সম্পাদক সমীপেষু: তাঁর জন্য মন খারাপ

রজার ফেডেরার

•বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে মনটা খুব খারাপ হয়ে অাছে। কিন্তু এই ফুটবলের হইহইয়ের মধ্যে নিঃশব্দে উইম্বলডন থেকে বিদায় নিয়েছেন রজার ফেডেরার, সেটা বোধ হয় সব চেয়ে মন খারাপের ব্যাপার, যা বিশ্বকাপের উত্তেজনাটা সরে গেলে, ফেডেরার-ভক্তদের মধ্যে জাঁকিয়ে বসবে। মেসি রোনাল্ডো নেমার সফল হননি বলে যত জনের মন খারাপ, তত জনেরই মন খারাপ হওয়া উচিত এই টেনিসের কিংবদন্তি খেলোয়াড়টির অপ্রত্যাশিত বিদায়ে। তিনি যত অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েন, তত আমরা বুঝতে পারি, প্রতিভা ও অধ্যবসায়ের সমন্বয়ে মানুষ কোন কীর্তির চূড়ায় ওঠার ক্ষমতা রাখে! তাঁর মধ্যে অসম্ভব প্রতিজ্ঞা ও বিনম্র ভদ্রতার এমন একটা যুগলবন্দি আছে, সেটাও কর্কশ উগ্র পৃথিবীতে একটা ব্যতিক্রমী ও অনুসরণীয় উদাহরণ হিসেবে জ্বলজ্বল করে। খেলা যে সমাজের পক্ষে খুব ভাল, তার কারণ, এতে মানুষ অনেক দুঃখকষ্ট ভুলে থাকতে পারে, নক্ষত্রদের দিকে তাকিয়ে নিজেকে উন্নত করার চেষ্টায় প্রাণিত হতে পারে। আবার, খেলা শেখায়: একেবারে অচেনা মানুষের পরাজয়ে আন্তরিক দুঃখিত হতে!

সাত্যকি ধর

কলকাতা-৬৪

 

পাট চাষ

•আগামী কিছু দিনের মধ্যে বাজারে নতুন পাটের আমদানি শুরু হবে। সম্প্রতি কেন্দ্রের মোদী সরকার ১৪টি খরিফ ফসলের উপর উৎপাদন খরচের দেড় গুণ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করে আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে কৃষকবন্ধু ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছে। বর্ধিত সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করে কৃষককে তাঁর ফসলের অভাবী বিক্রিতে বাধ্য হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে, কেন্দ্র ও রাজ্যকে বেশি বেশি করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ফসল ক্রয় করতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কেন্দ্র ক্রমশ ফসল কেনা কমাচ্ছে। পাট চাষিদের ক্ষেত্রে সরাসরি পাট কেনার জন্য ১৯৭১ সালে জুট কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (জেসিআই) স্থাপিত হয়েছিল, যা কৃষকদের কাছ থেকে লাভজনক মূল্যে পাট কিনে বাজারদরকে স্থিতিশীল রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিত। কিন্তু বিগত এক দশক যাবৎ পরিকল্পিত ভাবে ব্যাপক পরিকাঠামো ও কর্মী সঙ্কোচন ঘটিয়ে জেসিআই-কে পঙ্গু করে তোলা হল। বর্তমানে সারা দেশে গুটিকয়েক ক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে সমগ্র উৎপাদনের নামমাত্র পরিমাণ (মাত্র ১ শতাংশের মধ্যে) পাট কেনার ফলে জেসিআই-এর মূল উদ্দেশ্য পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের পয়সার অপব্যয় করে সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে বছরের পর বছর টিকিয়ে রাখা হবে এই ধরনের ব্যর্থ সংস্থাগুলিকে। না হবে এগুলির পুনরুজ্জীবন, না এগুলি বন্ধ হবে। পাট চাষির কল্যাণে কেন্দ্র সরকারের বহু সংস্থা কাজ করছে। উন্নত মানের বীজ, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল— বহু কিছু চাষিকে সরবরাহ করা সত্ত্বেও কেন চাষি ক্রমশ পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন, তার কারণ জাতীয় পাট পর্ষদকে ভাবতে হবে। এই রাজ্যের অর্থনীতিতে পাট ও পাটচাষির যে গুরুত্ব, তার পরিপ্রেক্ষিতে জুট কর্পোরেশনের প্রকৃত কার্যকর ভূমিকা পালন করা একান্ত আবশ্যক, সেটা রাজ্য সরকার তথা রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলির ভাবনায় আছে বলে মনে হয় না।

দেবকী রঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়

উত্তরপাড়া, হুগলি

 

পেনশনের হাল

•‘পেনশনের সংস্কারে কী পদক্ষেপ’ (৯-৭) শীর্ষক খবরে প্রকাশ, কেন্দ্রের পঞ্চদশ অর্থ কমিশন পেনশনের সংস্কারে পদক্ষেপ করতে কলকাতা সফরে আসছে। রাজ্য অর্থ দফতরের একাংশের ধারণা, পঞ্চদশ অর্থ কমিশন হয়তো এক প্রকার বাধ্যতামূলক ভাবেই সরকারি কর্মীদের পেনশনের দায় সরকারের ঘাড়ে রাখতে দেবে না। এ ব্যাপারে বলা যায়, পেনশন কখনও সরকারের ‘দায়’-এর মধ্যে পড়ে না। তা সরকারের পক্ষে দেশের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষার ‘দায়িত্ব’-এর মধ্যে পড়ে। সরকারি চাকরিতে পেনশন ব্যবস্থা এত কাল বজায় ছিল। এবং সেই সামাজিক নিরাপত্তার দিকে তাকিয়ে মানুষজনও এত দিন সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে এসেছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই ওই ব্যবস্থার বিলোপ সাধনে উঠে-পড়ে লেগে তা বাস্তবায়িত করতে সমর্থ হয়েছে। অর্থাৎ সরকার ‘ন্যাশনাল পেনশন সিস্টেম’ চালু করেছে। ওই ব্যবস্থায় সরকারি কর্মীদের বেতন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কেটে নিয়ে তা ‘পেনশন ফান্ড’-এ জমা রাখা হচ্ছে। রীতি অনুযায়ী, জমা অর্থ শেয়ার বাজার ও সরকারি বন্ডে ভাগাভাগি করে খাটানোর কথা। শেয়ার বাজারের ফাটকাবাজিতে কর্মচারীদের কষ্টার্জিত অর্থের বিনিয়োগ এতটাই বিপজ্জনক, শেয়ারের মূল্য ওঠা-নামার ফলে কর্মীদের সঠিক পরিমাণ পেনশনের অর্থ প্রদানও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তখন হতভাগ্য ও অভাবগ্রস্ত পেনশনারদের রাস্তায় নামতে হয়। অতি সাম্প্রতিক কালে ইউরোপের গ্রিস-সহ বেশ কয়েকটি দেশে সেই দৃশ্য চোখেও পড়েছে। অতএব, কর্মচারী স্বার্থবিরোধী এই কাজ মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয়।

কেন্দ্রীয় অর্থ কমিশনের জ্ঞাতব্য বিষয়গুলির মধ্যে, পেনশন দিতে সরকারের বছরে কত টাকা ‘গলে যাচ্ছে’ বলে যে উক্তি প্রকাশ পেয়েছে, তা থেকে মনে হয় যেন, সরকারের ভাঁড়ার থেকে কত টাকা পেনশন বাবদ অপচয় হয়ে যাচ্ছে। আদতে কিন্তু কর্মীদের বেতন থেকে কেটে রাখা অর্থ থেকেই সরকার পেনশনের টাকা দিয়ে থাকে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, সরকারি কর্মীদের এই পেনশন তুলে দেওয়ার ব্যাপারে কেন্দ্রের শাসক দল— যারাই যখন ক্ষমতায় এসেছে, তারাই এটাকে পাশ করাতে সংসদে বিল এনেছে। কিন্তু বিরোধী দলের সমবেত বাধা দানের ফলে তা ঝুলে থেকেছে। বলতে দ্বিধা নেই, সরকারি কোষাগার থেকে পেনশন দেওয়ার পক্ষে যে রক্ষাকবচ আছে তা সাংবিধানিক, আইনমাফিক ও আভিধানিক। ভারতের সংবিধানে ৩৬৬(১৭) ধারায় বলা আছে, "pension means a pension, whether contributory or not, of any kind whether payable to or in respect of any person and includes retired pay as payable."

এ ব্যাপারে দেশের শীর্ষ আদালতের মন্তব্য হল, ‘‘পেনশন দয়ার দান নয়, অর্জিত অধিকার, বিলম্বিত বেতন। এবং আইন দ্বারা বলবৎযোগ্য।’’ আবার এর আভিধানিক অর্থ হল, "An allowance to one in consideration of his or her past service etc." একটি আনুষঙ্গিক খবরও দেওয়া যায়: জাপানে ১০০-র বেশি বয়সের ২৩০০০ মানুষ বেশ কিছু দিন ধরে পেনশন পেয়ে গিয়েছেন। তাতে কি জাপানের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল? সরকারি কর্মীদের এই পেনশন দেওয়ার ব্যাপারে দেশের সরকারের যখন এত অনীহা ও সরকারি কর্মীদের প্রতি এত জাতক্রোধ, তখন বিশ্বের অন্য অনেক দেশ আবার পেনশন বৃদ্ধির ব্যাপারে অতীব আগ্রহী। কারণ তারা জানে, পেনশন দয়ার দান নয়, সুষম সামাজিক নিরাপত্তার এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

সাম্প্রতিক কালে মেক্সিকোর ‘প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট’ লোপেজ় ওব্রাদর, ঘোষণা করেছেন, তিনি তাঁর দেশের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে এক দিকে যেমন পেনশন প্রাপকদের পেনশনের অর্থ ও শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি দ্বিগুণ করবেন, অন্য দিকে, রাজনীতিকদের বেতন, রাষ্ট্রপতির বেতন ও তাঁর অবসরকালীন পেনশন প্রদানের ব্যাপারে কৃচ্ছ্রসাধন করবেন।

এ ঘোষণা বিশ্বের অন্যান্য দেশের লোভী ও দুর্নীতিগ্রস্ত় রাজনীতিকদের আঁতে ঘা দেবে, সন্দেহ নেই। প্রকৃত প্রস্তাবে, দেশের কোটি কোটি মানুষের সামাজিক নিরাপত্তার দায়িত্ব বর্তায় সে দেশের সরকারের উপরেই। এবং পেনশন দেওয়ার নীতি তারই একটা উৎকৃষ্ট নিদর্শন। প্রয়োজনবোধে সরকারি ক্ষেত্রে সরকারের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পেনশন ব্যবস্থা আবার চালু করা ও দেশের অন্যান্য অসংগঠিত ক্ষেত্রে তা প্রবর্তন করা একান্ত জরুরি।

কল্যাণ কুমার চৌধুরি

কলকাতা-১০৭

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট,
কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ই-মেলে পাঠানো হলেও।