‘সরস্বতীর ভান্ডার’ (২৬-৪) শীর্ষক অতনু বিশ্বাসের প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। পৃথিবীটা আরও একটু বেশি শৈল্পিক হয়ে ওঠার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ‘সরস্বতী ভান্ডার’ নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। আয়ারল্যান্ডের এই পাইলট প্রকল্প বিশ্বের শিল্পী-সাহিত্যিকদের কাছে ধন্যবাদার্হ। সত্যিই, শুধুমাত্র শিল্পী-সাহিত্যিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শর্তহীন নিয়মিত আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করে দেওয়ার ঘটনা দুনিয়া জুড়ে বিরল।
তবু মনে হয়, প্রকৃত শিল্প বা শিল্পী কখনওই সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতার মুখাপেক্ষী নন। অনামা, অখ্যাত বহু শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিকই সৃষ্টির প্রেরণায় এই প্রতিকূল সময়েও বুঁদ হয়ে আছেন। যদিও ইতিহাস সাক্ষী, একদা রাজা-রাজড়াদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই শিল্পী-সাহিত্যিকেরা রাজসভাকে আলোকিত করে রাখতেন। সম্রাটদের আর্থিক সহায়তায় শিল্পচর্চা সজীব হয়ে উঠত। আমাদের দেশে আজও নানা নাট্যদল সরকারি সহায়তায় উপকৃত হয়। আবার বহু সৃষ্টিশীল মঞ্চও নানা ধরনের অনুদান পেয়ে থাকে। এমনকি, আজকের প্রতিষ্ঠিত শিল্পী-সাহিত্যিকদের একাংশও নানা সময়ে প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার সুবিধা পেয়েছেন।
কিন্তু এ কথা মানতে দ্বিধা নেই যে, বহু অনামী ও অখ্যাত শিল্পী-সাহিত্যিক আজও উপেক্ষিত। তাঁরা শিল্প সৃষ্টি করে চলেছেন, অথচ পণ্য হিসাবে তাঁদের সৃষ্টির মূল্য যেন প্রায় শূন্য। আমাদের দেশে অখ্যাত শিল্পী-সাহিত্যিকদের দুর্দশা সত্যিই অবর্ণনীয়। এখানে প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক কাগজ বা পত্রিকায় প্রকাশিত গল্প-কবিতার সাম্মানিকটুকুই যেন এক জন কবি বা গল্পকারের জীবনের রসদ! অথচ সেই অর্থ কিন্তু বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
তবুও এ দেশে শিল্প বা সাহিত্যসৃষ্টি থেমে নেই। বরং বলা যায়, এখনও এ দেশে এক জন অনামা শিল্পীর তুলির আঁচড়ের কোনও বাজারমূল্য না থাকলেও সৃষ্টির শক্তি অমলিন। অন্য দিকে, তারকা বা খ্যাতনামা শিল্পীর ক্যানভাস প্রায়ই হয়ে ওঠে অভাবনীয় মূল্যের দাবিদার।তবুও এই প্রতিকূল সময়েও তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে যখন কোনও অজ্ঞাতকুলশীল শিল্পী বা সাহিত্যিক সৃষ্টির তাড়নায় ছটফট করে, তখন বুঝতে হবে আগামী দিনেও দারিদ্র উপেক্ষা করে এ দেশের শিল্পী-সাহিত্যিকেরা সৃষ্টিশীল হয়েই থাকবেন। প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা বা অর্থানুকূল্যের ভাবনা ছাড়াই তাঁরা ‘চরৈবেতি’ মন্ত্রে এগিয়ে যাবেন। তবে সঙ্গে যদি প্রশাসনিক উদ্যোগে ‘সরস্বতী ভান্ডার’-এর মতো কোনও প্রকল্প তাঁদের দোসর হয়, তা হলে তো বলতে হবে সোনায় সোহাগা। কিন্তু, জানি যে আমাদের গরিব দেশের শিল্পী-সাহিত্যিকদের সৃষ্টিভান্ডার কোনও প্রকল্পের অভাবে থমকে যাবে না। সৃষ্টির তাড়নায় একের পর এক শিল্পকর্ম সমুদ্রস্রোতের মতোই অবিরাম আছড়ে পড়বে।
সঞ্জয় রায়, দানেশ শেখ লেন, হাওড়া
রাষ্ট্রের দায়
অতনু বিশ্বাসের ‘সরস্বতীর ভান্ডার’ শীর্ষক প্রবন্ধটি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত জরুরি। শিল্পীদের জন্য রাষ্ট্রপ্রদত্ত ‘বেসিক ইনকাম’ বা মৌলিক আয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে লেখক যে যুক্তিগুলি সাজিয়েছেন, তা গভীর আলোচনার দাবি রাখে।
অতিমারি-পরবর্তী সময়ে শিল্পীদের চরম অস্তিত্বসঙ্কটের কথা মাথায় রেখে এই প্রস্তাব নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মানবিক। লেখক শিল্পীদের শুধু ‘বিনোদনের কারিগর’ হিসাবে না দেখে, তাঁদের নাগরিক অধিকারের জায়গা থেকে বিষয়টিকে বিচার করেছেন। তবে, আয়ারল্যান্ডের মতো স্বল্প জনসংখ্যার দেশের মডেল ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্রময় দেশে কতটা কার্যকর হবে, সেই ব্যবহারিক দিকটি অনালোচিতই থেকে গিয়েছে। আমাদের দেশের প্রশাসনিক পরিকাঠামোয় প্রকৃত শিল্পী নির্বাচন এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উপর যে বিপুল আর্থিক চাপ পড়তে পারে, কিংবা এর ফলে করদাতাদের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, সে বিষয়েও ভাবনা জরুরি। অনেকের মতে, নিঃশর্ত আর্থিক নিরাপত্তা শিল্পের সৃষ্টিশীলতাকে কিছুটা শিথিল করে দিতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা ছাড়া শিল্পের উৎকর্ষ কতটা বজায় থাকবে, সেটিও বিতর্কের বিষয়। তবুও লেখক সাহসিকতার সঙ্গে দেখিয়েছেন যে, শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখা কোনও বদান্যতা নয়, বরং রাষ্ট্রের কর্তব্য।
দেবাশিস চক্রবর্তী, মাহেশ, হুগলি
টানাপড়েন
অতনু বিশ্বাসের ‘সরস্বতীর ভান্ডার’ প্রবন্ধটি যখন বাঙালি পাঠক হিসাবে পড়ি, তখন পাঠরস গ্রহণের পাশাপাশি স্বাভাবিক ভাবেই মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি আমাদের দেশের শিল্পচর্চার হালহকিকত এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটিকে। আমাদের দেশের প্রশাসনিক স্তরেও শিল্পীদের জন্য দীর্ঘ দিন ধরেই নানা ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রকল্প চালু রয়েছে। কিন্তু সেই আর্থিক সহায়তা এবং তার পরিমাণ নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, তা নিয়ে ততটা আলোচনা হয় না।
আমাদের দেশে কোনও প্রকল্পের সুবিধা পেতে গেলে শিল্পীকে নানা ধরনের শর্তপূরণের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এমনকি অনুদান পাওয়ার পরেও শিল্পচর্চার সময় সেই শর্তগুলিকে মাথায় রেখেই কাজ করতে হয়। এই পরিস্থিতি কোনও না কোনও ভাবে এক জন শিল্পীর স্বাধীন সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
ফলে, প্রবন্ধটি যেমন এক দিকে শিল্প ও শিল্পীর জীবনে আশাবাদের দিশা দেখায়, তেমনই বাংলা ভাষার পাঠক এবং ভারতীয় হিসাবে আমার দেশের শিল্প-পরিকাঠামোয় তার প্রয়োগ ও উপযোগিতা নিয়ে নতুন কৌতূহলও উস্কে দেয়। সরস্বতীর সঙ্গে লক্ষ্মীর ভগিনীপ্রেম ও ভালবাসার সম্পর্ক আমরা জীবনভর খুঁজবই। কিন্তু তাঁদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, পথের পার্থক্য এবং অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের কথাও মাথায় রাখা জরুরি। সেই টানাপড়েনই তো চিরকালীন।
অভীক ভট্টাচার্য, কলকাতা-১২৭
শিল্পীর সংগ্রাম
অতনু বিশ্বাসের ‘সরস্বতীর ভান্ডার’ প্রবন্ধটি সারস্বত সাধনায় নিমগ্ন প্রতিভাবান মানুষদের প্রতি রাষ্ট্রের এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই দেখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে রাজা বা সম্রাটদের দরবারে সাহিত্যচর্চা, সঙ্গীতচর্চা, নৃত্যকলা-সহ নানা ধরনের শিল্পচর্চার একটি বিশেষ স্থান ছিল। সেই শিল্পকলার কারিগরদের শুধু যথাযোগ্য সম্মান প্রদানেই শাসকেরা ক্ষান্ত থাকেননি, ছিল সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থাও। এই পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই বহু শিল্পী নিজের এবং পরিবারের ভরণপোষণের দায় থেকে খানিক মুক্ত থেকে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পেরেছিলেন সৃষ্টির জগতে। ফলত সৃষ্টি হয়েছিল বহু অমর, কালজয়ী সাহিত্য ও শিল্পকলা।
পেটের ভাত জোগাড়ের জন্য যদি দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয়ে যায়, তা হলে সৃষ্টির জন্য সময় কোথায়? পেশাগত কাজকর্ম সেরে ফিরে এসে সৃষ্টির মন্দিরে ডুব দেওয়ার সাধনা ক’জনের পক্ষেই বা সম্ভব? প্রশ্ন উঠতেই পারে, পৃষ্ঠপোষকতা কি আজও হয় না? হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় অন্তরায় হল, কারা এই সুবিধা পাবেন সেই তালিকা প্রস্তুত করা।
ইতিহাস বলে যে, অতীতে অনেক শিল্পী-সাহিত্যিককে পৃষ্ঠপোষকদের গুণকীর্তন করতেই তাঁদের সময়ের বড় অংশ ব্যয় করতে হত। তাই ‘সরস্বতী ভান্ডার’-এর ভাবনাটি নিঃসন্দেহে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োচিত প্রস্তাব। তবে এর বাছাই প্রক্রিয়া হতে হবে মানদণ্ডভিত্তিক, স্বচ্ছ এবং সর্বোপরি অরাজনৈতিক। তবেই হয়তো আমাদের রাজ্য বা দেশ আরও শৈল্পিক হয়ে উঠতে পারবে।
সুকুমার বারিক, কলকাতা-২৯
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে