Exoplanet Discovery

নক্ষত্রের তাপেই ঝলসে গিয়েছে! ‘মৃত’ গ্রহের খোঁজ মিলল মহাকাশে, সূর্যের সামনে বুধের পরিণতিও কি এমন হবে?

নাসার জেমস্ ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ পৃথিবী থেকে মাত্র ৫০ আলোকবর্ষ দূরে একটি মৃতপ্রায় গ্রহ আবিষ্কার করেছে। নক্ষত্রের তাপে তা জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে গিয়েছে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৯ মে ২০২৬ ০৯:০১
Share:

৫০ আলোকবর্ষ দূরে দগ্ধ, মৃতপ্রায় গ্রহ আবিষ্কার! —ফাইল চিত্র।

জ্বলন্ত নক্ষত্রের একেবারে হাতের কাছে পাক খাচ্ছে গ্রহ। জল নেই, বাতাস নেই, শুকিয়ে গিয়েছে বায়ুমণ্ডলও! আছে কেবল রুক্ষ, শুষ্ক পাথর। পাথুরে জমি। প্রচণ্ড তাপে তা দিনের পর দিন আরও ঝলসে যাচ্ছে। যেন উত্তাপে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাওয়াই তার ভবিতব্য!

Advertisement

মহাকাশে সম্প্রতি এমনই এক গ্রহের হদিস পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আমাদের সৌরজগতে সূর্যের সবচেয়ে নিকট গ্রহ বুধ। নতুন আবিষ্কৃত গ্রহের সঙ্গে তার অনেক সাদৃশ্য পাওয়া গিয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, সুদূর ভবিষ্যতে তবে কি আমাদের বুধের পরিণতিও এমন হবে? বুধকেও কি এ ভাবেই ঝলসে শুকিয়ে কাঠ বানিয়ে দেবে সূর্য? বিজ্ঞানীদের কাছে আপাতত সে প্রশ্নের উত্তর নেই। তবে নতুন গ্রহটিকে নিয়ে কৌতূহল বাড়ছে। তাকে ঘিরে গবেষণা, পরীক্ষানিরীক্ষার গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেমস্ ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (জেডব্লিউএসটি) ২০১৮ সালে পৃথিবী থেকে মাত্র ৫০ আলোকবর্ষ দূরে একটি মৃতপ্রায় গ্রহ আবিষ্কার করে। ওই গ্রহের নাম দেওয়া হয় এলএইচএস ৩৮৪৪বি। গ্রহটির সঙ্গে চাঁদ এবং বুধের একাধিক সাদৃশ্য দেখে উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন মার্কিন বিজ্ঞানীদের একাংশ। তাঁরাই পরীক্ষানিরীক্ষা এগিয়ে নিয়ে যান। মার্কিন মহাকাশবিজ্ঞানী লরা ক্রেডবার্গ বর্তমানে জার্মানির হেইডেলবার্গের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোনমির ডিরেক্টর। সৌরজগতের বাইরের গ্রহ-উপগ্রহ নিয়ে কাজ করেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের একটি দল এলএইচএস ৩৮৪৪বি নিয়ে গবেষণা করেছে। সেই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’ পত্রিকায়।

Advertisement

নতুন গ্রহটি আকারে পৃথিবীর চেয়ে ৩০ শতাংশ বড়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই গ্রহ একটি লালচে বামন নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে। সূর্যের চেয়ে সেই নক্ষত্র আকারে অনেক ছোট। তার ভর সূর্যের ভরের পাঁচ ভাগের এক ভাগ মাত্র। কিন্তু গ্রহের অত্যন্ত নিকটে অবস্থানের কারণে তার উত্তাপের তীব্র প্রভাব পড়েছে গ্রহটির উপর। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এলএইচএস ৩৮৪৪বি যে পথে তার নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে, তা ক্ষুদ্র। মাত্র ১১ ঘণ্টায় সে নক্ষত্রের চারপাশে এক বার পাক খেয়ে আসতে পারে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই নৈকট্যের কারণেই গ্রহটির বায়ুমণ্ডল নাক্ষত্রিক বিকিরণে ঝলসে গিয়েছে। তা পরিণত হয়েছে একটি বায়ুমণ্ডলহীন শিলাখণ্ডে।

পৃথিবী নিজের চারপাশে পাক খেতে খেতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। তাই তার পূর্ব ও পশ্চিমের দু’টি গোলার্ধই পর্যায়ক্রমে এক বার করে সূর্যের মুখোমুখি হয়। তাই পৃথিবীতে দিন এবং রাত দেখা যায়। ৫০ আলোকবর্ষ দূরের সেই নতুন খুঁজে পাওয়া গ্রহটিতে এই কাণ্ড ঘটে না। সেই গ্রহের একটি দিক সবসময় নক্ষত্রের আলোর দিকে মুখ করে থাকে। অন্য দিকটিতে রয়েছে চিরস্থায়ী, গাঢ়, নিকষ অন্ধকার। তা কখনও নক্ষত্রের দিকে আসে না। আবার, গ্রহের আলোকিত দিকটিতে কখনও রাত নামে না। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই অংশে তাপমাত্রা ১০০০ কেলভিন (১৩০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্তও পৌঁছে যায়।

এলএইচএস ৩৮৪৪বি-কে নিয়ে অতীতের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, পৃথিবীপৃষ্ঠের মতো এই গ্রহেও টেকটোনিক কার্যকলাপের আভাস রয়েছে। সৌরজগতের বাইরে আর কোথাও এর আগে সেই আভাস পাওয়া যায়নি। ফলে ওই গবেষণা নতুন গ্রহটিকে নিয়ে উৎসাহ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা যায়, তা সঠিক নয়। নাসার টেলিস্কোপের বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাথুরে গ্রহটিকে নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, গ্রহটির পৃষ্ঠতল চাঁদ বা পৃথিবীতে প্রাপ্ত ব্যাসল্ট শিলা দিয়ে গঠিত হতে পারে। ম্যাগনেশিয়াম এবং লোহাসমৃদ্ধ লাভা দ্রুত জমাট বেঁধে এই আগ্নেয় শিলাটি তৈরি হয়। কেউ কেউ মনে করছেন, পৃথিবীপৃষ্ঠের নীচের অংশ ম্যান্টলের সঙ্গেও ওই গ্রহের পৃষ্ঠের সাদৃশ্য থাকতে পারে। কারণ, ম্যান্টলের অন্যতম উপাদানও ব্যাসল্ট।

এলএইচএস ৩৮৪৪বি-র সার্বিক পরিস্থিতি থেকে দু’টি সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন গবেষকেরা। এক, এই গ্রহ সদ্য তৈরি হওয়া পাথুরে স্তরের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। যদি তা হয়, তবে এই গ্রহ ভূতাত্ত্বিক ভাবে এখনও সক্রিয় বলে ধরে নিতে হবে। দুই, এটি রেগোলিথে আবৃত একটি মৃত, ক্ষয়প্রাপ্ত গ্রহ। বছরের পর বছর ধরে তেজস্ক্রিয়তা এবং উল্কাপিণ্ডের আঘাতে তা জর্জরিত হয়ে পড়েছে। গ্রহটিকে রক্ষা করার জন্য কোনও বায়ুমণ্ডলও আর অবশিষ্ট নেই। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই প্রবল বলে গবেষকদের একাংশের মত। হার্ভার্ড এবং স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্সের নাসার প্রতিনিধি সেবেস্তিয়ান জ়িয়েবা বলেন, ‘‘পৃথিবীর মতো টেকটোনিক পাত এই গ্রহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এখানে তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। হয়তো এই গ্রহে খুব সামান্যই জল অবশিষ্ট রয়েছে।’’

গ্রহটি জীবিত না মৃত, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর দৃষ্টান্ত টেনেছেন। তাঁদের মতে, পৃথিবীতে বা যে কোনও সক্রিয় সৌরব্যবস্থার অন্দরে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং সালফার নির্গত হয়। কিন্তু এলএইচএস ৩৮৪৪বি থেকে কোনও আগ্নেয় নিঃসরণের আভাস পায়নি নাসার টেলিস্কোপ। সেখান থেকেই ধরে নেওয়া যায়, এটি নিষ্ক্রিয়, মৃত গ্রহে পরিণত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হতে গ্রহটি সম্পর্কে টেলিস্কোপের মাধ্যমে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। সৌরজগতে বায়ুমণ্ডলহীন মহাজাগতিক বস্তু হিসাবে এর আগে একাধিক গ্রহাণুকে পরীক্ষা করে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। বায়ুমণ্ডলহীন নতুন গ্রহের গবেষণাতেও তাঁদের সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগছে। ক্রেডবার্গ তাঁদের গবেষণা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘‘গ্রহাণু সংক্রান্ত গবেষণার কৌশলই আমাদের এলএইচএস ৩৮৪৪বি-র প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে সাহায্য করবে। আমরা এ বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement