শিশির রায়ের ‘আমরা কিছু করব না?’ (২২-২) প্রবন্ধে যথার্থই লেখা হয়েছে, এক দিকে বাংলা ভাষার মর্যাদা নিজেরাই প্রতি পদে হরণ করব, অন্য দিকে সমাজমাধ্যমে কাঁদুনি গাইব কলকাতার ব্যাঙ্ক থেকে মেট্রো স্টেশনের কাউন্টারে বাংলা বলার লোক নেই— এ চলতে পারে না। যে কোনও একটিই আমাদের ভবিতব্য— হয় আমাদেরই হাতে বাংলা ভাষার মর্যাদারক্ষা, নয়তো আমাদেরই হাতে বাংলা ভাষা সম্পূর্ণ পরাজিত, এই সত্যের স্বীকার। আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মধ্যে মাতৃভাষা নিয়ে আবেগের ঢল নামে। কিন্তু বাকি দিনের অভিজ্ঞতা আশানুরূপ নয়। সেখানে বাংলা ভাষার অধোগমন দ্রুত ও স্পষ্ট।
নব্বই দশকে স্যাটেলাইট চ্যানেল ঘরে ঘরে সুলভ হয়ে ওঠায় দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যম ও হিন্দি সিনেমার দৌলতে হিন্দি আগ্রাসন জাঁকিয়ে বসল। সেই সঙ্গে ঘটল প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি তুলে দেওয়ার হঠকারী সিদ্ধান্ত। এতে বাংলা স্কুলগুলি তাদের কৌলীন্য হারাল। ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দি ভাষায় সড়গড় হয়ে ওঠাটাই হল স্মার্টনেসের চাবিকাঠি। নব্বইয়ের দশকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়দের নেতৃত্বে রাজপথের দোকানের সাইনবোর্ডে বাধ্যতামূলক বাংলা লেখার উদ্যোগ প্রশাসনের উদাসীনতায় মাঠে মারা গেল। শহর, মফস্সলে দাপটে রাজত্ব করতে শুরু করল বাংলা, ইংরেজি, হিন্দির এক জগাখিচুড়ি ভাষা। কলকাতায় অবাঙালি বিক্রেতার সঙ্গে হিন্দিতে দর-কষাকষি করে আদ্যন্ত মাছে-ভাতে বাঙালি আজ তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। দশ মিনিট এফএম চ্যানেলের কথোপকথন শুনলে সহজেই বোঝা যায় বাংলা ভাষার পিছু হটার লক্ষণ। হিন্দি আধিপত্যবাদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে আমদানি হল— ধনতেরস, গণপতি বাপ্পার আরাধনা, বিবাহে মেহেন্দি, সঙ্গীত প্রভৃতি। স্বীয় সংস্কৃতির বিস্মরণ সত্যিই দুর্লভ। আগ্রাসী হিন্দির কাছে গুজরাতি, অসমিয়া, মরাঠি, তামিল, তেলুগু এমন নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছে বলে মনে হয় না।
সরিৎশেখর দাস, কলকাতা-১২২
ভাষার মর্যাদা
ভাষা দিবস আমাদের জাতীয় চেতনা, আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গভীর স্মারক। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করি শহিদদের স্মরণে, যাঁরা মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির আত্মা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক। বাংলা ভাষা হাজার বছরের সাহিত্য-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। চর্যাপদের আদি বাণী থেকে শুরু করে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য, আধুনিক যুগের কাব্য, উপন্যাস ও নাটক— সব মিলিয়ে বাংলা সাহিত্য এক অসীম ও অনন্য ভান্ডার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর অসামান্য সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে। অপর দিকে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিদ্রোহী চেতনা ও সাম্যের বাণী দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছেন নতুন শক্তি ও দিগ্নির্দেশনা। এ ছাড়া শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মানুষের সহজ-সরল জীবনের গল্পের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার গভীর ছাপ রেখেছেন।
ভাষা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বাংলা সাহিত্য ও ভাষার বিকাশে নতুন প্রজন্মের ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমান বাঙালি প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশ্বায়নের যুগে বেড়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও বহুভাষার প্রভাবের কারণে তাদের ভাষাচর্চায় পরিবর্তন এসেছে। অনেক সময় দেখা যায়, বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি বা মিশ্র ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এও সত্য যে, প্রযুক্তি বাংলা ভাষাকে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। অনলাইন বই, ব্লগ, ই-বুক ও অডিয়ো বুকের মাধ্যমে তরুণরা সহজেই বাংলা সাহিত্য পাঠ করতে পারছে।
বর্তমান প্রজন্ম যদি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও শহিদদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে সচেতন হয়, তবে তারা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আরও দায়িত্বশীল হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষায় শুদ্ধ উচ্চারণ, সঠিক বানান ও সাহিত্যচর্চা নিশ্চিত করতে হলে ছোটবেলা থেকেই মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসা জাগিয়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে সৃষ্টিশীল লেখালিখি, নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতে হবে।
ভাষা দিবস কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি ভবিষ্যতের অঙ্গীকারও। বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে হলে আমাদের ঐতিহ্যকে ধারণ করে আধুনিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে।
প্রদীপ চক্রবর্তী, নৈনীতাল, উত্তরাখণ্ড
উচ্চকিত
মধুমিতা দত্তের ‘বাসে-ট্রেনে শব্দ-সন্ত্রাস’ (১১-২) প্রবন্ধে প্রবন্ধকার একটি সময়োপযোগী বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। মেট্রোতে অনেকেই হেডফোন ব্যবহার করেন, ব্যতিক্রমী দু’-চার জন বাদে। কিন্তু মেট্রোয় যেটা বেশি হয়, তা হল— উচ্চৈঃস্বরে ফোনালাপ। টাওয়ার ভাল পাওয়া যায় না, তবু কিছু মানুষ প্রচণ্ড জোরে কথা বলতে থাকেন! আর অফিস টাইমের মেট্রোতে পারস্পরিক দূরত্ব বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। ফলে সহযাত্রীর চিৎকারে না-চাইলেও কানে ঢুকে পড়ে অন্যের সাংসারিক কলহ, সম্পর্কের টানাপড়েন কিংবা অফিসের কূটকচালি। শিয়ালদহ-বনগাঁ শাখার শব্দ-সন্ত্রাস আবার ত্রিবিধ। কেউ উচ্চৈঃস্বরে ফোনালাপে মগ্ন, কেউ নিকটস্থ যাত্রীর সঙ্গে চিৎকার করে ঝগড়ায় মত্ত আর এক বিরাট সংখ্যার যাত্রী ‘রিল’নিবিষ্ট। কিছু বছর আগেও ট্রেনে উঠলে দেখা যেত মানুষ হেডফোনে গান শুনছেন। তখনও রিল-এর দৌরাত্ম্য আসেনি। যদিও আমি কয়েক বার চেষ্টা করে দেখেছি ট্রেনে থাকাকালীন কামরার কোলাহল আর ট্রেনের নিজস্ব গতিময়তার আওয়াজে কানে তেমন শব্দ পৌঁছয় না, উপায়ান্তর না-দেখে বাড়াতে হয় আওয়াজ, যাতে নিজের কানেরই ক্ষতি। তাই গল্পের বই কিংবা না-পড়া পুরনো সংবাদপত্রই ভরসা। কিন্তু তাতে বাদ সাধে এই পথচলতি শব্দ-সন্ত্রাস। বিচ্ছিন্ন হয় মনোযোগ। যাত্রী হিসেবে যথোপযুক্ত ব্যবহার কেউ কাউকে শিখিয়ে দিতে পারে না, এটি সম্পূর্ণ নিজস্ব বিষয়। আইনের বেড়াজাল দিলেও তা ভাঙবে মানুষই, যদি নিজের সদিচ্ছা ও সচেতনতা না থাকে।
শ্রীপর্ণা চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা-১৩৪
আত্মসুখ
মধুমিতা দত্তের ‘বাসে-ট্রেনে শব্দ-সন্ত্রাস’ প্রবন্ধ পড়ে মনে পড়ে গেল গত ডিসেম্বরে পুরীগামী দূরপাল্লা ট্রেনের অভিজ্ঞতার কথা। নৈশ আহারের পর্ব মিটতেই শুরু হল ডিজে তাণ্ডব। প্রতিবাদে উল্টো প্রতিক্রিয়া। পরিবারের বড়দের সমর্থনে ছোট ছেলেমেয়েগুলি নাচতেও শুরু করে।
বাসে-ট্রেনে সহযাত্রীর মোবাইলের রিল বা গান বাধ্য হয়ে শুনতে হয়। কিছু মানুষ আত্মসুখে এমনই নিমগ্ন থাকেন যে, পাশের জন অসুস্থ না পরীক্ষার পড়ায় চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে, সে সব লক্ষও করেন না। প্রতিবাদের ফল বাগ্বিতণ্ডা। মানসিক শান্তি নষ্ট। স্বাধীনতা মানে যা খুশি করা নয়। অন্যের অধিকার রক্ষা করা যে একটি সামাজিক দায়িত্ব, এ সব ভুলতে বসেছি আমরা। আইন করে সব সমস্যার সমাধান হয় না। আত্মসুখের কারণে অন্যের অসুবিধা বা বিরক্তির কারণ না-হওয়া আসলে সামাজিক শিক্ষা, নাগরিক দায়িত্ববোধ। এই শিক্ষা সাধারণত আসে পরিবার-বিদ্যালয়-খেলার মাঠ থেকে। বর্তমানে কর্মব্যস্ত জীবনে বড়রা হয় কাজে নয় মুঠোফোনে ব্যস্ত। স্কুলে শাসন নিষিদ্ধ। শূন্য খেলার মাঠে না আছে ছোটরা না আছে শৃঙ্খলা, না আছে সেই শৃঙ্খলা শেখানোর মতো কেউ। তাই সহমর্মিতা, সহানুভূতির মতো গুণগুলি এখন ছোটদের মধ্যেও দেখা যায় না।
কেকা চৌধুরী, হরিপাল, হুগলি
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে