খাবার নিয়ে মানুষের ধারণা, পছন্দ এবং সংস্কৃতি এক এক অঞ্চলে এক এক রকম। কারও কাছে যা কল্পনাতীত, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে সেটিই হয়তো বহু প্রজন্মের প্রিয় খাবার। যেমন ধরুন, পোকামাকড়। ঘরে একটা আরশোলা বা ফড়িং দেখলেই অনেকে ভয়ে পালিয়ে যান। অথচ বিশ্বের বহু দেশে, এমনকি ভারতেও পোকামাকড় শুধু খাবারই নয়, রীতিমতো সুস্বাদু পদ হিসেবে পরিচিত।
খাওয়ার থালায় রাখা যায়, এমন প্রায় ১,৯০০ প্রজাতির পোকা রয়েছে পৃথিবীতে। এশিয়া, আফ্রিকা বা মধ্য আমেরিকার অনেক দেশে খাবার হিসাবে পোকা বেশ জনপ্রিয়। তবে পশ্চিমি বিশ্বের মানুষের কাছে পোকা খাওয়ার চল ‘অদ্ভুত’ বা ‘নোংরা’। কেউ বা ভাবেন, দারিদ্রের কারণে পোকামাকড় ধরে খাওয়া হয়। তা অবশ্য সব সত্যি নয়!
সাধারণ স্ট্রিট ফুড থেকে শুরু করে বড় বড় বিলাসবহুল রেস্তরাঁতেও চমৎকার সব পোকার পদ তৈরি হচ্ছে একাধিক দেশে। প্রোটিন, অ্যামাইনো অ্যাসিড, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, প্রিবায়োটিক ফাইবারে ভরপুর পোকা সহজেই ‘ডায়েট ফুড’-এর তকমা পাওয়ার যোগ্য।
কাঁকড়াবিছে: যে কাঁকড়াবিছে দিয়ে ফেলুদাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল ‘সোনার কেল্লা’-তে, সেই কাঁকড়া বিছেই নাকি জিভে জল আনা খাবার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চিন, পশ্চিম আফ্রিকায় কিছু বাজারে কাঠিতে গাঁথা ভাজা কাঁকড়াবিছে খুব পরিচিত দৃশ্য। তাইল্যান্ডেও পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র এই খাবার। রান্না হওয়ার পরে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে না বলেই এগুলি খাওয়া হয়।
গঙ্গাফড়িং: মেক্সিকোর ওয়াহাকা অঞ্চলে ভাজা ফড়িং অত্যন্ত জনপ্রিয়। লেবুর রস, রসুন ও মরিচ দিয়ে মাখানো এই খাবার অনেক সময় ট্যাকোর পুর হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। আফ্রিকা ও এশিয়ার নানা প্রান্তেও গঙ্গাফড়িং খাওয়ার চল রয়েছে। জাপানে আবার সয়া সস আর চিনিতে সেদ্ধ করে খাওয়া হয় এটি। আফ্রিকায় এটি অত্যন্ত মূল্যবান ও মরসুমি উপাদেয় খাবার হিসাবে দেখা হয়। সাধারণত এদের ডানা ও পা ছিঁড়ে ফেলে নিজস্ব প্রাকৃতিক চর্বি দিয়েই শুকনো ভাজা হয়।
ঝিঁঝিপোকা: তাইল্যান্ডে রাতের বাজারে গেলে দোকানে দোকানে ভাজা ঝিঁঝি পোকা চোখে পড়বেই। নুন, গোলমরিচ ও মশলা মাখিয়ে ভাজা এই পোকা স্থানীয়দের কাছে জনপ্রিয় জলখাবার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় ঝিঁঝি পোকা রোজের পাতে থাকে। এখন তো আবার পশ্চিমি দেশেও ঝিঁঝি পোকার গুঁড়ো দিয়ে বিস্কুট, প্রোটিন বার এবং স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি হচ্ছে।
লাল পিঁপড়ে: লাল পিঁপড়ের আচার ভারতের একাধিক এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। হালকা টক এবং ঝাল এই আচারের নানাবিধ পুষ্টিগুণ রয়েছে। তবে ভারত ছাড়াও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাংশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা জায়গায় লাল পিঁপড়ের বড়ই কদর রয়েছে। কেবল আচার নয়, কোথাও আবার ছাঁকা তেলে ভেজে খাওয়া হয়, কোথাও হালকা কষিয়ে ঝাল ঝাল পদ তৈরি হয়।
উঁই: বাড়িতে উঁইপোকা দেখা দিলেই হইহই রব! সব বইপত্র খেয়ে ফেলার আগে তাড়াহুড়ো করে পোকা দূর করার তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। সেই পোকা ধরে মশলা মাখিয়ে যদি কবাবের মতো আগুনে সেঁকে নেন, বেশ একটা বাদাম বাদাম স্বাদ পাওয়া যাবে। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই খাবার আফ্রিকা ও এশিয়ার একাংশে এবং লাতিন আমেরিকায় পথ্য হিসাবেও খাওয়া হয়।
ট্যারান্টুলা: যার এক কামড়েই মৃত্যু, সেই পোকায় কামড় বসালে কেমন হয়? কম্বোডিয়ায় রাস্তার ফুড-স্টলগুলিতে দেদার বিকোচ্ছে ট্যারান্টুলা ভাজা। সঙ্গে মিশছে রসুন, চিনি, নুন ও চটপটে মশলা। কম্বোডিয়ায় ভাজা ট্যারান্টুলা শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, স্থানীয়দের কাছেও প্রিয় খাবার। বাইরের অংশ মুচমুচে এবং ভিতরের অংশ নরম হয়। আগে পাগুলি খেয়ে নাকি শেষে দেহটুকু খাওয়া হয়। তবে খাওয়ার যোগ্য করার আগে অবশ্যই তাদের বিষ শরীর থেকে বার করে নেওয়া হয়।
কালো পিঁপড়ের লার্ভা: ক্রিমি কটেজ চিজ়ের মতো খেতে লাগে বলে দাবি অনেকের। কিন্তু কালো পিঁপড়ের লার্ভা সর্বস্তরের মানুষ খেতে পারেন দামের কারণে। অভিজাত গোষ্ঠীতে পুষ্টিগুণে ভরা এই খাবার বেশি জনপ্রিয়। হালকা টক ও ঝাঁঝালো স্বাদের লার্ভা স্যালাড বা মাছের কোনও পদের উপরে গার্নিশ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। মেক্সিকো, তাইল্যান্ড, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত ও আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় এটি খাওয়া হয়।
মাছির ডিম: মাছের ক্যাভিয়ারের মতো স্বাদের এই ডিমগুলি কিনোয়া দানার আকারের। রোদে শুকিয়ে, ডিম ভাজায় মিশিয়ে, প্যাটিজ়ে ঢেলে খাওয়া প্রোটিনে ভরপুর এই ডিমগুলি। মধ্য আমেরিকার জলাশয়ে জন্মানো উদ্ভিদে পাওয়া যায় এই ডিমগুলি।
গুবরে পোকা: কেউ কেউ বলেন, ভাজা পপকর্নের মতো খেতে গুবরে পোকা। এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার একাধিক অংশে গুবরের নানা প্রজাতি থাকে খাওয়ার টেবিলে। রোস্ট করে হোক বা তেলে ভেজে, বেশ মুচমুচে ভাব আসে এই পোকার। কোথাও আবার গুঁড়ো বেকিংয়ের কাজেও ব্যবহার করা হয়। কোনও কোনও প্রজাতি আবার চিংড়ির মতো খেতে।
বোলতার লার্ভা: এই পোকার লার্ভাও নাকি বড়ই সুস্বাদু। জাপানের গ্রামীণ এলাকা, দক্ষিণ-পশ্চিম চিন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বোলতা খাওয়ারও বেশ চল রয়েছে। রান্নার পর বেশ মাখনের মতো গঠন তৈরি হয়। স্বাদে হালকা মিষ্টি এবং বাদামের ছোঁয়া রয়েছে। অনেকে চিংড়ির সঙ্গেও তুলনা করেন বোলতার লার্ভাকে। কোথাও অল্প তেলে সাঁতলে নেওয়া হয়, কোথাও বা ছাঁকা তেলে ভাজা হয়, কোথাও আলু-ভাতের মতো মেখে খাওয়া হয়। জাপানে সয় সস, চিনি ইত্যাদিতে কষিয়ে রান্নাও করা হয় লার্ভাগুলি।
পঙ্গপাল: প্যান-ফ্রাই করুন বা ছাঁকা তেলে ভাজুন অথবা সয় সসে কষিয়ে মাখা মাখা মিষ্টি স্বাদের বানিয়ে নিন— পঙ্গপালের জনপ্রিয়তা এ দেশেরও বহু জায়গায় লক্ষ করা যায়। জাপানে সাধারণত সেদ্ধ করে সয় সসে কষিয়ে রাঁধা হয়। পঙ্গপালের পা ও ডানা ফেলে দিয়ে ভাল করে সেদ্ধ, ভাজা বা রোস্ট করে রান্না করা হয়। রান্না করার ফলে ভিতরের ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া মরে যায়।
ফড়িং বা ড্রাগনফ্লাই: ইন্দোনেশিয়া ও চিনের কিছু অঞ্চলে ড্রাগনফ্লাই সংগ্রহ করে ভাজা হয়। অনেক সময়ে মশলা মাখিয়ে কুড়মুড়ে জলখাবার হিসাবেও পরিবেশন করা হয়। কেউ কেউ বলেন, খেতে অনেকটা নরম খোলের কাঁকড়ার মতো। মাশরুমের উপর ছড়িয়েও খেতে ভালবাসেন অনেকে।
খাবারের জগৎ যে কতটা বৈচিত্র্যময়, পোকামাকড়ের এই পদগুলিই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কারও কারও কাছে বিস্ময়কর হলেও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে এগুলি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং স্বাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভবিষ্যতে হয়তো প্রোটিনের বিকল্প উৎস হিসাবে এই পোকামাকড়ই আরও বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু পোকামাকড় রান্নার ক্ষেত্রে পেশাদারের নির্দেশ প্রয়োজন।