সম্পাদক সমীপেষু: মানসিক প্রস্তুতি


জার্মানির কোচ লো বলেছেন, দলের মধ্যে একটা ‘অ্যারোগ্যান্স’ বা ঔদ্ধত্য ঢুকে পড়েছিল। খেলোয়াড়রা ভেবেছিলেন, যেই টুর্নামেন্ট শুরু হবে, একটা সুইচ আপনাআপনি ‘অন’ হয়ে যাবে, আর তাঁরা ভাল খেলতে শুরু করে দেবেন! অবাক লাগে, বিশ্বে সব চেয়ে নিখুঁত যান্ত্রিক পেশাদারি ফুটবলের জন্য বিখ্যাত যে দল, তারা তাদের মানসিকতার অনুশীলনের উপর জোর দেয়নি! সর্বোচ্চ স্তরের খেলায় মানসিকতাই যে অনেক সময় জয়-পরাজয়ের তফাত গড়ে দেয়, এ তো আজ স্বতঃসিদ্ধ! গত বিশ্বকাপের আগে মনের জোর বাড়ানোর জন্য বিশ্বখ্যাত অ্যাডভেঞ্চারার মাইক হর্ন-এর ক্লাস করেছিলেন জার্মানরা।
এ বার সে সব হল না কেন?

মলয়জ্যোতি সাহা

কলকাতা-৬৪

সেই ছবিটি

ঝুলন্ত মানুষের যে ছবিটি আপনারা প্রথম পাতায় ছেপেছিলেন, তার প্রেক্ষিতে ১০-৬ তারিখে চারটি চিঠি ছাপা হয়েছে। আপনারা তার একটা উত্তর দিয়েছেন, যা কোনও মতেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। চারটি চিঠির হেডিং যথাক্রমে ‘বীভৎস ছবি’, ‘কী মানসিকতা’, ‘দায়বদ্ধতা’, ‘মিথ্যে বলতে হয়’। এগুলির সঙ্গে কয়েকটি শব্দ যোগ করে সাজালেই আপনাদের কথার প্রত্যুত্তরটা দেওয়া যায়। বীভৎস ছবি, কী মানসিকতা, দায়বদ্ধতার উত্তর দিতে গিয়ে জেনেশুনে মিথ্যা বলতে হয়! সমাজকে সচেতন করার জন্য ওই ছবিটি যদি প্রথম পাতায় বড় করে ছাপতে হয়, তা হলে তো বেকারত্বের জ্বালায় যে ছেলেটি রেলে মাথা দেয় তার ছিন্ন-মাথাওয়ালা ছবি বা নির্ভয়া কাণ্ডের সেই অত্যাচারিতা মেয়েটির নগ্ন ছবি প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে ছাপবেন! আবার লিখেছেন, শিশুকে বাস্তব থেকে, সত্য থেকে পুরোপুরি আড়াল করে রাখা উচিত নয়। তা হলে খবরে যে পড়ি সিরিয়াল বা রিয়েলিটি শো-র নকল করতে গিয়ে শিশুর গলায় ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যু হচ্ছে! এগুলো কি মিথ্যে?

শুভ্রাংশু বসু

বড়নীলপুর, পূর্ব বর্ধমান

 

অনেকের বক্তব্য, তাঁরা নাকি একটি রাজনৈতিক খুনের ছবি দেখে তাজ্জব, আতঙ্কিত, ভাষাহীন হয়ে পড়েছেন এবং বাড়ির লোককে তা দেখতে দিতে চান না। আসলে তাঁরা সমাজের সত্যটা দেখেও চোখ বুজে থাকতে চান। তাঁরা শিশুমনের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। আচ্ছা বলুন তো, আজকাল কম্পিউটারে যে অ্যাকশন গেমগুলি খেলা হয়, তাতে কি কম বীভৎসতা থাকে? টিভিতে যে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বিজ্ঞাপন দেখানো হয় সেগুলো কি শিশুর মনে কোনও প্রভাব ফেলে না? তা হলে সমাজের সত্যতাকে এত ভয় কিসের? আর সংবাদপত্র কি শুধুমাত্র রবিবাসরীয় উপন্যাস বা রম্যরচনার জন্য? আসলে এই সব পাঠক একটি মনগড়া দুনিয়ায় থাকতে ভালবাসেন, যেখানে দশটা-পাঁচটার চাকরির পরে টিভি সিরিয়ালের দুনিয়ায় ডুব দেওয়া যায়, এবং সব দেখেও না দেখার ভান করা যায়।

অমিত মণ্ডল

কলকাতা-১০২

 

পত্রলেখকদের প্রশ্ন করতে চাই, কিছু দিন আগে পঞ্চায়েত নির্বাচনের বলি হতে হয়েছিল যাঁদের, তাঁদের গুলিবিদ্ধ, পুড়ে ঝলসানো বিকৃত ছবিও আনন্দবাজারের প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল। তখন কি তাঁদের সন্তানরা আঁতকে ওঠেনি? তাঁদের বাবা-মায়েরা জিজ্ঞাসা করেননি, ‘‘প্রথম পাতাটা কোথায়?’’ এ ছাড়াও অন্যান্য দুর্ঘটনায় মৃতদের ছবিও প্রথম পাতায় ছাপা হয়। যখনই ছবিটা মৃত বিজেপি কর্মীর হয়ে গেল, তখনই কি আঁতে ঘা পড়ল!

মেহেদি হাসান মোল্লা

বটতলী, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

 

খবরের কাগজে কদর্য বীভৎস নারকীয় ছবি ছেপে যে অভিঘাত তৈরি করা হল, তাতে আর যা-ই হোক, প্রতিকার বা সমাধান তো হবেই না, বরং হিংসা-উৎসাহীরা আরও সক্রিয় হবে, অার লক্ষ লক্ষ সংবেদনশীল পাঠকের কোমল হৃদয় ভেঙে যাবে। তাই হিংসার খবর শুধু হরফেই পরিবেশিত হোক, ছবিতে নয়। আর এই সব নারকীয় ছবি দেখে শিশুদের যথার্থ বিকাশ ঘটবে, এ সব সস্তা হানিকর ব্যাখ্যা! মনোবিদের পরামর্শ নিন। সমাজ যেন সংবাদপত্রের দর্পণ না হয়ে যায়!

অশেষ দাস

কলকাতা-১১০

 

পত্রিকা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সচেতনতার পাঠদানের যে সাফাই প্রকাশিত হয়েছে, তা সংবেদী পাঠকের প্রতি তীব্র আঘাতের সামিল বলে মনে করছি। এই জাতীয় চিত্র শিশু ও বয়স্কদের দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ু বিকলনের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। খাদ্য তালিকায় মাংস থাকলে পশু জবাই এক বাস্তব। তা হলে সেই কাজটি আড়ালে করার আইন আছে কেন? মনে হল, কোমলমতি শিশুদের বাস্তবতার বটিকা গিলিয়ে ঝটপট কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোই পত্রিকার অভিপ্রায়। কিন্তু তার তো একটা উপযুক্ত সময় আছে। বাড়ন্ত শিশুদের পক্ষে মাংস পুষ্টিকর। তাই বলে একটি তিন মাসের শিশুকে মাংস খাওয়ালে ফল বিষময় হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বনাথ পাকড়াশি

শ্রীরামপুর-৩, হুগলি

 

ছবিটি দেখে মনে পড়ে গেল গুজরাত দাঙ্গার সময় কুতুবুদ্দিনের ভয়ার্ত মুখের ছবিটির কথা। এই ধরনের ছবি প্রকাশই সত্যিকারের সাংবাদিকতা, যা দেখিয়ে দেয় কী নোংরা সমাজে আমরা বাস করতে বাধ্য হচ্ছি!

সমীরণ ঘোষ

কলকাতা-৩৪

 

আনন্দবাজারের যুক্তিগুলো অনেকটা এ রকম মনে হচ্ছে— সকালে আপনার স্ত্রী এক কাপ চায়ের সঙ্গে প্লেটে একটি মৃত আরশোলা এনে যদি আপনাকে পরিবেশন করেন, নিশ্চয়ই আপনি শিউরে উঠবেন। কিন্তু স্ত্রীর সপক্ষে যুক্তি, বহু বার বলা সত্ত্বেও স্বামী পেস্ট কন্ট্রোলের ব্যবস্থা নেননি!

শিবাশীষ ধর

কলকাতা-৭৪

 

সংবাদ সাদা কালো সব রকম তথ্য দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করবে, সচেতন করবে অবশ্যই। কিন্তু তার পরিবেশন নিশ্চয় এমন হবে না, যা অস্বস্তি, আতঙ্ক, ক্রোধ, প্রতিহিংসা তৈরি করবে। পোশাকের আড়ালে সবাই তো নগ্ন, তা বলে দর্পণে কি সেই বাস্তবতা দেখানো হবে?

সেখ হাফীজুর রহমান

দুর্গাপুর

 

কিছু কিছু সিনেমার ব্যানারে লেখা থাকে 'A', অর্থাৎ কঠোর ভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। যদি সব বয়সে সব কিছু গ্রহণযোগ্য হয়, তা হলে এ সবের প্রয়োজন কেন? তিন বছরের শিশুসন্তান যখন কাগজে ওই ছবি দেখে প্রশ্ন করে ‘‘কাকুটা এ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন?’’, তাকে কী উত্তর দেওয়া সমীচীন হবে?

বিজন ত্রিপাঠী

কলকাতা-৭৯

 

১০

 ‘‘এক ব্যক্তিকে নৃশংস ভাবে আততায়ীরা খুন করেছে’’— এই সংবাদ লেখার মধ্য দিয়ে কি খুন হয়ে যাওয়ার চিত্র ধরা পড়ে না? বীভৎস ছবি ছাপালে খুন হওয়ার সত্যতা আরও গভীর ভাবে প্রকাশ পায়? এই গভীরতা প্রকাশের জন্য সমাজের অন্য মূল্যবোধগুলিও যে খুন হয়ে যাচ্ছে, সেটা দেখার দায়িত্ব সংবাদপত্রের ওপর বর্তায় না? মানুষকে সচেতন করতে গিয়ে যদি সমাজকে অচেতনে ভরিয়ে দেওয়া হয় তা হলে সেই সমাজদর্পণের গ্রহণযোগ্যতা কি বজায় থাকে?

মিহির কানুনগো

কলকাতা-৮১

 

১১

বৈষ্ণব গ্রন্থে আছে, রাধারানি জন্মগ্রহণ করে চোখ খোলেননি। মা যশোদা যখন কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে তাঁকে দেখতে গেলেন, তখনই রাধা চোখ খুললেন। আবহমান কাল ধরে চলে আসছে, সকালে উঠেই ঠাকুরকে প্রণাম করা, দিনটা যেন ভাল যায়। কিন্তু উঠেই যদি এক ঝুলন্ত মৃতদেহ দেখতে হয়, তা হলে সারা দিন মনের মধ্যে যে যুদ্ধ চলে, তার উপশম কী?

দেবীদাস মণ্ডল

কলকাতা-১৩৪