দেবজ্যোতি মিশ্রের ‘সুরের অন্তর্ঘাত’ (২৪-৫) শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে মনে পড়ে কালোত্তীর্ণ গীতিকার মোহিনী চৌধুরীর কথাও। তিনি অনেকটাই কাজী নজরুল ইসলামের দ্রোহচেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেছিলেন গণজাগরণ ও মানবমুক্তির গান। অনাহার, ক্ষুধা, আকাল যেমন এসেছে তাঁর গানে, তেমনই এসেছে দেশবন্দনার আহ্বান। অপরূপ বাণীবন্ধন ও সুরস্মৃতিতে চিরজাগ্রত তাঁর ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হল বলিদান’। বেদনার সঙ্গে উদ্দীপনা, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এ-গানে সৃষ্টি হয়েছে অনন্য প্রেরণার সুর। বাঙালির হৃদয়-জাগানো, অন্তর-কাঁপানো কথা ও সুরের জাদুতেই গানটি কালোত্তীর্ণ।
জানা যায়, তাঁর ‘পৃথিবী আমারে চায়/ রেখো না বেঁধে আমায়’ গানটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাদের মনোবল অটুট রাখতে বিভিন্ন ফ্রন্টে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অংশ হিসাবে ব্যবহৃত হত। মোহিনী চৌধুরীর কথা ও কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘আজ যত দূরে চাই/ আছে শুধু এক ক্ষুধিত জনতা/ প্রেম নাই প্রিয়া নাই’ গানটিও জনমানসে গভীর আলোড়ন তুলেছিল। মোহিনী-কমল-সত্য চৌধুরীর সেই জাদু প্রকাশ পেয়েছিল ‘জেগে আছি একা, জেগে আছি কারাগারে’ গানটিতেও। পরাধীন দেশে মুক্তিকামী মানুষের মনে ঝড় তুলেছিল এ-গান। আসলে মোহিনী চৌধুরীর গানে প্রেম ও প্রিয়ার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকে যুগযন্ত্রণা এবং মুক্তির প্রত্যাশা।
গণচেতনার গান লিখেছিলেন শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও। নিপীড়িত মানুষের প্রতিবাদ জনমানসে প্রবল উদ্দীপনা সঞ্চার করেছিল তাঁর ‘বিস্তীর্ণ দু’পারের অসংখ্য মানুষের...’ গানটি। এটি ভূপেন হাজরিকার অসমিয়া কালজয়ী গানের বাংলা রূপান্তর। সলিল চৌধুরী ও হেমাঙ্গ বিশ্বাসের পাশাপাশি বিনয় রায় এবং জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রও গানের মধ্য দিয়ে শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা তুলে ধরেছিলেন। স্থবির সভ্যতার শরীরে প্রতিরোধের পদশব্দ শুনেছিলেন মোহিনী চৌধুরী ও শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়— তাই তাঁদের গানেও সেই প্রত্যয়ের সুরই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
সুদেব মাল, খরসরাই, হুগলি
সুরবিপ্লব
দেবজ্যোতি মিশ্রর প্রবন্ধ ‘সুরের অন্তর্ঘাত’ পড়লাম। লেখকের চেতনার অন্তরালে সর্বক্ষণ যেন উজ্জ্বল উপস্থিতি কাজী নজরুল ইসলামের। বিপ্লব সংগঠনে পতাকা, স্লোগান কিংবা মিছিলের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার না করেও তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন বাংলা গানের এক আশ্চর্য জাদুময় অভ্যুত্থানের কথা, যার পুরোভাগে ছিলেন নজরুল।
নজরুলের শিকলভাঙার সেই প্রয়াসের উত্তরসূরি হিসাবে সুরের জগতের অগ্রণী পথিক সলিল চৌধুরীকে লেখক তুলে এনেছেন অত্যন্ত স্বাভাবিক দক্ষতায়। লেখকের সঙ্গে সুর মিলিয়েই বলতে ইচ্ছে করে, সঙ্গীত আসলে নদীর মতো— এক জল অন্য জলে মিশে যায়, এক স্রোত অন্য স্রোতকে ধারণ করে। সেই ধারাতেই দীক্ষিত নজরুল তাঁর দেশাত্মবোধক গানে হিন্দু-মুসলমানের উদ্দেশে উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন— ‘...যেমন পানি, জলে রে ভাই শুধু নামের ভেদ।’
বরুণ কর, ব্যান্ডেল, হুগলি
হাতছাড়া
১৯৫০ সালের চতুর্থ ফুটবল বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার সুযোগ যদি হাতছাড়া না করত ভারতের ফুটবল নিয়ামক সংস্থা, তা হলে কি আজও ট্রেন-বাসে, পথে-ঘাটে, স্কুল-কলেজে, অফিস-ক্যান্টিনে এই দীর্ঘশ্বাস শোনা যেত— ১৫০ কোটির দেশে এগারো জন ফুটবলারও কি পাওয়া যায় না, যাঁরা বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবল মঞ্চে গর্বের সঙ্গে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন? উত্তরটা সত্যিই কঠিন— কঠিনতম।
১৯৩০ সালে শুরু হয়েছিল ফুটবল বিশ্বকাপ। পর পর তিনটি আসরের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় স্তব্ধ হয়ে যায় বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনও। যুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়নি। যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে ১৯৫০ সালে ব্রাজ়িলে পুনরায় বসে বিশ্বকাপের আসর। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপের একাধিক দেশ আর্থিক সঙ্কটের কারণে দল পাঠাতে অপারগতার কথা জানায়। আবার রাজনৈতিক টানাপড়েনের জেরে প্রতিবেশী ব্রাজ়িলে দল পাঠায়নি আর্জেন্টিনা। অন্য দিকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে জাপান এবং সদ্য বিভক্ত জার্মানির কোনও অংশই ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে যোগ দিতে পারেনি।
এশিয়ার বাছাই পর্বে ছিল ভারত, বর্মা (অধুনা মায়ানমার), ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিনস। কিন্তু অন্য তিনটি দেশ নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় ভারত কোনও ম্যাচ না খেলেই বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। ভারতীয় দলের সম্ভাব্য স্কোয়াডও ঘোষণা হয়। অধিনায়ক হিসাবে নির্বাচিত হন শৈলেন মান্না। বিশ্বকাপে ভারতের অংশগ্রহণের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সফর আর বাস্তবায়িত হয়নি।
কেন ভারত বিশ্বকাপে গেল না, তা নিয়ে বহু বছর ধরে অসংখ্য গল্প ও মিথ প্রচলিত ছিল। সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাখ্যা— খালি পায়ে খেলতে অভ্যস্ত ভারতীয় ফুটবলারদের বুট পরে খেলতে বাধ্য করায় নাকি ভারত বিশ্বকাপে যায়নি। কিন্তু পরবর্তী গবেষণা এবং শৈলেন মান্না-সহ একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বিষয়টি এত সরল ছিল না। আর্থিক সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার খরচ, বিশ্বকাপের তুলনায় অলিম্পিককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং সর্বোপরি বিশ্বকাপের মর্যাদা সম্পর্কে তৎকালীন ভারতীয় ফুটবল প্রশাসনের সীমিত ধারণা— এই সব কারণ মিলিয়েই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
শৈলেন মান্না পরবর্তী কালে স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, তখন তাঁদের কাছে অলিম্পিকই ছিল সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতা; বিশ্বকাপের গুরুত্ব সম্পর্কে ফুটবলারদের যেমন স্পষ্ট ধারণা ছিল না, তেমনই ছিল না কর্তাদেরও। ফলে ইতিহাসের এক বিরল সুযোগ কার্যত অবহেলাতেই হাতছাড়া হয়।
ভারতের শেষ মুহূর্তের সরে দাঁড়ানোয় ফিফাও বিড়ম্বনায় পড়ে। সে বার নির্ধারিত ১৬টি দলের বদলে মাত্র ১৩টি দলকে নিয়েই শুরু করতে হয় ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের মূলপর্ব। ইতিহাসবিদদের অনেকেই এই ঘটনাকে ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে বড় ‘হারানো সুযোগ’-গুলির একটি বলে মনে করেন। সেই হারানো সুযোগের ইতিহাস আজও তুলনামূলক ভাবে অনালোচিত। অথচ সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারলে, হয়তো ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ অন্য রকমও হতে পারত।
শুভাশিস ঘোষ, বজবজ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
বিশুদ্ধ জল
কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এখনও বিশুদ্ধ ও স্বাস্থ্যসম্মত পানীয় জলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ বাধ্য হয়ে বাজারজাত প্লাস্টিকের বোতল বা জারের জলের উপর নির্ভরশীল। এতে এক দিকে যেমন তাঁদের অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা বহন করতে হচ্ছে, অন্য দিকে প্লাস্টিকের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে পরিবেশ দূষণও বাড়ছে।
রাজ্যের বহু এলাকায় সরকারি পানীয় জলের ট্যাঙ্ক ও সরবরাহ-ব্যবস্থার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। ট্যাঙ্কগুলি নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না, বহু কল দীর্ঘদিন বিকল এবং পানীয় জলের উৎসগুলিও অপরিচ্ছন্ন। আরও উদ্বেগের বিষয়, অনেক জায়গায় পানীয় জলের কল খোলা নর্দমার পাশেই রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
অতএব, প্রশাসনের কাছে আবেদন, সকল নাগরিকের জন্য ২৪ ঘণ্টা বিশুদ্ধ ও স্বাস্থ্যসম্মত পানীয় জলের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি জলাধার ও ট্যাঙ্কগুলির নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বিকল কলগুলির দ্রুত মেরামত এবং পানীয় জলের উৎসগুলির চার পাশে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করুন।
অয়ন সরকার, কলকাতা-৫৭
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে