অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘নিষ্ঠুরতা যখন রাষ্ট্রধর্ম’ (২২-১) প্রবন্ধটি পড়লাম। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ জনগণ যে রকম হয়রানির শিকার হয়েছেন, তা বোঝাতে শিরোনামটি যথার্থ। রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার ব্যাখ্যায় কবি শঙ্খ ঘোষ-উচ্চারিত ‘কঠোর বিকল্পের পরিশ্রম নেই’-এর মতো প্রবাদবাক্যসম পঙ্ক্তিটির প্রয়োগও উপযুক্ত।
ভোটার তালিকা সংশোধন গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান উপাদান ‘সাধারণ নির্বাচন’-এর সুষ্ঠু সম্পাদনের জন্য অবশ্যপ্রয়োজনীয় একটি প্রক্রিয়া। তাকে তো সচেতন নাগরিকদের মন থেকেই স্বাগত জানানো উচিত। কিন্তু তার বদলে অধিকাংশ মানুষ কেন আজ চরম বীতশ্রদ্ধ? কারণ, বিনা কারণে তাঁরা হেনস্থার শিকার হয়েছেন। এত বড় একটি কর্মযজ্ঞের কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। যখন যেমন মনে হয়েছে, নির্বাচন কমিশন থেকে তেমন নির্দেশ জারি করা হয়েছে বিএলও কিংবা ভোটারদের উদ্দেশে। প্রচলিত রীতিনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। নথি জমার সমর্থনে রসিদ দেওয়া বা জন্মতারিখের প্রমাণস্বরূপ মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে অনুমোদনের মতো বিষয়েও শীর্ষ আদালতের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। অমর্ত্য সেনের মতো দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্বকেও নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য বাড়িতে নোটিস পাঠানো হয়েছে। হিন্দু বাঙালিদের পদবি-সংক্রান্ত বিষয়ে কমিশনের অজ্ঞতার কারণে সাধারণ ভোটারদের জবাবদিহি করতে হয়েছে।
এ ছাড়াও রয়েছে— ছয় বা তার বেশি সন্তান থাকা, অথবা বেশি বয়সে সন্তানের জন্মদানের কারণে কিছু মানুষকে ডেকে পাঠানো ও লাইনে দাঁড় করানোর মতো ঘটনা। এই সব নমুনা কি কোনও সুস্থ ব্যবস্থার পরিচয় বহন করে? আতঙ্কে হোক বা লাইনে দাঁড়ানোর কষ্টে, কোনও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ফলে যদি মানুষের মৃত্যু ঘটে, তা কি সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ হতে পারে? সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, কমিশনের এই নিষ্ঠুরতাকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টায় এক মন্ত্রী ভোটদানের জন্য ভোটারদের লাইনে দাঁড়ানোর উদাহরণ পর্যন্ত টেনে এনেছেন। তিনি বুঝতে চাননি যে ‘ভোটদান’ আমাদের দেশের নাগরিকদের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হলেও, শুনানিতে হাজিরা দেওয়ার মতো ‘আবশ্যিক’ দায়িত্ব নয়।
প্রবন্ধকার সঙ্গত ভাবেই মনে করিয়ে দিয়েছেন, মানুষের এমন ভোগান্তি এই কেন্দ্রীয় সরকারের আমলে এই প্রথম নয়। এসআইআর-এ যা ঘটেছে, তা দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি মাত্র। স্বভাবতই এর বিরুদ্ধে প্রয়োজন যথোপযুক্ত প্রতিবাদ। খুব সঙ্গত কারণেই দলকেন্দ্রিক প্রতিবাদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজকেন্দ্রিক প্রতিবাদের উপরও তিনি জোর দিয়েছেন। তবে এর সঙ্গে আরও একটি বিষয়ও খুব কার্যকর, তা হল আদালতের দ্রুত হস্তক্ষেপ। এ বারও মুশকিল আসানের ভূমিকায় শীর্ষ আদালত অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু আদালতের প্রতি যথাযোগ্য সম্মান জানিয়েই বলি, আরও দ্রুত তাঁরা বিষয়টি দেখলে হয়তো আরও বেশি মানুষ কমিশনের হেনস্থা থেকে নিষ্কৃতি পেতেন। তবে নির্বাচন কমিশনের এ-হেন আচরণ দেশের বিচার বিভাগের কাছে বহু উদ্বেগ রেখে গেল।
গৌতম নারায়ণ দেবকলকাতা-৭৪
বধ্যভূমির ছবি
অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘নিষ্ঠুরতা যখন রাষ্ট্রধর্ম’ ব্যথিত করল। প্রশ্ন উঠছে— রাষ্ট্রের ভুল কোথায়? ১৯৫১-৫২ থেকেই তো নিয়মিত ভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে গণতন্ত্রের ধারক লোকসভার নির্বাচন, এবং সেই সূত্রেই বার বার ভোটার তালিকা সংশোধন করা হয়েছে।
মুশকিলটি হল, বর্তমানে এই সংশোধনের নামে নির্বাচন কমিশন যা করছে, তাকে নির্মম বা নিষ্ঠুর বললেও বোধ হয় কম বলা হয়। ভুললে চলবে না, এ বারের এসআইআর-এর ঘোষিত লক্ষ্য, এ দেশে সুযোগ বুঝে ঢুকে পড়া অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা; সে তাঁরা বাংলাদেশি বা তথাকথিত রোহিঙ্গা, যে-ই হোন না কেন। কিন্তু সেই চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়ায় কোনও রকম বাছবিচার ছাড়াই আট থেকে আশিকে প্রায় বধ্যভূমিতে ধরে নিয়ে যাওয়ার মতো করে শুনানিতে টেনে আনার যে চিত্র সামনে এসেছে, তা দেখলে আঁতকে উঠতে হয়।
আতঙ্কের আরও বড় কারণ, সামান্য ভুলভ্রান্তির জেরেও এই শুনানি-পর্বে হাজির হতে হয়েছে প্রবীণ নাগরিকদের, অসুস্থ মানুষদের, যাঁরা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে পঞ্চাশ, ষাট বা সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন। রাষ্ট্র যদি এত কাল বিচার-বিবেচনা করে নির্ধারণই করতে না-পারে, এঁদের মধ্যে কারা প্রকৃত নাগরিক নন— অর্থাৎ বকলমে কারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী— তবে সেই প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় কখনওই দীর্ঘকাল বসবাসকারী নাগরিকদের উপর নতুন করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
তাপস সাহা, শেওড়াফুলি, হুগলি
সঙ্কটের সমাধানে
‘নিষ্ঠুরতা যখন রাষ্ট্রধর্ম’ প্রবন্ধে প্রবন্ধকার একটি জরুরি প্রশ্ন তুলেছেন। ‘রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা’ যে দিকে গড়াচ্ছে, তাতে রাষ্ট্রকে স্বীকার বা অস্বীকার— কোন পথে সমাধান মিলতে পারে, তা স্পষ্ট নয়। দুই বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পর্বে পৃথিবী জুড়ে সমাজবিপ্লব ও আর্থ-রাজনৈতিক বিবর্তনের ফলে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভিন্ন চরিত্রের রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রপুঞ্জের জন্ম হয়েছে। সময়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার চরিত্র ও প্রকৃতির পরিবর্তন এক ভয়ঙ্কর রাষ্ট্রীয় স্বার্থপরতার ইঙ্গিত দেয়। আসলে সাম্রাজ্যবাদী ও ধনতান্ত্রিক শক্তিগুলি নানা আপস-সমঝোতার মাধ্যমে নিজেদের পুনর্বিন্যাস করেছে।
লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, নোট বাতিল, লকডাউন বা এসআইআর— সাম্প্রতিক নিষ্ঠুরতার উদাহরণ। তবে এর আগেও মিশ্র অর্থনীতি, শিল্পনীতি, উদারীকরণ-বেসরকারিকরণ-বিশ্বায়ন প্রভৃতি নীতিগত পরীক্ষায় নানা প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে। কৃষক ও শ্রমিকদের প্রতিও রাষ্ট্র সব সময় সুবিচার করেনি। প্রতিটি ঘটনাই রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার সাক্ষ্য বহন করে।
এখন নাগরিকত্ব প্রমাণের কষ্টটি হাতে-গরম। যন্ত্রণার কারণ হিসাবে হিন্দুধর্ম-নির্ভর রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার গোড়ার গলদের কথা বলা হচ্ছে। প্রায় প্রতি দিন নতুন নির্দেশিকা জারি হয়েছে। অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত নাগরিকেরই বেশি করে অসুবিধা ও হয়রানি হয়েছে। পৃথিবী জুড়েই রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা বাড়ছে, এমন কথা অনেকেই বলেন। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জ নীরব ও কার্যত অকার্যকর, এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন জাগে, তবে বিপ্লবই কি অনিবার্য?
শুভ্রাংশু কুমার রায়, চন্দননগর, হুগলি
নির্মম প্রহসন
অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘নিষ্ঠুরতা যখন রাষ্ট্রধর্ম’ প্রসঙ্গে কিছু কথা। স্বাধীন ভারতে এমন দমন-পীড়ন পূর্বে খুব কমই দেখা গেছে। এ যেন রাষ্ট্র বনাম নাগরিকের এক অঘোষিত লড়াই। পরস্পরের মধ্যে এমন বিশ্বাসহীনতা ও প্রতিশোধস্পৃহা দেখে হৃদয় ব্যথিত হয়ে ওঠে। যেন নাগরিকের অধিকার হরণের এক রাষ্ট্রীয় অভিযান শুরু হয়েছে। মানুষের মৃত্যুতেও কোনও হেলদোল নেই। যাঁরা জনসাধারণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছেন, তাঁরাই আজ সেই জনতার ভোটাধিকার নিয়ে, তাঁদের বসবাসের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন। বড় নির্মম এই প্রহসন!
শাসক ও বিরোধী দলের ক্ষমতার লড়াইয়ে বলি হচ্ছেন সাধারণ নাগরিকেরা। তাঁদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠছে; তাঁরা দিশাহারা ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। তীব্র বেকারত্ব, লাগামছাড়া দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, তার সঙ্গে ধর্মীয় মেরুকরণ ও জাতিবিদ্বেষের মতো গুরুতর সমস্যায় মানুষ আজ পীড়িত। এর উপর এসআইআর, সিএএ, জনগণনা ইত্যাদি নিয়ে যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে জনমানসে অনিশ্চয়তা ও ত্রাসের সঞ্চার করা হয়, তবে সমাজের বুকে নেমে আসে অসহায়তা ও অবিশ্বাসের আবহ। এবং দেশ দুর্বলতর হয়ে পড়ে।
বাবুলাল দাস, ইছাপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে