কাজী আবদুল ওদুদকে নিয়ে প্রাবন্ধিক ও ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তীর চিঠি-প্রবন্ধের আঙ্গিকে ‘আরশিনগরের পড়শি’ (১-৩) শীর্ষক জীবনালেখ্যটি অত্যন্ত মননঋদ্ধ ও সত্যানুসন্ধানের আলোকে উদ্ভাসিত। হিন্দু-মুসলমান— দু’টি ‘প্রাণবন্ত’ সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বয়বাদী মূল্যায়নের ভিত্তিতে সবার আগে প্রয়োজন হল সংস্কারমুক্ত, দৃঢ়চেতা ভাবাদর্শের সুগভীর ও ঐকান্তিক মিলন। আজীবন মানবতার উপাসক কাজী আবদুল ওদুদ তাঁর ‘ব্যর্থতার প্রতিকার’ প্রবন্ধে সেই সমাধানের মহতী বার্তাটি বেশ স্পষ্ট ভাবেই তুলে ধরেছিলেন।
তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, ভারতীয় বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বহুকালের স্রোতস্বিনীর ধারায় হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায় এমনই অঙ্গাঙ্গি ভাবে প্রবহমান যে, সেই হিল্লোল স্রোতধারা কোনও সংস্কারবদ্ধ কুটিল প্রতিবন্ধকতার কারণে গতিরুদ্ধ হলে তা উভয়ের পক্ষেই ঘোরতর বিপজ্জনক। তিনি হিন্দু-মুসলিম মিলনের সৃষ্টিশীলতার বিষয়ে আমরণ এতটাই বিশ্বাসী ছিলেন যে, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগকে কখনও সমর্থন করেননি। তাঁর কথাতেই তাঁর একমাত্র স্বপ্নকে বোঝা সম্ভব হবে— “স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন— ভারতীয় জাতীয়ত্বের রূপ হবে ইসলাম-দেহ ও বেদান্ত-মস্তিষ্ক। তার চাইতে এই কথা বলাই ভালো, ভারতীয় জাতীয়ত্বের রূপ হবে পূর্ণাঙ্গ মানব-দেহ ও পূর্ণাঙ্গ মানব-মস্তিষ্ক, সৃষ্টি-শক্তির প্রকাশ যার ভিতরে হবে অবাধ। ইসলাম ও বেদান্ত মানুষের সৃষ্টি-শক্তিরই পরিচয়-চিহ্ন। মানুষের সেই সৃষ্টি-শক্তি কোনো দিন নিঃশেষিত হবে না, চিরদিন অক্লান্ত ও অম্লান থাকবে, এই-ই তার জন্ম-অধিকার। সে-অধিকার সত্য হোক।” (‘ব্যর্থতার প্রতিকার’— ১৯৩৫ সাল নাগাদ রচিত)
শ্রেণি-বর্ণ নির্বিশেষে সংস্কারমুক্ত যুক্তিবাদী সকল ব্যক্তির মনে তাঁর উদাত্ত, গভীর মননাচরণের স্মৃতি চিরকাল এক অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো অম্লান থাকবে।
পৃথ্বীশ মজুমদার, কোন্নগর, হুগলি
প্রগতির দূত
দীপেশ চক্রবর্তীর ‘আরশিনগরের পড়শি’ শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। কাজী আবদুল ওদুদ ছিলেন মননশীল, প্রতিভাধর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বোধশক্তির দীপ্ত ভাবনায় তিনি সাহিত্য সৃষ্টি করেছিলেন। ভারতীয় রাজনীতি, সভ্যতা ও শিল্প-সংস্কৃতির গভীর মূল্যায়ন করেছেন তিনি। তদানীন্তন মুসলমান সমাজের সংস্কারপীড়িত জীবনকে সমুন্নত করতে তিনি বিশেষ প্রয়াসী ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বুদ্ধির মুক্তি ছাড়া সংস্কারাবদ্ধ, স্থবির সমাজের মুক্তি সম্ভব নয়। আসলে তিনি চেয়েছিলেন মানবতার জাগরণ ঘটাতে; সেই সঙ্গে সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের জয় ঘোষণা করতে।
বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনকৃতির মধ্যে সেই মানবতাবাদী সুর লক্ষ করেছিলেন বলেই এক দিন তিনি জোরের সঙ্গে বলেছিলেন, “হিন্দুত্বের আড়ম্বর বঙ্কিম-সাহিত্যে যতই থাকুক তাঁর সত্যকার প্রতিপাদ্য হিন্দুত্ব নয় মানবতা— একথা আরও স্পষ্ট করে বোঝা যায় তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যের কথা ভাবলে।...”
প্রসঙ্গত, মনে রাখা ভাল, ‘বন্দে মাতরম্’-কে কেন্দ্র করে যখন সারা ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ার এসেছিল, তখন এর হিন্দুত্ব নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেননি। পরবর্তী কালে সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক মতবাদকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন ওঠে। বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই তাঁর আনন্দমঠ-এ চিকিৎসকের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, “তেত্রিশ কোটি দেবতার পূজা সনাতন ধর্ম নহে।”
কাজী আবদুল ওদুদ ছিলেন মনীষাদীপ্ত; অথচ সহজ, স্নিগ্ধ এক রচয়িতা। কবিগুরু গ্যেটে বইয়ে গ্যেটের জীবন ও ফাউস্ট-এর বিশ্লেষণ তাঁকে বিশেষ ভাবে স্মরণীয় করে রেখেছে। আবার মুসলমান চাষি গৃহস্থের সহজ সরল জীবনের স্বাভাবিক ও সরস বর্ণনা সমৃদ্ধ তাঁর নদীবক্ষে উপন্যাসও পাঠকমহলে যথেষ্ট সমাদৃত। আজ ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর শতবর্ষে মানবতাবাদী জীবনদার্শনিক কাজী আবদুল ওদুদকে মনে পড়া স্বাভাবিক। সংঘর্ষদীর্ণ, ভিন্নমতের বিরোধে জীর্ণ দেশের ঐক্যসাধনায়, এমনকি তামাম পৃথিবীর মানুষের মধ্যেকার ঐক্য রক্ষায়— এমন উদার, প্রগতিশীল মহাপ্রাণ মানুষের প্রয়োজন আজও অনস্বীকার্য।
সুদেব মাল, তিসা, হুগলি
আত্মদর্শন
এই রাজ্য এবং দেশের নানা প্রান্তে যখন অসহিষ্ণুতার ক্রমবর্ধমান চিত্র সংবেদনশীল মানুষের মন ও মননে গভীর যন্ত্রণার উদ্রেক করছে, তখন দীপেশ চক্রবর্তীর চিঠিরূপী প্রবন্ধ ‘আরশিনগরের পড়শি’ এক আত্মদর্শনের আয়না হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বহন করে।
এই প্রবন্ধের শেষে লেখা হয়েছে— হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি বহু দিনের পড়শি। অতিসত্য এই বক্তব্য একটি প্রশ্নের উদ্রেক করে। লালন সাঁইয়ের দর্শনে বাড়ির কাছে আরশিনগরে যে পড়শি বসত করে, সে আর কেউ নয়, মানুষের অন্তরাত্মা। তবে, মনে সংশয় হতে পারে, হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি বহু দিনের পড়শি হওয়া সত্ত্বেও ‘গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়’— প্রেমের এই নিঃশর্ত অনুভব কি সবখানে এসেছে? না কি অনেক ক্ষেত্রেই ‘আমি পরধর্ম-সহিষ্ণু’— এই শ্লাঘা পরস্পরের মধ্যে একটি অদৃশ্য প্রাচীর তুলে রেখেছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গুলিহেলনে ক্রম দৃশ্যমান হয়ে উঠে পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইকে আরও প্রকট করে তোলে?
অনিরুদ্ধ রাহা, কলকাতা-১০
চাই স্বচ্ছতা
ভোট বলুন বা এসআইআর— গণতন্ত্রের উৎসব পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন-এর। নির্বাচন কমিশন একটি স্বশাসিত সংস্থা। কমিশনের হাতে রয়েছে বিপুল ক্ষমতা; নিজস্ব কর্মী না-থাকাটাই তার প্রধান দুর্বলতা। এই দুর্বলতাই কেন্দ্র ও রাজ্য— উভয় শাসককেই পরোক্ষে সুবিধা দেয়। রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের কর্মীদের উপর নির্ভর করেই গত কয়েক দশক ধরে ভোটার তালিকা প্রস্তুত থেকে ভোট-পরিচালনার যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করছে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের এই পরনির্ভরশীল প্রতিষ্ঠান।
ভোট সংক্রান্ত যে কোনও কাজে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কর্মী নেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের অধীনস্থ স্কুলগুলি থেকে। প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক, করণিক, পিয়ন— কেউই বাদ যান না। স্কুলগুলি থেকে কার্যত সব কর্মী নেওয়ার পরেও ঘাটতি থাকে; সেই ঘাটতি পূরণ করা হয় রাজ্য সরকারের অন্যান্য দফতর, কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু দফতর এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে কর্মী নিয়ে। কিন্তু লক্ষণীয়, অন্য কোনও দফতর থেকেই এ ভাবে সিংহভাগ কর্মী তুলে নেওয়া হয় না, যেমনটা হয় স্কুলগুলির ক্ষেত্রে।
গত কয়েক মাস ধরে এ রাজ্যে চলা এসআইআর-এর কাজেও অন্যান্য দফতর ও ব্যাঙ্ক থেকে কর্মী নেওয়া হয়েছে বলেই অনুমান। ফলে কমবেশি সব সরকারি দফতরেই কাজের ব্যাঘাত ঘটছে এবং তার জেরে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ব্যাঙ্ক পরিষেবাতেও একই সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
কিন্তু গণতন্ত্রের এই বৃহৎ আয়োজনের জন্য কোন দফতর থেকে কত জন কর্মী নেওয়া হল— তার নির্দিষ্ট তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করা হয় না। ফলে ভোটের প্রশিক্ষণ পর্ব থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে বহু সরকারি দফতর, ব্যাঙ্ক এবং কিছু কেন্দ্রীয় দফতরের দৈনন্দিন কাজ আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে ব্যাহত হয়। সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় পরিষেবা না পেয়ে ফিরে যান। এসআইআর চলাকালীনও এই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হয়েছে; উপরন্তু, প্রায় প্রতি বছর কোনও না কোনও নির্বাচনের সময়ে সরকারি পরিষেবায় ঘাটতি এখন প্রায় নিয়মে পরিণত।
তবে এও সত্য, স্কুল ছাড়া অন্য দফতরের সব কর্মীকে ভোটের কাজে ডাকা হয় না। এমন বহু দফতর বা ব্যাঙ্ক শাখা রয়েছে, যেখান থেকে এক জন কর্মীকেও নির্বাচন-সংক্রান্ত কাজে নেওয়া হয় না। অথচ সেখানেও অনেক সময় ‘ভোটের কাজ’-এর অজুহাতে পরিষেবা সীমিত থাকে। প্রশ্ন ওঠে— কোন দফতর থেকে কত জন কর্মীকে, কত দিনের জন্য নির্বাচন কমিশন কাজে নিয়েছে, সেই তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না কেন? রিটার্নিং অফিসার বা সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের স্বাক্ষর ও সিল-সহ কর্মীদের তালিকা সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রকাশ্যে টাঙানো উচিত।
ইন্দ্রনীল ঘোষ, লিলুয়া, হাওড়া
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে