বন্ধুবৃত্ত বড় হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমে ছোট হয়ে আসে। পছন্দের মানুষজনের সান্নিধ্য খুঁজে নেওয়া, তাঁদের কেন্দ্র করেই পছন্দের বৃত্তে আবর্তিত হওয়া মানুষের সাধারণ প্রবণতা। সামাজিক জীব হিসাবে মানুষ সম্পূর্ণ একা থাকতে পারে না। বেঁচে থাকার জন্য মানসিক ভাবে তার কোনও না কোনও অবলম্বন প্রয়োজন হয়। সম্প্রতি মানুষের এই ধরনের প্রবণতাগুলিই আরও কিছু জীবের মধ্যে দেখতে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা তাদের মধ্যে অন্যতম শিম্পাঞ্জি!
শিম্পাঞ্জি মানুষের পূর্বপুরুষ নয়। বরং, যে পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়ে আধুনিক মানুষের জন্ম, সেই একই পূর্বপুরুষ থেকে ভিন্ন ধারায় বিবর্তিত হয়েছে শিম্পাঞ্জিরাও। নেদারল্যান্ডসের ইউটরেক্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্পেনের কার্লোস ৩ ইউনিভার্টিসি অফ মাদ্রিদের বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এই শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। তাদের চালচলন, মেলামেশায় সামাজিক বৃত্তের উপস্থিতি টের পাওয়া গিয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, শিম্পাঞ্জিরাও মানুষের মতো সামাজিকতায় পটু। তারা আমাদের মতোই বন্ধুত্ব পাতায়, নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। প্রাচীনকাল থেকে জটিল সামাজিক সম্পর্কগুলি কী ভাবে বিকশিত হয়ে এসেছে, সে সম্পর্কে নতুন করে আলোকপাত করছে শিম্পাঞ্জিদের এই গবেষণা। এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘আইসায়েন্স’ পত্রিকায়।
শিম্পাঞ্জিদের পাশাপাশি আফ্রিকান বোনোবোদের নিয়েও কাজ করেছেন বিজ্ঞানীরা। একটি দলের মধ্যে তারা কী ভাবে একে অপরের সামনে নিজেদের উপস্থাপিত করে, শারীরিক পরিচ্ছন্নতা, চেহারা সম্পর্কে কে কেমন সচেতন, নিবিড় ভাবে দীর্ঘ দিন ধরে তা লক্ষ্য করা হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ‘সামাজিক গ্রুমিং’ বানর প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপ়ড়া ও বন্ধুত্ব গড়ে তোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। গাণিতিক ম়ডেল ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা শিম্পাঞ্জি ও বোনোবোদের সামাজিক আচরণ বিশ্লেষণ করেছেন। দেখা গিয়েছে, অধিকাংশ প্রাণীই নির্দিষ্ট কয়েক জনকে বেছে নিয়ে তাদের সঙ্গে বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছে। বাকিদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বা সম্পর্কের গভীরতা তুলনায় অনেক কম। সচেতন ভাবেই চলছে এই সঙ্গী বাছাই এবং সময় কাটানোর কাজ। মানুষের গোছানো সামাজিক বৃত্তের সঙ্গেই এর সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, তুলনামূলক বড় গোষ্ঠীর মধ্যে বসবাসকারী শিম্পাঞ্জিরা বন্ধুবৃত্ত বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বেশি খুঁতখুঁতে হয়ে থাকে। এ বিষয়ে তারা তুলনামূলক বেশি বাছাই করে। তবে শিম্পাঞ্জিদের সঙ্গে বোনোবোদের সামাজিক আচরণে কিছু তফাৎ রয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বোনোবোরা গোষ্ঠীর সদস্যদের সকলের সঙ্গেই আলাপচারিতায় সমান সময় দেওয়ার চেষ্টা করে। তাতে তুলনামূলক সমতাভিত্তিক সামাজিক কাঠামো গড়ে ওঠে। তবে শিম্পাঞ্জিরা তা করে না। তারা গোষ্ঠীর মধ্যে থেকে গুটিকয়েক সঙ্গী বেছে নিয়ে তাদের সঙ্গেই সময় কাটায়। সেখানেই তাদের মনযোগ কেন্দ্রীভূত।
মানুষ যেমন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুবৃত্ত ছোট করে নেয়, শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও সেই ধারা অব্যাহত। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের বন্ধুর সংখ্যা কমে আসে। তারা মেলামেশা অনেক কমিয়ে দেয়। বোনোবোদের ক্ষেত্রে অবশ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক বৃত্তের সংকোচন এত প্রকট নয়। ইউটরেক্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এডউইন ভান লিউয়েন বলেন, ‘‘বোনোবোদের সমতাভিত্তিক সামাজিক কাঠামোই এর জন্য দায়ী। তারা তুলনামূলক বেশি সাবলীল ভাবে সম্পর্কে থাকে। তাদের সামাজিক বন্ধন কখনও কখনও গোষ্ঠীর সীমাও অতিক্রম করে যায়। শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে সেটা দেখা যায় না।’’ শিম্পাঞ্জি সংক্রান্ত গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন এডউইনই। তিনি মনে করেন, সামাজিক বন্ধন ও সম্পর্ক গড়ে তোলার মৌলিক নিয়মগুলি সব প্রজাতির ক্ষেত্রেই সমান। এর থেকেই জটিল সমাজব্যবস্থা গঠনে বিবর্তনের ধারাবাহিকতা প্রকাশ পায়।