সম্পাদক সমীপেষু: কোন স্বার্থ কিসে পুষ্ট


•  মেডিক্যাল কলেজের আন্দোলন ও অনশন নিয়ে স্বাতী ভট্টাচার্য ‘দাবি মেটাতে মরণ পণ?’ (৯-৮) নিবন্ধে বলেছেন, ‘‘ধরা যাক, প্রথম বর্ষের জন্য আলাদা হস্টেলের প্রশ্নটা। কলেজ কাউন্সিল বলল, মেডিক্যাল কাউন্সিলের তাই নিয়ম। অনশন সমর্থকেরা বললেন, কাউন্সিল বলেছে, ওটা ‘প্রার্থিত’, ‘আবশ্যক’ নয়। মানার দরকার নেই।’’ শ্রীমতী ভট্টাচার্য সাংবাদিক, আর মেডিক্যাল কাউন্সিলের নিয়মাবলি গোপন নথি নয়। তিনি ইচ্ছা করলেই দেখতে পারতেন, মেডিক্যাল কাউন্সিলের নিয়ম অনুসারে, প্রথম বর্ষের ছাত্রদের আলাদা হস্টেল দেওয়ার দরকার নেই, তবে আলাদা ব্লক করে রাখা দরকার। পুরনো হস্টেল বা নতুন হস্টেলে আলাদা ব্লক করে রাখাতে কোনও আন্দোলনকারী আপত্তি করেননি। নতুন হস্টেলটা এত বড় যে, নতুন-পুরনো মিলিয়ে সব হস্টেলে ছাত্রছাত্রী রাখলে মেডিক্যাল কাউন্সিলের অন্য একটি ‘প্রার্থিত’ জিনিস— ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হওয়া শতকরা ৭৫ ভাগ স্টুডেন্টের হস্টেলে সিট পাওয়ার ব্যবস্থা করা— সম্ভব, বা প্রায় সম্ভব। সেই নিয়ম বা নির্দেশিকা শ্রীমতী ভট্টাচার্য বোধ করি দেখার সময় পাননি। অথচ এই জন্যই আন্দোলন হচ্ছিল।

মেডিক্যাল কলেজে র‌্যাগিং হয় না, আর মেডিক্যাল কাউন্সিলের নিয়ম র‌্যাগিং আটকানোর জন্য। শ্রীমতী ভট্টাচার্যের অভিযোগ, র‌্যাগিং না হলেও সেখানে হস্টেলে ‘রাজনৈতিক দলে টানার কাজটা’ চলে, আর সেটাও সমান নিন্দনীয়। তাঁর সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত পোষণ করে কয়েকটি কথা বলি। ঠিক এই কারণেই নতুন হস্টেল নিয়ে সমস্যা তৈরি করা হয়েছিল। লেখিকা নিজেই বলেছেন, ‘‘তৃণমূল নেতা নির্মল মাজির নির্দেশেই নতুন হস্টেল থেকে দূরে রাখা হয়েছিল সিনিয়রদের। উদ্দেশ্য, প্রথম বর্ষের ছেলেদের ওপর দখল কায়েম।’’ কিন্তু, যেখানে ‘রাজনৈতিক দলে টানা’র কাজটা করা হচ্ছে মেডিক্যাল কাউন্সিলের র‌্যাগিং-এর বিরুদ্ধে ‘প্রার্থিত’ ব্যবস্থার ছুতো দেখিয়ে, সেখানে তার প্রতিবাদ করাটাকে হঠাৎ লেখিকা ‘আনুগত্যকামী’ ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করলেন কোন যুক্তিতে, তা স্পষ্ট হল না। যে সব ছাত্র আন্দোলন করেছেন, তাঁরা অন্য হস্টেলে ডা. নির্মল মাজির অনুরূপ কায়দায় বিরোধীপক্ষ নিশ্চিহ্ন করেছেন, তা তো নয়। দু’একটি হস্টেলে তাঁরা সংখ্যাগুরু, সেটা গণতন্ত্রে অপরাধ বলে ধরা হয় না।

লেখিকা খুব অস্বস্তিতে পড়েছেন এই দেখে যে, ছাত্রদের আমরণ অনশনের সমর্থনে যে সব প্রবীণ চিকিৎসক প্রতীকী অনশন করেছেন, তাঁদের তিন জন রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে ডা. নির্মল মাজির বিরোধী প্রার্থী, আর অনশন-প্রসূত নাগরিক উত্তেজনা তাঁদের স্বার্থ পুষ্টি করেছে। এই তিন জনের এক জন হিসেবে আমার এই অভিযোগের উত্তর দেওয়ার দায় থাকে।

শ্রীমতী ভট্টাচার্যর যুক্তি অনুসারে, যদি কোনও বিষয়ে আমার প্রতিবাদ করা দরকার মনে হয়, তা হলে আমাকে আগে দেখে নিতে হবে তাতে ‘আমার স্বার্থ পুষ্ট’ হচ্ছে, এমনতর অভিযোগ কেউ কোনও ভাবে করতে পারেন কি না। আমার বিবেকবুদ্ধি চুলোয় যাক, যদি এমন কথা ওঠার কোনও সম্ভাবনা থাকে তবে আমি প্রতিবাদ করতে পারব না। সমস্যা হল, চিকিৎসার বাণিজ্যিকরণের প্রতিবাদী হিসেবে, সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসক হিসেবে, যে কাজ আমি এত দিন করেছি, তার ফলে আমার পয়সাকড়ি না হোক, কিছু সুনাম হয়েছে। অর্থাৎ লেখিকা বলতেই পারেন, আমার স্বার্থ পুষ্ট হয়েছে, ঠিক যে ভাবে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অবিচার নিয়ে নানা লেখার ফলে শ্রীমতী ভট্টাচার্যের স্বার্থ পুষ্ট হয়েছে। এই অদ্ভুত বিচারধারার এটাই একমাত্র যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

অনশন করাটা ঠিক না ভুল, এ নিয়ে লেখিকা বিস্তর কথা বলেছেন। খালি এটা বলেননি, অনশনে নামার সিদ্ধান্ত ছাত্ররা নিয়েছিলেন পুলিশ ও শাসক দলের গুন্ডাদের আক্রমণের পরে। তার আগে তাঁরা প্রিন্সিপালের ঘরের সামনে অবস্থানে বসেছিলেন। ৫ জুলাই রাত্রে সেই শান্তিপূর্ণ অবস্থানের ওপর পুলিশ ও গুন্ডাবাহিনীর যৌথ আক্রমণ তাঁদের মেরেধরে সরিয়ে দেয়। তার পর অনশনে বসেন তাঁরা। অনশনের দুই সপ্তাহ দূরে বসে দু’বেলা খেয়ে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, তবে পুরো ঘটনাটি বলার দায় সৎ সাংবাদিকতার একটা অঙ্গ বলেই মনে হয়। আশা করি শ্রীমতী ভট্টাচার্য এই কথাগুলো আমার স্বার্থ পুষ্ট করছে বলেই একেবারে ফেলে দেবেন না।

ডা. পুণ্যব্রত গুণ

ইমেল মারফত

পরিহাস

•  স্বাতী ভট্টাচার্যের নিবন্ধে দু’একটি তথ্যবিভ্রাট এবং তার উপর নির্ভর করে টানা সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু বলার তাগিদ অনুভব করছি। পূর্বনির্ধারিত কোনও সময় ও নির্দেশ ছাড়াই পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের ছাত্রীদের রাতারাতি বিধুমুখী হস্টেল থেকে নতুন হস্টেলে স্থানান্তরিত করা হয়। (হয়তো কর্তৃপক্ষের ভয় ছিল যে আন্দোলনরত ছাত্ররা নতুন হস্টেল দখল করে নেবেন)। ছাত্ররা নতুন হস্টেলে তখন পোস্টার দেন়। তালা নয়। প্রসঙ্গত, এর পরে ছাত্রীরাও এই আন্দোলনে শামিল হন। দ্বিতীয়ত হস্টেল সারাতে বলা, দাবি জানানো, গত কয়েক বছর ধরে চলছে। অনশন হঠাৎ কেউ শখ করে শুরু করে না।

অনশন শুরুর আগে ও চলাকালীন এই আলোচনা বার বার হয়েছে। সিনিয়র ডাক্তাররা উদ্যোগী হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-ও এক বার মধ্যস্থতা করে। পরিহাসের বিষয়, আলোচনা চলাকালীন টেবিলের উল্টো দিক থেকে ছাত্রদের দাবির যথার্থতা মেনে নিয়ে সোজাসুজি বলা হয়েছে যে, উচ্চতর স্তর থেকে নির্দেশ না এলে কিছু করা যাবে না। উচ্চতর স্তর মানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী। জানতে পারিনি, এতই ছোট একটা বিষয়, যা নিয়ে অনশন করা বাড়াবাড়ি, সেটা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এত দূর যেতে হবে কেন?

সব শেষে বলতেই হবে, অনশন আর কোনও অস্ত্র নয়। শর্মিলা চানুর অনশনে মিডিয়া আর নাগরিক সমাজের উদাসীনতা এই সত্যকে সামনে আনে। আজকের শাসক কোনও রকম আলোচনায় আস্থা রাখে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই সর্বভারতীয় রাজনীতির ডামাডোল আর ২০১৯-এর লোকসভা ভোট সামনে না থাকলে, এ বিষয়টি মেনে নেওয়া হত বলে মনে হয় না।

বোলান গঙ্গোপাধ্যায়

কলকাতা-৩

নৈতিকতা

• আমার বিশ্বাস, স্বাতী ভট্টাচার্য অনশনের রাজনীতির নৈতিকতা ও প্রয়োগক্ষেত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পাঠকের কাছে বার্তা পৌঁছল খানিক এ রকম: অতীতের এবং সমসময়ের অন্য অনশন আন্দোলনগুলির তুলনায় মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের আন্দোলনটি দৃষ্টিকটু ভাবে অযৌক্তিক, অগণতান্ত্রিক, স্বার্থসর্বস্ব, দখলদারি চরিত্রের, এবং এই সুযোগে কিছু কুচক্রী চিকিৎসক এক মাননীয় নেতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করছেন।

সকলের কথা শোনার ব্যাপারে লেখিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের এ এক বিরাট সমস্যা। আমাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সকলের মতামত নেন না। এই বিষয়ে আলোচনা এবং উন্নতি প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চিন্তার ব্যাপার হয়, যখন কোনও কলেজের অধ্যক্ষ কলেজের নিয়মবিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত নেন এবং তা জোর করে চাপিয়ে দেন। সব ছাত্রছাত্রীর হস্টেল কাউন্সেলিং-এ অংশ নেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া রীতিমতো অগণতান্ত্রিক, নয় কি?

অকারণে প্রতি দিন ধর্মঘট বা অনশন করতে থাকলে তা গুরুত্ব হারাবে, সে বিষয়ে সংশয় নেই। কিন্তু কোনটা কারণ আর কোনটা অকারণ, তা আলোচনার বাইরে থেকে গিয়েছে। বাসস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা কি না এবং অন্যায় ভাবে আশ্রয়চ্যুত করা প্রতিবাদযোগ্য কি না, তা ভাবা দরকার। গাঁধীজি যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় ফার্স্ট ক্লাসে চড়তে না দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন, তা নিশ্চয় গরিষ্ঠ সংখ্যক শ্বেতাঙ্গ বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিতে অযৌক্তিক মনে হয়েছিল।

কৌশিক দত্ত

কলকাতা-৭৪

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট,
কলকাতা-৭০০০০১।

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।