সম্পাদক সমীপেষু: পটভূমিটা জরুরি

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

সেমন্তী ঘোষ কর্তৃক গৃহীত সুগত বসুর সাক্ষাৎকার ‘ইতিহাসকে ব্যবহার করতে চাইলেই বিপদ হয়’এবং ‘মানবতাবাদই ছিল তাঁদের ধর্ম’ (৬-৭ ও ৭-৭) যেমন সমৃদ্ধ করে, তেমনই ভিন্ন মতের অবকাশও থেকে যায়। দেশভাগের পর কয়েক দশক ধরে পূর্ব বাংলার হিন্দুদের দুর্দশার জন্য তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে অনেকাংশে দায়ী করেছেন (ছবিতে)। সম্ভবত, বঙ্গবিভাজনে শ্যামাপ্রসাদ সম্মতি দেওয়ায় তাঁকে দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু কোন পটভূমিতে শ্যামাপ্রসাদ ভারত বিভাগ তথা বঙ্গ বিভাগের পক্ষে প্রচার করেন, জানা জরুরি।

শ্যামাপ্রসাদ কংগ্রেসের নীতির সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে একমত ছিলেন না, তাঁর ধারণা ছিল কংগ্রেস পদে পদে মুসলিম লিগের সঙ্গে আপস করে হিন্দুদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করছিল। ১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে বঙ্গদেশে মুসলিম লিগ সুবিধা করতে পারেনি, মুসলমানরা বেশি সংখ্যায় সমর্থন করেছিলেন ফজ়লুল হকের নেতৃত্বে কৃষকপ্রজা দলকে। সেই সময় কংগ্রেস হাইকমান্ডের নির্দেশে প্রাদেশিক কংগ্রেস, কৃষক প্রজা দলের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকার করে। ‘সাম্প্রদায়িক’ শ্যামাপ্রসাদ কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ বলে বিবেচনা করেন।

১৯৪০ সালে লাহৌর অধিবেশনে মুসলিম লিগ পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করলে, শ্যামাপ্রসাদ প্রতিবাদ জানান এবং ১৯৪৬-এর কলকাতা-নোয়াখালির ভয়ানক দাঙ্গার পরও বঙ্গদেশের অ্যাসেম্বলিতে ভারত বিভাগের বিরোধিতা করেন। কিন্তু ১৯৪৭-এর মার্চের পর যখন দেখা গেল ভারত বিভাগ অনিবার্য, মুসলিম লিগের দাবি কংগ্রেস মেনে নিয়েছে, তার পর থেকেই শ্যামাপ্রসাদ দাবি করতে থাকেন, ভারত বিভাগ যদি হয়, পঞ্জাব বিভাগ যদি হয়, তা হলে বঙ্গ বিভাজনও কাম্য। হোসেন শহীদ সুরাবর্দি ১৯৪৭-এর ২৭ এপ্রিল কলকাতায় এক সাংবাদিক বৈঠকে অখণ্ড বঙ্গদেশের এক সোনালি ভবিষ্যতের কথা বলে জানান, অখণ্ড বাংলায় মুসলমান সংখ্যাগুরু হলেও হিন্দুদের কোনও দুর্ভাবনা নেই। কিন্তু হিন্দু-মুসলমান যুক্ত বাংলায় সুখে থাকতে পারলে, যুক্ত ভারতে কেন সুখে থাকতে পারবে না—সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর সুরাবর্দি দিতে পারেননি। শ্যামাপ্রসাদ প্রশ্ন তোলেন, ১৯৪৬ সালে কলকাতা আর নোয়াখালিতে নরক বানানোর পর সুরাবর্দি কিসের ভরসায় স্বর্গের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন? ভারত বিভাগ হবে অথচ বঙ্গদেশকে অখণ্ড স্বাধীন রাজ্য করতে হবে— এই মতের দাবিদারদের শ্যামাপ্রসাদ দেখেছিলেন, মহম্মদ আলি জিন্নার ফাঁদে পড়া মানুষ হিসাবে।

জিন্না অখণ্ড বাংলার কথা ভাবেননি, তাঁর দাবি ছিল, অসম ও বাংলা দুটোই পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে যখন অখণ্ড স্বাধীন বঙ্গের কথাবার্তা হতে লাগল, চিঠিপত্রে, আলোচনায় তখন তিনি রাজি হয়েছিলেন, মুসলমানপ্রধান বঙ্গদেশকে কুক্ষিগত করতে বিশেষ বেগ পেতে হবে না ভেবে।

শ্যামাপ্রসাদ শুধু পশ্চিমবঙ্গ আদায়েই তাঁর দাবি সীমাবদ্ধ রাখেননি, স্বাধীনতার পর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের নির্যাতিত হিন্দুদের পুনর্বাসনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছেন। নির্যাতিত উৎখাত হিন্দুদের পুনর্বাসনের দাবিতে অনড় থেকে তিনি ১৯৫০-এ পণ্ডিত নেহরুর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগও করেন। ১৯৫০-এর অগস্টে সংসদে সুদীর্ঘ ভাষণে নেহরু-লিয়াকত চুক্তির বিরোধিতা করে তিনি বলেছিলেন, তিনটি উপায়ে ভারত পাকিস্তানের শরণার্থী সমস্যার সমাধান হতে পারে। ১) ভারত-পাকিস্তানের পুনর্মিলন, ২) দুই দেশের ভিতর সংখ্যালঘু বিনিময়, ৩) ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা। পূর্ববঙ্গে নিপীড়িত হিন্দুদের নিয়ে তিনি অবশ্য দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যেতে পারেননি। ১৯৫৩-র ২৩ জুন কাশ্মীরে শেখ আবদুল্লার কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়।

এ দেশের এক শ্রেণির ইতিহাসবিদ শ্যামাপ্রসাদকে ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে বঙ্গ বিভাজনের প্রবক্তা রূপে চিহ্নিত করে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকাকে হেয় করতে চেয়েছেন, কিন্তু ইতিহাসের গতিপথই বুঝিয়ে দিয়েছে, কতটা সঠিক, কতটা দূরদর্শী ছিলেন তিনি।

উজ্জ্বলকুমার মণ্ডল

শেওড়াফুলি, হুগলি

 

বঙ্কিমচন্দ্র

সুগত বসু সাক্ষাৎকারে আলোচনা করেছেন আনন্দমঠ উপন্যাসে বঙ্কিম ‘কিছু অন্য রকম কথা’ বলেছেন, সেই বিষয়ে এবং ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীতে ‘হিন্দু ভাব’ বিষয়ে। আনন্দমঠ সম্বন্ধে রেজ়াউল করিমের মতামত বোধ করি প্রাসঙ্গিক। ‘বঙ্কিমচন্দ্র ও মুসলমান সমাজ’ গ্রন্থে তাঁর বক্তব্য, “আনন্দমঠ শুধু আনন্দ দেয় নাই, দিয়াছে প্রাণ, দিয়াছে উৎসাহ, প্রাণের পরতে পরতে ছুটাইয়াছে আগুনের ফোয়ারা। প্রাণে জাগাইয়া দিয়াছে দেশাত্মবোধের মহান আদর্শ। ...আনন্দমঠ না থাকলে পরবর্তী যুগের কোন আন্দোলন (যেমন স্বদেশী, হোমরুল, খিলাফত, অসহযোগ) সার্থক ও পূর্ণ হইত না। ...স্বদেশীযুগ হইতে এ পর্যন্ত জাতীয় জাগরণের জন্য যে সব আন্দোলন হইয়াছে, আনন্দমঠ পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ভাবে তাহার সবটাতে অনুপ্রেরণা যোগাইয়াছে।’’ রেজ়াউল করিমের এও মত, “বন্দে মাতরমে কোন দেবদেবীর পূজাও করা হয় নাই, অথবা তাহাদের স্তবস্তুতিও করা হয় নাই। উহাতে দেশমাতৃকার বন্দনা করা হইয়াছে মাত্র। ইহা ইসলামের দৃষ্টিতে আদৌ নিন্দনীয় নহে।’’

সাক্ষাৎকারে যে প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়নি তা হল, তবু বন্দে মাতরম্ নিষিদ্ধ হয়েছে; আনন্দমঠ পোড়ানো হয়েছে। ১৯৩৮-এ সাহিত্যসম্রাটের জন্মশতবর্ষে কলকাতায় ‘আনন্দমঠ’-এর বহ্ন্যুৎসব হয়েছিল। অসহিষ্ণুতার বীজ যে সেই সময় রোপিত হয়নি, তা কি নিশ্চিত করে বলা যায়।

শ্রীবসু বঙ্কিমের ‘সীতারাম’ এবং ‘রাজসিংহ’ উপন্যাস দু’টির উল্লেখ করেছেন। ‘রাজসিংহ’-এ বঙ্কিমচন্দ্র যা বলেছিলেন তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ: ‘‘মুসলমান হলেই খারাপ হয় না, হিন্দু হলেই ভাল হয় না। পক্ষান্তরে হিন্দু হলেই খারাপ হয় না, মুসলিম হলেই ভাল হয় না।’’ অন্য দিকে বঙ্কিম জীবনীকার অমিত্রসূদন বলেছেন, ‘‘বঙ্কিমের ‘সীতারাম’ উপন্যাস নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে বঙ্কিমের বিরুদ্ধে মুসলমান বিদ্বেষের অভিযোগ মিথ্যা।’’

দুর্ভাগ্য, এ দেশে কোনও একটি রাজনৈতিক দলের অবিমৃশ্যকারী কার্যকলাপের ফলে হয়তো আজ ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবোধ’ শব্দ দু’টি ‘‘কম্পিত হৃদয়ে দাঁড়ায়ে বাইরে’’। কিন্তু এতে কার মঙ্গল হবে? শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সকলেরই কাঙ্ক্ষিত মুক্তচিন্তাসম্পন্ন এক আধুনিক সমাজ, কারণ ধর্মীয় কুসংস্কারের নিগড়ে বাঁধা সমাজে অগ্রগতি শ্লথ হবে, বলা বাহুল্য। যে ধর্ম যত রেজিমেন্টেড, সেই ধর্মাবলম্বী স্বাভাবিক ভাবেই অধিকতর রেজিমেন্টেড, অসহিষ্ণু হবেন। কিন্তু রেজিমেন্টেড সমাজ, তা ধর্ম বা মতাদর্শগত যা-ই হোক না কেন, আজকের দিনে অচল।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়েছিল কেবলমাত্র ধর্মীয় দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে, অন্য কোনও আদর্শগত কারণে নয়। তবু তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করলেন— যদিও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় অনেক ক্ষেত্রে এক ধরনের মৌলবাদ প্রশ্রয় পায় ও অন্য পক্ষের সুপ্ত ক্ষোভের বীজ রোপিত হয়। এই বাস্তব সত্য বিস্মৃত হয়ে, অসহিষ্ণুতাকে কেবলমাত্র বর্তমানের খণ্ডিত প্রেক্ষিতে বিচার অনৈতিক এবং ভ্রমাত্মক। অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মনে রাখা দরকার, অসহিষ্ণুতা সব সময় একমাত্রিক হয় না এবং ব্যাপারটা এমনও নয় যে হঠাৎ এক প্রভাতে তৈরি হয়ে গেল কার্যকারণহীন অসহিষ্ণুতার আবহ।

শান্তনু রায়

কলকাতা-৪৭

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট,  কলকাতা-৭০০০০১।

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

ভ্রম সংশোধন

ভারত-ইংল্যান্ড প্রথম টেস্টের প্রথম দিনের স্কোরবোর্ডে কিছু সংস্করণে (খেলা, পৃ-১৬, ২-৮) একটি আউটের ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্টন ডি’কক ও শ্রীলঙ্কার রঙ্গনা হেরাথের নাম বেরিয়েছে। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।