Sri Ramakrishna

সম্পাদক সমীপেষু: দার্শনিক সন্ধিক্ষণ

এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী কালে স্বামী বিবেকানন্দের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে উচ্চারিত হয়; শিকাগোর ধর্মমহাসভায় তাঁর বক্তব্য বহুত্বের দর্শনকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয় এবং ভারতীয় আত্মবিশ্বাসকে পুনরুজ্জীবিত করে। সমাজগঠনের ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব আপাতদৃষ্টিতে পরোক্ষ হলেও গভীর ছিল।

শেষ আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪৮
Share:

অসিতবরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ ‘ভাঙতে নয়, গড়তে আসা’ (১৯-২) শ্রীরামকৃষ্ণকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়, এক জন ধর্মসাধক হিসেবে নয় শুধু, বরং সমাজমননের নির্মাতা রূপে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গসমাজ ছিল আত্মপরিচয়ের সন্ধিক্ষণে। এক দিকে ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, অন্য দিকে কুসংস্কার ও ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতা— সমাজ বিভক্ত, আত্মবিশ্বাস ক্ষীণ। এই প্রেক্ষাপটে শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাব কেবল ধর্মীয় ঘটনা নয়, ছিল এক গভীর দার্শনিক সন্ধিক্ষণ।

তিনি মতের বিরোধে নয়, সত্যের ঐক্যে বিশ্বাসী। তাঁর উপলব্ধি ‘যত মত, তত পথ’ আসলে বহুত্ববাদী মানবতাবাদের এক মৌলিক ঘোষণা। শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ‘অভিজ্ঞতা’; তিনি তত্ত্বকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। হিন্দু, ইসলাম, খ্রিস্ট ধর্ম, বিভিন্ন সাধনপথ অনুশীলন করে তিনি দেখিয়েছিলেন, ধর্ম বিভাজনের কারণ নয়, আত্মোপলব্ধির বিভিন্ন ভাষা।

এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী কালে স্বামী বিবেকানন্দের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে উচ্চারিত হয়; শিকাগোর ধর্মমহাসভায় তাঁর বক্তব্য বহুত্বের দর্শনকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয় এবং ভারতীয় আত্মবিশ্বাসকে পুনরুজ্জীবিত করে। সমাজগঠনের ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব আপাতদৃষ্টিতে পরোক্ষ হলেও গভীর ছিল। তিনি সরাসরি প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা না হলেও, তাঁর জীবনাদর্শ থেকেই গড়ে ওঠে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের মতো সংগঠন, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসেবায় আধুনিক ভারতে এক নীরব বিপ্লব ঘটায়। ‘জীবে দয়া’ তাঁর কাছে তাত্ত্বিক উচ্চারণ নয়, আধ্যাত্মিক অনুশাসন— এখানেই মানবধর্ম শিক্ষার নৈতিক ভিত শক্ত হয়।

শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনকে যদি আমরা রামমোহন রায়ের যুক্তিবাদ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মানবিক সংস্কার ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বমানবতার সঙ্গে তুলনা করি, তবে দেখা যায়— সবার লক্ষ্য ছিল মানুষকে বৃহত্তর চেতনার দিকে উত্তরণ; পার্থক্য ছিল পদ্ধতিতে। শ্রীরামকৃষ্ণ সেই উত্তরণের আধ্যাত্মিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। এই বিভক্ত ও উত্তেজিত সময়ে তাঁর দর্শন আরও প্রাসঙ্গিক, কারণ তিনি শিখিয়েছিলেন মতভেদকে শত্রুতা নয়, অভিজ্ঞতার বৈচিত্র হিসেবে দেখতে। শিক্ষা যদি কেবল তথ্য সঞ্চয় না-হয়ে চরিত্রগঠন ও সহমর্মিতার চর্চা হয়, তবে সমাজগঠনের প্রকৃত শক্তি সেখানেই নিহিত। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, সভ্যতার অগ্রগতি বাহ্যিক উন্নতিতে নয়, অন্তরের প্রসারে। শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন সমাজমননের এক নির্মাতা, এসেছিলেন মানুষের অন্তরের মানুষকে জাগাতে।

অলোক কুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা

তাঁরই প্রভাবে

অসিতবরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভাঙতে নয়, গড়তে আসা’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। জটিল দার্শনিক তত্ত্বের অনুধাবন না করেও, সরল বিশ্বাস, ভক্তি ও নিখাদ প্রেমের মাধ্যমে পরমেশ্বর বা পরম সত্যকে পাওয়া সম্ভব— এই ছিল শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের মূল বাণী। তাঁর সর্বজনবিদিত উক্তি, ‘টাকা মাটি, মাটি টাকা’— অর্থাৎ পার্থিব ধনসম্পদ ও মাটির মধ্যে কোনও মৌলিক তফাত নেই। অর্থ যেন লালসা বা অনর্থের উৎস না-হয়ে ওঠে, এই ছিল জনসাধারণের প্রতি তাঁর সতর্কবার্তা।

রামকৃষ্ণদেবের প্রভাব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়াও সমসাময়িক ও পরবর্তী কালের বহু লেখকের রচনায় ধরা পড়েছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখায় প্রায় সর্বত্রই ‘যত মত, তত পথ’ দর্শনের মানবিক দিকটি লক্ষ করা যায়। তাঁর সাহিত্য ও নাটকে বাংলার ধর্মীয় পুনর্জাগরণ এবং ধর্মের উদার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন স্পষ্ট।

মোহিতলাল মজুমদার তাঁর বিবিধকথা গ্রন্থে রামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিকতা ও জাতীয় চেতনার দিকটি উন্মোচিত করেছেন। পরবর্তী কালে কাজী নজরুল ইসলাম রামকৃষ্ণের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সেতুবন্ধনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।

তা ছাড়া শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অন্নদাদিদি-সহ একাধিক নারীচরিত্রে নিঃস্বার্থ জীবনচর্চার যে পরিচয় মেলে, তা ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’-র আদর্শেরই এক সাহিত্যিক প্রতিফলন। তাঁর রচনায় রামকৃষ্ণ-বর্ণিত মাতৃভাব ও ত্যাগের মহিমা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ঠাকুরের মতে, ‘আমি’ বলে কোনও সত্তা নেই। যেমন পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে শেষে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না, তেমনই আত্ম-অনুসন্ধানে ‘আমি’ ক্রমশ বিলীন হয়ে যায়; শেষ পর্যন্ত যা থাকে, তা আত্মা বা চৈতন্য। অথচ মানুষ সেই ‘আমি’-র আমিত্ব খুঁজতে গিয়ে ভ্রমের শিকার হয়। এই অবিদ্যা থেকেই জন্ম নেয় নীচতা, কুসংস্কার, হিংসা, বিবাদ ও লোভ। মানুষ তখন গড়ার কথা ভুলে গিয়ে কেবল ভাঙতেই থাকে।

গীতিকা কোলে, কলকাতা-৫২

সমাজের ক্ষতি

‘সম্পর্ক’ (২৫-২) শিরোনামের সম্পাদকীয় প্রবন্ধে ‘চাহিদা-জোগান’ সমীকরণে চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থায় স্নাতকোত্তরের আসনকে ‘পণ্য’ হিসাবে বিবেচনা করার পিছনে যৌথ অপচেষ্টাকে যে ভাবে উন্মোচিত করা হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

এমডি-র মতো একটি কোর্স, যা চিকিৎসাক্ষেত্রের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রদান করে, সেখানে যদি গুণমানের সঙ্গে এই ভাবে আপস করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আমরা যাঁদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসাবে পাব, তাঁরা কি সত্যিই ‘বিশেষজ্ঞ’ পদবাচ্য হবেন? চিকিৎসার মতো একটি সংবেদনশীল ক্ষেত্রে, যেখানে মেধাই একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ এবং তার প্রয়োগের ছাড়পত্র পাওয়ার লক্ষ্যে, সেখানে কাট-অফ নম্বর কমানোর মাধ্যমে অর্থনীতির দর্শনকে মান্যতা দেওয়া হলেও, সমাজকেই কি পরোক্ষে অবহেলা করা হল না?

উপযুক্ত মানের জোগানে কোনও কারণে ঘাটতি দেখা দিলে তার সমাধানে পরীক্ষা গ্রহণের সংখ্যা বাড়ানো যেত। তা না করে ন্যূনতম নম্বরের সীমা ব্যতিক্রমী ভাবে কমিয়ে দিয়ে চিকিৎসা-ব্যবস্থায় বেনোজল ঢোকানোকে বৈধতা দেওয়া হল কি?

গৌতম নারায়ণ দেব, কলকাতা-৭৪

নীতিবিরুদ্ধ

‘বৈষম্যবাদ’ (২০-২) শীর্ষক সম্পাদকীয়টি পড়ে স্পষ্ট বোঝা যায়, আবাস যোজনা ও একশো দিনের কাজের বরাদ্দ— অর্থ কমিশনের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের জন্য নির্ধারিত যে অর্থ, তা কেবলমাত্র দুর্নীতির কারণে দেওয়া হয়নি বা হচ্ছে না। এর আগে ‘প্রশ্নের মূল্য’ (২৩-৯) সম্পাদকীয়তেও একশো দিনের কাজের টাকা কেন্দ্রের তরফে না দেওয়ার বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছিল।

যদি কেবল দুর্নীতির কারণেই এই খাতগুলির বরাদ্দ অর্থ কেন্দ্র আটকে রাখত, তা হলে বিজেপি-শাসিত অন্যান্য রাজ্যে, যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেখানেও সময় মতো বরাদ্দ অর্থ দেওয়া হত না। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গের জন্য নির্ধারিত আবাস যোজনা ও জল জীবন মিশনের মতো প্রকল্পের টাকাও কেন্দ্র আটকে রেখেছে। আসলে, নানা রকম অনিয়মের অভিযোগ দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ অর্থ আটকে দেওয়ার প্রবণতা বোধ হয় কেবলমাত্র রাজ্যের কেন্দ্রবিরোধী অবস্থানের ফল। অর্থাৎ, পরোক্ষ ভাবে লক্ষ লক্ষ গ্রামীণ মানুষ একশো দিনের কাজের মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যায়, অবিচার ও দ্বিচারিতার কারণে।

যদি সত্যিই অস্বচ্ছতার প্রশ্নে কেন্দ্র বরাদ্দ অর্থ আটকে রাখে, তবে সব রাজ্যের ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত। দুর্নীতির অভিযোগে কেবল একটি রাজ্যকে বরাদ্দ অর্থ থেকে বঞ্চিত করা তো নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। অতএব এমন পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে নীতিবিরুদ্ধ।

স্বরাজ সাহা, কলকাতা-১৫০

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন