ডিজিটাল যুগের অগ্রযাত্রায় অনলাইন বাণিজ্য আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ঘরে বসে কয়েকটি ক্লিকেই প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে যাচ্ছে দরজায়— এই সুবিধা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই সুবিধার উল্টো পিঠে ক্রমশ গভীর সঙ্কটে পড়ছেন পাড়ার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক দোকানদাররা। যাঁরা বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় বাজারকে জীবন্ত রেখেছেন, তাঁদের অস্তিত্বই আজ প্রশ্নের মুখে।
বর্তমানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে ৫০ বা ১০০ টাকার সামগ্রীও অনলাইনে অর্ডার করা যাচ্ছে এবং তা বিনা ঝঞ্ঝাটে বাড়িতে পৌঁছেও যাচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবেই নিত্যপ্রয়োজনীয় ছোটখাটো কেনাকাটার ক্ষেত্রেও অনেক ক্রেতা স্থানীয় দোকানে না গিয়ে অনলাইন মাধ্যমের দিকেই ঝুঁকছেন। এর ফল ভুগছেন পাড়ার মুদি দোকান, স্টেশনারি কিংবা ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষরা। অনেকেরই অভিযোগ, আগের তুলনায় বিক্রি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। অথচ দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীর মজুরি— সব খরচই আগের মতো তাঁদের বহন করতে হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, অন্তত নির্দিষ্ট অঙ্কের নীচে অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। তাঁদের যুক্তি, ছোট অঙ্কের কেনাকাটা যদি স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কিছুটা হলেও বাঁচার সুযোগ পাবেন। কিন্তু এই প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক থাকাই স্বাভাবিক। এক দিকে প্রযুক্তির অগ্রগতি, যাকে থামানো যায় না, থামানো উচিতও নয়। অন্য দিকে, লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীর জীবন-জীবিকা, যা সমাজ ও অর্থনীতির ভিতকে শক্ত করে। বড় অনলাইন সংস্থাগুলির বিপুল মূলধন, বিশাল পরিমাণে ছাড় এবং দ্রুত ডেলিভারির সঙ্গে ছোট দোকানদারের পক্ষে প্রতিযোগিতায় নামা কার্যত অসম্ভব। ফলে বাজারে এক ধরনের অসম লড়াই তৈরি হচ্ছে বলেই অনেকের মত।
প্রশ্নটা তাই অনলাইন বনাম অফলাইন নয়, প্রশ্নটা হল ভারসাম্যের। ডিজিটাল অর্থনীতির সুফল যেমন বজায় থাকবে, তেমনই ক্ষুদ্র ব্যবসার সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। কর কাঠামোতে ছাড়, সহজ ঋণ, স্থানীয় বাজারকে চাঙ্গা করার নীতিগত উদ্যোগ— এমন নানা পথ ভাবা যায়। কারণ পাড়ার দোকান তো শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, তা সামাজিক সম্পর্কেরও কেন্দ্র। উন্নয়নের পথে হাঁটতে গিয়ে যদি প্রান্তিক মানুষের জীবন বিপন্ন হয়, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না। অনলাইন সুবিধার যুগে দাঁড়িয়ে এই বাস্তবতাই আজ নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
কুন্তল চক্রবর্তী, বনগাঁ, উত্তর ২৪ পরগনা
তাড়াহুড়ো কেন?
প্রেমাংশু চৌধুরীর ‘নাম তুলতে তুলতে ভোট শেষ? প্রশ্ন’ (২৫-২) শীর্ষক প্রতিবেদনের মুখ্য আলোচ্য বিষয়টি যথেষ্ট উদ্বেগজনক এবং গভীর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেই মনে হয়। দুয়ারে পশ্চিমবঙ্গের ভোট জেনেও নির্বাচন কমিশনের ‘কুছ পরোয়া নেহি’ মনোভাব ও কর্মকাণ্ডের ফলেই যে এক চরম সাংবিধানিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
সমস্যা এতটাই জটিল যে, যে ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারদের যোগ্যতার নিষ্পত্তি সময়ের মধ্যে না হলে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন কি না তার কোনও স্পষ্ট উত্তর দেওয়া হচ্ছে না। একটা বিষয় কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না, নির্বাচন কমিশনের এই কাজটি করতে এত তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজনই বা কী ছিল? কী সেই বিশেষ উদ্দেশ্য?
২০০২ সালের শেষ সংশোধিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী যখন রাজ্যবাসী বেশ কয়েকটি লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন পার করে এলেন, তখন তো কোনও সঙ্কট দেখা দেয়নি। তা হলে এমন কী গুরুতর কারণ রাতারাতি দেখা দিল যে, যেন তেন প্রকারেণ তিন মাসের মধ্যেই এই অত্যন্ত দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করতেই হবে বলে এ ভাবে তুমুল চাপ দেওয়া হল?
কমিশনের এই চরম হঠকারিতার জন্য চরম মূল্য গুনতে হল বিএলও থেকে শুরু করে আম আদমি— সকলকেই। যথেষ্ট সময় হাতে নিয়ে কাজটি করা হলে এই অনাবশ্যক সঙ্কট কোনও ভাবেই সৃষ্টি হত না। আগামী বিধানসভা ভোটের পরেই যদি এই প্রক্রিয়া শুরু করা হত, তা হলেও কি বড় সমস্যা হত? সেই সুযোগ না দেওয়ার অর্থ কী?
সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়, এই অনাবশ্যক ভাবে উদ্ভাবিত সঙ্কটের দায় নিতে যেন কেউই প্রস্তুত নয়। যা চলছে, তা দেখে আজ মনে হয় গণতন্ত্র এখন এক গভীর সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
তাপস সাহা, শেওড়াফুলি, হুগলি
আশঙ্কা
শুভ্রপ্রকাশ মণ্ডল ও অমিতকুমার মাহাতোর লেখা ‘বাংলা বলেই কি খুন পরিযায়ী শ্রমিক, ধন্দ’ (১৩-২) শীর্ষক প্রতিবেদন প্রসঙ্গে এই পত্র। ভিন রাজ্যে কোনও বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হলেই সেটিকে বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণেই ঘটেছে বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ভোট যত এগিয়ে আসছে, ততই এই ধরনের রাজনীতির প্রসার ঘটছে রাজ্যে। কেন এই বাঙালি আবেগের রাজনীতি? এই আবেগকে হাতিয়ার করতে গিয়ে যে প্রাদেশিকতার বিপজ্জনক রাজনীতির জন্ম দেওয়া হচ্ছে, তাতে আগামী দিনে বাংলা তথা বাঙালির বিপদ আরও ঘনিয়ে আসতে পারে, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
প্রথমত, শিল্প নেই, কর্মসংস্থান নেই, নেই কোনও সুস্পষ্ট আর্থিক পরিকল্পনা। শ্রমিক থেকে শিক্ষিত যুবক-যুবতী, সকলকেই কাজের সন্ধানে পাড়ি দিতে হচ্ছে অন্য রাজ্যে কিংবা বিদেশে। এই পরিস্থিতিতে যদি সব দিক বিচারের আগে প্রথমেই বলা হয়, বাইরের রাজ্যে বাংলা বলার জন্যই বাঙালিরা খুন হচ্ছেন, তবে সেই সব রাজ্যের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরির আশঙ্কা নেই তো?
মিহির কানুনগো, কলকাতা-৮১
স্বার্থবিরোধী
বিশ্বজিৎ ধরের উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধের শিরোনামটিই ‘চাপের কাছে নতিস্বীকার’ (১৩-২) ইঙ্গিত করে যে আলোচ্য এই চুক্তি চিরাচরিত ‘দ্বিপাক্ষিক’ চুক্তির মতো আদৌ দু’পক্ষের সম্মানরক্ষার ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়নি। অনেকটা এক তরফা ভাবেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তাঁর নিজের ইচ্ছেটা এই চুক্তির মাধ্যমে আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন বলেই মনে হয়।
এই চুক্তি শুধু যে বাণিজ্যিক দিক থেকে ভারতকে পর্যুদস্ত করল তা-ই নয়, আমাদের স্বাধীনতার উপরও এক প্রকার হস্তক্ষেপের সঙ্কেত বহন করছে। এখন থেকে আমরা আর রাশিয়া কিংবা ইরান থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে জ্বালানি তেল কিনতে পারব না। বেশি দামেই তা কিনতে হবে সুদূর ভেনেজ়ুয়েলা কিংবা আমেরিকা থেকে। আর তার জন্য দেশের বাজারে খেসারত দিতেও প্রস্তুত থাকতে হবে। কী ধরনের মুক্ত বাণিজ্যের নমুনা এটি! আর কী ভাবেই বা এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ‘আত্মনির্ভরতা’র মডেলটি প্রতিষ্ঠিত হল?
আমেরিকার মতো উন্নত একটি দেশ যখন নিজেদের দশ লক্ষ কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষার কৌশল নিচ্ছে, তখন আমরা একটি উন্নয়নশীল দেশ হয়েও আমাদের কৃষকদের স্বার্থ উপেক্ষা করে আমেরিকার কৃষিজাত পণ্যকে দেশের বাজারে অবাধ প্রবেশাধিকারের সুযোগ করে দিচ্ছি। এতে কি আমাদের কষ্টার্জিত খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতাকেই বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে না?
হোয়াইট হাউস-এর দাবি, এই চুক্তির ফলে ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের ভারতীয় বাজার আমেরিকার পণ্যের জন্য আরও বেশি করে খুলে যাবে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? অসম এই শুল্কযুদ্ধের ফলে আমাদের দেশের কৃষিক্ষেত্র থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ক্ষেত্র, যার উপর অধিকাংশ মানুষের রুটি-রুজি নির্ভরশীল, সবই ভয়ানক ভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গৌতম নারায়ণ দেব, কলকাতা-৭৪
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে