El Nino Impact in India

এল নিনোকেও আটকে দিতে পারে! এ বছর কেন নিষ্ক্রিয় ভারতের ‘রক্ষাকবচ’! কতটা ভয়ঙ্কর প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোত

প্রতি গ্রীষ্মে সূর্যের প্রখর তাপে ভারতীয় উপমহাদেশ যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, ভারত মহাসাগর থেকে আর্দ্র বায়ু স্থলভাগের দিকে ছুটে আসে। ভারতে বর্ষার বৃষ্টির জন্য দায়ী এই মৌসুমি বায়ু।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ ০৯:০১
Share:

প্রশান্ত মহাসাগর থেকে উষ্ণ স্রোত এসে ব্যাঘাত ঘটায় ভারতের বর্ষায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

এল নিনোর প্রভাবে এ বছর ভারতে বর্ষার বৃষ্টিতে ঘাটতি বেশি হবে, আগেই জানিয়ে দিয়েছে মৌসম ভবন। ফলে দেশের বিস্তীর্ণ অংশে বর্ষাকালে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হতে চলেছে। উষ্ণ জুন মাসের পূর্বাভাস দিয়ে দিয়েছেন আবহবিদেরা। জুলাই-অগস্টেও বৃষ্টির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকবে। এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের একটি উষ্ণ জলস্রোত। মাঝেমধ্যেই ভারতীয় উপমহাদেশের বর্ষায় ওই স্রোত ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। তবে এই পরিস্থিতি প্রতি বছর তৈরি হয় না। কোনও কোনও বছর ভারতকে ‘রক্ষা’ করে আমাদের আপন ভারত মহাসাগরই। এল নিনোর বিরুদ্ধে সেখানে এক আশ্চর্য প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এ বছর তা হচ্ছে না। তাই এল নিনোর প্রভাব নিয়ে এ বছর আবহবিদ এবং পরিবেশবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

Advertisement

ভারতে বর্ষামঙ্গল

ভারতে বর্ষার বৃষ্টির জন্য দায়ী মৌসুমি বায়ু। প্রতি গ্রীষ্মে সূর্যের প্রখর তাপে ভারতীয় উপমহাদেশ যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, ভারত মহাসাগর থেকে আর্দ্র বায়ু স্থলভাগের দিকে ছুটে আসে। উঁচু পার্বত্য অংশে ধাক্কা খেয়ে তা বৃষ্টি ঝরায়। দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ভারত মহাসাগরের উত্তরাংশ হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার উপমহাদেশীয় অঞ্চলের দিকে এই হাওয়া বয়। ভারতের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের ৭৫ শতাংশের নেপথ্যে রয়েছে এই বায়ুই। ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। এখানে মোট উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ৫৬ শতাংশ বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর উপর ভারতের অর্থনীতিও অনেকাংশে নির্ভর করে থাকে।

এল নিনো কী

কয়েক বছর অন্তর প্রশান্ত মহাসাগরে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী যে বাতাস সাধারণত উষ্ণ জলকে ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়, সেই বাতাস হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে উষ্ণ জল আবার পূর্ব দিকে ফিরে আসে এবং দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ঘেঁষে বইতে থাকে। এই স্রোতের প্রভাবে মধ্যপ্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অংশ উষ্ণ হয়ে ওঠে। বইতে শুরু করে উষ্ণ স্রোত। একেই বলে এল নিনো। স্প্যানিশ শব্দ ‘এল নিনো’-র অর্থ ‘ছোট্ট ছেলে’। শত শত বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার মৎস্যজীবীরা প্রশান্ত মহাসাগরে এই অস্বাভাবিক স্রোত লক্ষ্য করেছিলেন। স্রোতের নামকরণও করেছিলেন তাঁরা।

Advertisement

বর্ষায় বাধা কী ভাবে

দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বমুখী আর্দ্র মৌসুমি বায়ুর জন্য হাপিত্যেশ করে থাকে গ্রীষ্মের দাবদাহে তপ্ত ভারতীয় উপমহাদেশ। কিন্তু এল নিনো এই প্রক্রিয়াতেই বাধা দেয়। বায়ুমণ্ডলের উষ্ণ বায়ুর যে ঊর্ধ্বগামী স্তম্ভগুলি মেঘ তৈরি করে, সেগুলিকে এই স্রোত ঠেলে দেয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে। ফলে ভারতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা পৌঁছোতেই পারে না। দুর্বল হয়ে পড়ে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৫১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬০ শতাংশ এল-নিনোর বছরে ভারতে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি দেখা গিয়েছে।

ভারতের ‘ত্রাতা’

কোনও কোনও বছরে এল নিনোর হাত থেকে ভারতের বর্ষাকে রক্ষা করে ভারত মহাসাগর নিজেই। তাই এই মহাসাগরই ভারতের ‘রক্ষাকর্তা’। এই সমস্ত ক্ষেত্রে পূর্ব আফ্রিকার উপকূল সংলগ্ন ভারত মহাসাগরের পশ্চিম দিক উষ্ণ হয়ে ওঠে। আবার, ইন্দোনেশিয়া সংলগ্ন পূর্ব দিক ঠান্ডা হয়ে যায়। একই মহাসাগরের পূর্ব-পশ্চিমের এই তাপমাত্রার তারতম্যকে বলে ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরুকরণ বা ডাইপোল (আইওডি)। এই পরিস্থিতি তৈরি হলে ভারত মহাসাগরের উষ্ণ পশ্চিমাংশ আর্দ্রতাপূর্ণ বায়ুকে অতিরিক্ত শক্তি দিয়ে উপমহাদেশের দিকে টেনে আনে। ফলে আসে বৃষ্টিও। এই পর্যায়ে পশ্চিম ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। পূর্বে সেই কারণেই জল থাকে শীতল। ভারত মহাসাগরের এই আইওডি শক্তিশালী হলে এল নিনো কাজ করতে পারে না। আইওডি যে বছর দুর্বল থাকে, এল নিনোর প্রভাবে বর্ষায় ঘাটতি সে বছর অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

কী হবে এ বছর

২০০২ এবং ২০১৫ সালে এল নিনোর সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল ভারতে। দুই বছরই বর্ষার বৃষ্টিতে প্রবল ঘাটতি হয়েছিল। এ বছর অর্থাৎ, ২০২৬ সালে এল নিনো শক্তিশালী। তবে ভারত মহাসাগরের কোনও দুর্বল রক্ষণও এ বার পাওয়া যাচ্ছে না। ২৪ মে পর্যন্ত তথ্য বলছে, আইওডি সূচক রয়েছে -০.৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। অধিকাংশ জলবায়ু মডেলেই ইঙ্গিত, শীতের শুরু পর্যন্ত এই সূচক নিরপেক্ষ থাকতে পারে। আইওডি ইতিবাচক না হলে এল নিনোর বিরুদ্ধে কোনও প্রতিরোধ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উষ্ণ স্রোত এ বছর জাঁকিয়ে বসবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

কী প্রভাব

মৌসম ভবনের মডেল অনুযায়ী, জুনে এল নিনো দুর্বল থাকবে। জুলাই-অগস্টে এই স্রোতের গতিপ্রকৃতি থাকতে পারে দুর্বল থেকে মাঝারি মানের। মাঝারি থেকে শক্তিশালী এল নিনো পর্যায় দেখা যেতে পারে সেপ্টেম্বর মাসের পর। বর্ষার শুরুতে বোনা ধান, ডাল, তুলোর মতো খারিজ শস্যগুলি এই সেপ্টেম্বর নাগাদই সঞ্চিত পুষ্টিকে প্রকৃত দানায় রূপান্তরিত করে থাকে। ফলে চাষের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। কৃষকেরা একেই চাষের সবচেয়ে সংবেদনশীল পর্যায় বলে দাবি করেন। ফলে এই সময়ে বৃষ্টির জল না-পাওয়ায় সারা বছরের পরিশ্রমই মাটি হয়ে যেতে পারে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement