সম্পাদক সমীপেষু: পরকীয়া অপরাধ


সম্প্রতি একটি জনস্বার্থ মামলায় শীর্ষ আদালতকে হলফনামা দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে পরকীয়া অপরাধ। এই বিষয়ে কিছু বলবার জন্যই এই পত্রের অবতারণা। বৈষ্ণবরসশাস্ত্রে দেখা যায়, বৈষ্ণব আধ্যাত্মিকতায় প্রেম বা প্রণয়ের পরিপূর্ণতা পরকীয়া প্রেমে। বৈষ্ণব রসশাস্ত্রকার রূপ গোস্বামী সুস্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করেছেন, “পরকীয়া সঙ্গে কৃষ্ণের অধিক আনন্দ।/ ইহাতে প্রচ্ছন্ন ক্রীড়া করেন গোবিন্দ।।/ সকলের শ্রেষ্ঠা হয় পরকীয়া নারী।/ আপন মহিমা তার কহেন শ্রীহরি।।”

বহু শতাব্দী যাবৎ ভারতবর্ষে সর্বাধিক জনপ্রিয় প্রণয়কাহিনির নায়ক-নায়িকা কৃষ্ণ ও রাধিকা। পরকীয়ার মধুরতা বিবৃত করতে রূপ গোস্বামী আরও বলেছেন, “পরকীয়া নায়িকার সঙ্গে রতিসম্ভোগে যে আনন্দ মাধুর্যরস আস্বাদিত হয় তার তুলনা হয় না। বিধিনিষেধের সকল বাধা লঙ্ঘন করে আকুল আগ্রহ ও অসীম ধৈর্যের সঙ্গে অগ্রসর হয়ে পরকীয়ার রতি আস্বাদন করতে হয়, তাই পরকীয়ার রসোৎকর্ষ অন্য সকল রসানুভূতির তুলনায় শ্রেষ্ঠ।” কেননা “সংসারধর্মে রত থেকেও নায়িকার মনে যেমন উপপতির প্রতি গভীরতম গোপন আকর্ষণ প্রবল হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনি আকর্ষণ যখন শ্রীকৃষ্ণের প্রতি উপস্থিত হয়, তখনই হয় শ্রেষ্ঠ ভগবৎ-প্রেমের সঞ্চার।”

পৃথিবীর বিশাল সাহিত্য-মানচিত্রে পরকীয়ার একটি বিশাল অংশ। সীতা ও হেলেন হরণ তো পরকীয়া সম্পর্কেরই এক অন্য রূপ। পৃথিবীর অন্যান্য কাব্যসাহিত্য যেমন ইতালীয় মহাকবি দান্তের ‘লা দিভিনা কম্মোদিয়া’ (Divine Comedy) কাব্যে ফ্রাঞ্চেস্কা প্রেমে পড়েন তাঁর স্বামীর অনুজ ভ্রাতা পাওলোর। প্রাচীন পারস্যের মহাকবি ফেরদৌসি রচিত ‘শাহনামা’ মহাকাব্যে সম্রাট কাওকাউসের প্রধানা মহিষী সওদাবা আসক্ত হয়ে পড়েন তাঁর সতিনপুত্র সিয়াউসের প্রতি। ভারতীয় পৌরাণিক সাহিত্যেও পরকীয়ার অজস্র উদাহরণ। দেবগুরু বৃহস্পতির স্ত্রী তারার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে চন্দ্র তাঁকে প্ররোচিত করে নিয়ে এসে একত্রে বহু দিন যাপন করেন। তাঁদের সহবাসের ফলে জন্ম হয় বুধের। আবার দেবগুরু বৃহস্পতিও সঙ্গমে লিপ্ত হন তাঁর অন্তঃসত্ত্বা ভ্রাতৃবধূ মমতার সঙ্গে। আর মহাভারত তো যথেষ্ট পরকীয়া প্রেমে সমৃদ্ধ। রামায়ণে বর্ণিত গৌতম মুনির স্ত্রী অহল্যা ছিলেন পরম রূপবতী। তাঁর প্রতি প্রবল আসক্তি ছিল দেবরাজ ইন্দ্রের। গৌতমের অনুপস্থিতিতে এক দিন ইন্দ্র, গৌতমের ছদ্মবেশে এসে উপস্থিত হলেন অহল্যার সমীপে। অহল্যা গৌতমরূপী ইন্দ্রকে চিনতে পেরেও দেহমিলনে সম্মত হলেন। সঙ্গম শেষে অহল্যা ও ইন্দ্র উভয়েই পরস্পরকে জানালেন, তাঁরা পরম তৃপ্ত। ঋষি গৌতমের কোপানল থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত পালালেন ইন্দ্র। যদিও তপোবলে সমস্ত ঘটনাই জ্ঞাত হলেন গৌতম। তাঁর অভিশাপ বর্ষিত হল অহল্যার ওপর। সনাতন ভারতে যে পঞ্চকন্যার নাম স্মরণমাত্র মহাপাপ নাশ হয় বলে কথিত; তাঁদের প্রত্যেকেই একাধিক পুরুষের সংস্পর্শে এসেছিলেন। কিন্তু তার অর্থ এটা দাঁড়ায় না যে তাঁরা চরিত্রহীন ছিলেন। বরং বলা যায় এ মানবমনের বিচিত্র অভিব্যক্তির দৃষ্টান্ত।

মানুষ মাত্রেই বৈচিত্র পছন্দ করে। একই সঙ্গীর সঙ্গে যৌনজীবন কাটিয়ে দেওয়া কোনও মানুষের অন্তর্গত প্রয়োজন নয়, এটা সামাজিক ও সংস্কৃতিগত ভাবে তার ওপর আরোপিত শৃঙ্খলা। তাই বার্নার্ড শ’র নায়িকা যখন তীব্র আবেগে বলে ওঠে, সে যদি দু’টি পুরুষকে ভালবাসে তা হলে কেন দু’জনকেই বিয়ে করতে পারবে না, তখন তা কোনও অস্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার চিহ্ন নয়, বরং ব্যক্তির চিত্তস্ফুরণের স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিব্যক্তি। আইন ও সমাজ নিশ্চয়ই তা স্বীকার করে না, তথাপি এ ধরনের সমস্যা থেকে উদ্ভূত প্রশ্নকে নস্যাৎও করা যায় না।

এর অর্থ এই নয় যে, নারীমুক্তির উপায় কেবল পরকীয়া। তবে, নারীর ব্যক্তিসত্তা ও অস্তিত্বের নিয়ন্ত্রণকারী সে নিজে; এমন চেতনা তাকে মর্যাদামণ্ডিত করে। পরকীয়া প্রেম কোনও ক্ষেত্রে জীবনে এনে দেয় এক অন্য মাত্রা। নতুন তাৎপর্য।

অবশ্যই পরকীয়ার পরিণতি মর্মান্তিকও হয়। কার্ল মার্ক্সের কনিষ্ঠা কন্যা ইলিনর ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। যখন তিনি জানতে পারেন তাঁর সঙ্গী পুরুষটির গোপনে অন্য বিবাহের কথা, তখন মাত্র ৪৩ বছর বয়সে, ইলিনর আত্মহত্যা করেন।

তা হলে আমরা কোন দৃষ্টিতে বিচার করব পরকীয়াকে? বলা যায়, সাধারণ ভালমন্দের দৃষ্টিতে পরকীয়াকে বিচার করা সম্ভব নয়। আর চলমান সমাজ কখনও সম্পূর্ণ সৎ বা সম্পূর্ণ অসৎ হতে পারে না। সর্বোপরি মানবমনের অনুভূতি ও অভিব্যক্তির হদিস পাওয়া অসম্ভব।

তাই প্রয়োজন পরিণত ও উদার সাবালক দৃষ্টিভঙ্গি, যা কিনা অনুভব করতে পারে সম্পর্কের দ্বান্দ্বিকতাকে, মানবমনের বিচিত্র অনুভূতিকে, বহুমাত্রিক বোধের বৈচিত্রকে।

শুভ্রজিৎ রায়

টেম্পল স্ট্রিট, জলপাইগুড়ি

 

ফরাসিরাও

যাক! ‘হাম কিসিসে কম নেহি’— ফরাসিরাও জানিয়ে দিলেন। নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। রাস্তায় টেবিল-চেয়ার ভাঙা, জনতার মধ্যে জ্বলন্ত আতশবাজি ছুড়ে দেওয়া, পুলিশকে লক্ষ্য করে আসবাব ছোড়া, পায়ের চাপে ২৫ জনকে হাসপাতালে পাঠানো (‘উৎসবের ফ্রান্সে...’, ১২-৭)। শাবাশ! হিন্দি-ফরাসি ভাই ভাই! অর্থনীতি (তাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় ৪২,০০০ ডলার, আমাদের ২,০০০), শিক্ষা (ফ্রান্সে সাক্ষরতার হার ৯৯%, ভারতে ৭৪%), বা মানবসম্পদ উন্নয়নের মাপকাঠিতে (ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের হিসাবে তাঁরা ২৬ নম্বরে, আমরা ১০৩-এ) পার্থক্য থাকলেও, ‘স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব’-এ গভীর বিশ্বাস— অবাধ উচ্ছৃঙ্খলতায় আমরা বহু বার প্রমাণ করেছি; এ বার তাঁরাও করলেন।

দেবাশিস মিত্র

নেতাজিনগর, কলকাতা

 

কোন পরিচয়

‘নষ্ট নীড়/১’ (১৩-৭) সংবাদটির প্রেক্ষিতে সাধুবাদ জানাই আনন্দবাজার পত্রিকাকে, একটি জ্বলন্ত সমস্যাকে জনসমক্ষে নিয়ে আসার জন্য। পড়তে পড়তে আমার মতো অনেক যুবকযুবতীর মনে তাঁদের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভেসে উঠবে, সন্দেহ নেই। ২২ বছর বয়সে হাইস্কুলে শিক্ষকতার পেশা সূত্রে যখন পানিপারুলে (পূর্ব মেদিনীপুর) ভাড়া ঘরের সন্ধান করি, প্রায় চার পাঁচটি বাড়ি থেকে প্রত্যাখ্যাত হই শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতার জন্য। বাড়ির মালিকদের জানিয়েছিলাম আমার শিক্ষকতা পেশার কথা, এক জন প্রাক্তন শিক্ষক জানালেন বাড়িতে ঠাকুর আছেন, পারবেন না আমাকে ভাড়া দিতে। ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল, যিনি প্রত্যাখ্যান করছেন তিনিও শিক্ষক, যাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনিও শিক্ষক। এক রাশ অপমান নিয়ে ফিরেছিলাম সে দিন। বছর পাঁচেক আগে কর্মসূত্রে খাকুর্দায় (পশ্চিম মেদিনীপুর) আসি, অভিজ্ঞতার বদল হয় না। সে দিনের সেই যুবক আজ অনেকটাই পরিণত, নিজের বাড়ি তৈরি করার চেষ্টা করছি, কখনও মেদিনীপুর বা কখনও কাঁথিতে চেষ্টা করছি এক টুকরো পছন্দসই জমি কেনার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে। আশার আলো, এখনও কিছু সত্যিকারের শিক্ষিত ব্যক্তি আছেন, যাঁরা বাড়ি ভাড়া বা জমি বিক্রির ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেন না— যা আমাদের দেশের গৌরবময় সম্প্রীতির কথা মনে করিয়ে দেয়।

মহম্মদ মগদুম

কালিন্দি, পূর্ব মেদিনীপুর

 

ব্যঙ্গ কেন

চতুর্দিকে তারুণ্যের জয়গান। কাগজে পড়লাম, বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে ফরাসি সমর্থকেরা লুকা মদ্রিচকে দেখে বিদ্রুপ করছিলেন বুড়ো বলে। আবার ধোনিকেও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ওয়ান-ডে’তে ধীর গতিতে রান করার জন্য শুনতে হয়েছে ভারতীয় দর্শকদের বিদ্রুপ। তারুণ্য চমৎকার ব্যাপার, কিন্তু তার দিগ্বিজয়ের জন্য কি অ-তরুণকে ব্যঙ্গ করা আবশ্যিক?

শ্রীপতি রাহা

কলকাতা-৬৮

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ই-মেলে পাঠানো হলেও।