সম্পাদক সমীপেষু: ব্যবচ্ছেদের পথিকৃৎ


জয়ন্ত ভট্টাচার্যের (‘প্রথম ব্যবচ্ছেদ’, সম্পাদক সমীপেষু, ৯-৫) কথা অনুযায়ী আধুনিক ভারতে প্রথম শবব্যবচ্ছেদকারী মধুসূদন গুপ্ত নন, মেডিক্যাল কলেজের প্রথম চার ছাত্রের এক জন। এই নিয়ে যে বিতর্ক, তা আসলে তুলেছিলেন ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার সম্পাদিত ‘দ্য ক্যালকাটা জার্নাল অব মেডিসিন’-এর নিবন্ধকার ১৮৭৩ সালে। জয়ন্তবাবু সেই পুরনো বিতর্কটিকেই প্রায় হুবহু তুলে ধরেছেন চিঠিতে। কবেই সেই বিতর্ক শেষ হয়ে গিয়েছে; তবুও এই বিষয়ের উপর আমার লেখা পুস্তকের নাম উল্লেখ করেছেন বলে আমাকে কিছু লিখতে হচ্ছে।

১৮৪৯ সালের ১৫ জুন। মেডিক্যাল কলেজে তৎকালীন কাউন্সিল অব এডুকেশনের সভাপতি ড্রিংকওয়াটার বেথুন একটি অসাধারণ বক্তৃতা দেন, যা সবিস্তার নথিভুক্ত রয়েছে ১৮৫১ সালের জেনারেল রিপোর্ট অন পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের ১২২ থেকে ১২৬ পৃষ্ঠায়। তাতেই তিনি প্রথম শবব্যবচ্ছেদকারী হিসেবে মধুসূদন গুপ্তর নাম সম্মানসহকারে উল্লেখ করেন এবং বলেন ব্যবচ্ছেদের দিনটি ছিল ১০ জানুয়ারি ১৮৩৬।

তিনি বলেন, আগের বছর (১৮৪৮) মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক ডা. হেনরি হ্যারি গুডিভের (যিনি ওই ১০ জানুয়ারি প্রথম শবব্যবচ্ছেদের সময় উপস্থিত ছিলেন) দেওয়া এক বক্তৃতা থেকে এই তথ্যগুলি তিনি পেয়েছেন।
বেথুন সাহেবের দেওয়া এই বক্তব্যকে প্রথম শবব্যবচ্ছেদকারী হিসাবে মধুসূদন-বিরোধী গবেষকরা মানতে চাইছেন না। কারণ অজানা। মনে রাখতে হবে, বেথুন সাহেবের এই স্মরণীয় বক্তৃতাটি অবশ্যই চিকিৎসাশিক্ষা-বিজ্ঞান-ইতিহাসের একটি জোরালো উপকরণ।

সে দিন মেডিক্যাল কলেজের অনুষ্ঠানে যখন বেথুন সাহেব মধুসূদনকে প্রথম শবব্যবচ্ছেদকারী আখ্যা দিয়ে মাদাম বেলনস অঙ্কিত মধুসূদন গুপ্তের (সঙ্গের ছবিতে) একটি তৈলচিত্র কলেজ কর্তৃপক্ষের হাতে উপহার হিসেবে তুলে দিয়ে বলছেন, দেখুন আপনারা, ছবিটির ফ্রেমে আমি লিখে দিয়েছি 'The first Hindu Anatomist of British India', এবং 'The 10th day of January' ইত্যাদি, তখন কিন্তু উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা কেউই প্রতিবাদ করেননি।

আর ছাত্ররা যদি প্রথম শবব্যবচ্ছেদ করতেন, তা হলে খামোকা মধুসূদনের ওই প্রমাণ সাইজের তৈলচিত্রই বা অঙ্কন করা হল কেন? পরিবর্তে চার ছাত্রের যিনি প্রথম শবব্যবচ্ছেদ করেছিলেন (এ ক্ষেত্রে ছাত্র রাজকৃষ্ণ দে), তাঁরই তৈলচিত্র অঙ্কিত হতে পারত।

তাই বেথুন সাহেবকে উপেক্ষা করার অর্থ হল, যিনি প্রথম শবব্যবচ্ছেদের দিন উপস্থিত থেকে মধুসূদনকে ব্যবচ্ছেদে উৎসাহিত করেছিলেন, সেই ডা. গুডিভকেই অস্বীকার করা। চিঠিতে ১৮৪৮ সালের ডা. গুডিভের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ১৮৪৯ সালে বেথুন সাহেবের বক্তব্যগুলিকে অনৈতিহাসিক বলা হয়েছে। বেশ, এ বার দেখুন, এরও তিন বছর আগে, ১৮৪৬ সালে মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন সচিব/অধ্যক্ষ ডা. ফ্রেডরিক জন মোয়াট কী বলেছিলেন মধুসূদন গুপ্ত সম্পর্কে (১৮৪৬ সালে দ্য ক্যালকাটা রিভিউ পত্রিকার পঞ্চম খণ্ডে প্রকাশিত): "...and the first Hindu of high caste who ever wielded the scalpel, and thus at one stroke severed the deepest rooted prejudices of his race and religion, is at the present moment a distinguished ornament of the Institution, with the records of which his name must for ever be associated, as the forerunner on the career of science and honour. I allude to pandit Madusuden Gupta, the native demonstrator of Anatomy in the Medical College...”

একেবারে পরিষ্কার, ডা. মোয়াট মধুসূদন গুপ্তকেই প্রথম হিন্দু শবব্যবচ্ছেদকারী বলেছেন এবং এও বলেছেন তিনিই এ বিষয়ে পথিকৃৎ। অন্য দিকে, মেডিক্যাল কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ডা. ব্রামলি সাহেব ১৮৩৬ সালের রিপোর্টে লিখেছেন, ২৮ অক্টোবর, ১৮৩৬ চার জন ছাত্র শবব্যবচ্ছেদ করলেন। এই ঘটনাকে তিনি মেডিক্যাল কলেজের ইতিহাসে এক 'eventful era' বলেছেন, কিন্তু এক বারের জন্যও বলেননি, এটিই প্রথম শবব্যবচ্ছেদের ঘটনা।

আসলে দু’দিনই শবব্যবচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছিল। প্রথম দিন শুধুমাত্র মধুসূদন গুপ্ত শবব্যবচ্ছেদ করেছিলেন, ছাত্ররা দেখেছিলেন (১০ জানুয়ারি, ১৮৩৬)। আর পরে ২৮ অক্টোবর, ১৮৩৬ তারিখে চার ছাত্র শবব্যবচ্ছেদ করেছিলেন: রাজকৃষ্ণ দে, উমাচরণ শেঠ, দ্বারকানাথ গুপ্ত এবং নবীনচন্দ্র মিত্র। এটাই তো স্বাভাবিক, আগে শিক্ষকমশাই (মধুসূদন গুপ্ত) শবব্যবচ্ছেদ করে ছাত্রদের ভয়ভীতি ভাঙাবেন, উৎসাহ দেবেন, তার পর ছাত্ররা এমন শবব্যবচ্ছেদ করবার সাহস পাবেন। ঐতিহাসিক ভাবে তাই ছাত্রদের মধ্যে রাজকৃষ্ণ দে-ই আধুনিক ভারতে প্রথম শবব্যবচ্ছেদকারী ছাত্র।

আমার লেখা এই বিষয়ে পুস্তকটির উল্লেখ করে জয়ন্তবাবু লিখেছেন, প্রথম শবব্যবচ্ছেদকারী হিসেবে মধুসূদনের পক্ষে সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ এই বইয়ে নেই। যা লিখলাম এই চিঠিতে, সবই আমার বইয়ে রয়েছে। আরও প্রমাণ বইতে আছে, যা এই স্বল্পপরিসর চিঠিতে দেওয়া সম্ভব নয় এবং সবগুলিই সুনির্দিষ্ট, অকাট্য এবং ইতিহাসসিদ্ধ।

ডা. শঙ্করকুমার নাথ  কলকাতা-১৪

 

রেশম সমস্যা

রেশম বা সিল্ক ভারত তথা এই বাংলার এক অতি প্রাচীন কুটিরশিল্প। এই কুটিরশিল্পে রেশম পলু পালন, সুতো নিষ্কাশন, সুতো কাটা এবং রেশম বস্ত্র তৈরি— এই সবই করেন চাষি ও তাঁতিরা। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, মালদহ, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, নদিয়া ও দার্জিলিং জেলার কিছু অংশে এখনও প্রায় এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার চাষি এই রেশম শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এখন এই পলু চাষিরা এক দুরূহ সমস্যার সম্মুখীন।

কয়েক বছর যাবৎ পলু পালনের ফাল্গুনী বন্দে ও বৈশাখী বন্দে (পলু চাষের ঋতুকে ‘বন্দ’ বলা হয় বাংলায়) এক ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে পলু। পলু তুঁতপাতা খাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে এবং ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে ফুলে গিয়ে মারা যাচ্ছে। অনেক চাষি এই কারণে অত্যন্ত দুরবস্থার সম্মুখীন। পশ্চিমবঙ্গে এখন উন্নত প্রজাতির (বাইভলটাইন) পলু চাষ হয়ে থাকে। এতে ১০০ পলুর ডিমে প্রায় ৫০-৫৫ কেজি রেশম গুটি পাওয়া যায়। অনেক চাষিই সরকারি অফিস থেকে ডিম নিয়ে এসে পলু পালন করে রেশম গুটি তৈরি করেন এবং তা বাজারে বিক্রি করে যা উপার্জন করেন, তা তাঁর সারা বছরের রোজগার।

এই সমস্যা নিয়ে রাজ্য সরকারের দফতর এবং কেন্দ্রীয় রেশম গবেষণা দফতরে যাওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন আলোচনায় যা জানা গিয়েছে, তা হল, সমস্যা অনেক গভীরে।

সকলেই জানেন, পলুর একমাত্র খাদ্য তুঁতপাতা। এর জন্য পলু পালনকারী চাষিরা তুঁত বাগানও তৈরি করেন। এই তুঁত বাগান বা খেতগুলি হয় অন্যান্য সব্জি খেতের পাশেই। কয়েক বছর যাবৎ বেগুন ও ঢেঁড়শ চাষে এক ধরনের অত্যন্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগ করা হচ্ছে। এই প্রয়োগ মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম অঞ্চলে বেশি। বেগুনে ওই রাসায়নিকটি স্প্রে করা হয় এবং এতে বেগুন যেমন পোকার থেকে রেহাই পায়, তেমনই দ্রুত বৃদ্ধিও পায়। এই কড়া রাসায়নিকটি তুঁতপাতাকেও সংক্রামিত করছে। চাষিরা সরাসরি এ তুঁতপাতা পলুকে খাওয়ানোর ফলে পলু তা সহ্য করতে পারছে না এবং পলু মারা যাচ্ছে।

বেগুনের এই বিষ দোকানে ছোট ছোট শিশিতে বিক্রি হয়। এতে কোনও লেবেল নেই। সার-বীজ, সারের দোকানে আকছার পাওয়া যাচ্ছে। বিষ-আক্রান্ত তুঁতপাতা খাওয়ানোর ফলে এই পলুর মারা যাওয়া প্রাথমিক ভাবে চিহ্নিত করেছেন বহরমপুরের কেন্দ্রীয় রেশম অফিস। বিজ্ঞানীরা নানান গবেষণাও চালাচ্ছেন। রাজ্য সরকারের সেরিকালচার বিভাগও উদ্বিগ্ন। কিন্তু সুরাহা এখনও হয়নি। সব্জি চাষিদের এই বিষ প্রয়োগে নিষেধ করলেও তাঁরা মানছেন না।

আদিত্য মণ্ডল  কান্দি, মুর্শিদাবাদ

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়