Bengali

সম্পাদক সমীপেষু: অস্তিত্বের জন্য

দারিদ্রের কারণে সুনালী খাতুনদের (ছবি) জন্মভিটে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরের অনাত্মীয় শহরে থাকার ফলে বাংলা ভাষার উচ্চারণে যে হিন্দি ভাষার টান শোনা যায়, তার সঙ্গে বাঙালি পরিবারের ছেলেমেয়েদের কথায় বাংলা বাক্যের সিংহভাগ জুড়ে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার, কখনওই এক বন্ধনীতে রাখা যায় না।

শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৭
Share:

‘বাঙালি অস্মিতার ধাঁধা’ (৩০-১২) শীর্ষক প্রবন্ধটিতে অমিতাভ গুপ্ত বাঙালি ‘ভদ্রলোক’-এর যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন, সেই পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। বলা যেতে পারে নিম্নবিত্ত, বাঙালি মুসলিম ও খেটে খাওয়া মানুষ, তাঁদের হাতেই আজ ‘বাঙালি’র অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দায়। মানবিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে তাই তাঁদেরই আসল ভদ্রলোক বলা যেতে পারে।

দারিদ্রের কারণে সুনালী খাতুনদের (ছবি) জন্মভিটে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরের অনাত্মীয় শহরে থাকার ফলে বাংলা ভাষার উচ্চারণে যে হিন্দি ভাষার টান শোনা যায়, তার সঙ্গে বাঙালি পরিবারের ছেলেমেয়েদের কথায় বাংলা বাক্যের সিংহভাগ জুড়ে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার, কখনওই এক বন্ধনীতে রাখা যায় না। বরং প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিতে নিজের অস্তিত্বকে নিজেই মুছতে চাওয়ার এই যে সভ্যতা, এর মধ্যে কি আদৌ কোনও ভদ্রতা আছে? হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর বিজেপি এবং প্রবন্ধকার বর্ণিত এই ‘ভদ্রলোক’-দের চিন্তাভাবনায় বাঙালি সম্বন্ধে প্রকৃত ধারণার মিল দেখে সাধারণ মানুষ ভাবতেই পারেন, এই তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ সম্প্রদায় আর বিজেপি সমার্থক। ঠিক সেই কারণেই বাংলার বিজেপি নেতৃত্ব ভিন রাজ্যে বাঙালিদের এত বিড়ম্বনার পরেও মুখ বুজে থাকাকেই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেন।

অন্য দিকে, রাজ্য সরকারের প্রশাসনিকতাকে সকলের জন্যই প্রত্যক্ষ হস্তান্তরের নীতিতে নিয়ে যাওয়ার যে কথা বলা হয়েছে এই প্রবন্ধে, সেই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, এতে মূল ক্ষতি কিন্তু প্রকৃত বাঙালিরই। বাংলার শ্রমিককে কাজের সন্ধানে ভিন রাজ্যে গিয়ে অনুপ্রবেশকারী তকমা নিয়ে অত্যাচারিত হয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে এই বাংলাতেই, আবার কখনও বা তাঁদের মর্মান্তিক পরিণতি হচ্ছে। অথচ ভিন রাজ্য থেকে কাজের সন্ধানে আসা শ্রমিকেরা পাকাপাকি ভাবে ঘাঁটি গাড়ছেন এই বাংলাতেই। তাতেও মূল ক্ষতি কিন্তু সেই প্রকৃত বাঙালিরই। রাজ্যে এই ভাবে হিন্দুত্ববাদী শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকলে, রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে যারা বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে, তাদের কাছে এলিট শ্রেণির বাঙালিদের আক্রমণ করা শুধুমাত্র সঠিক সময়ের অপেক্ষা। তাই পরতে পরতে রাজনীতির এত বাঙালি অস্মিতার ধাঁধার সমাধান কিন্তু এই বাঙালিকেই করতে হবে, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য।

অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি

হারানো সত্তা

‘বাঙালি অস্মিতার ধাঁধা’ শীর্ষক প্রবন্ধে অমিতাভ গুপ্ত প্রশ্ন তুলেছেন, তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ বাঙালি কি সুনালী খাতুনকে যথেষ্ট ‘বাঙালি’ বলে মনে করে? সত্যিই কি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিধিতে এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর কোনও মান্যতা রাখে? স্বাধীনতার আগে এবং পরেও দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার রাশ ছিল বাঙালি ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির হাতে। কিন্তু সেই ছবি ধীরে ধীরে পাল্টায়, রাজনীতির ভাষা বদল হতে শুরু করে। আজকের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক শক্তি আর উচ্চ ও মধ্যবিত্ত বাঙালিরা নন। জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ, যাঁরা পরিচিত ‘ভদ্রলোক’ বাঙালি এবং তাঁদের মধ্যে অনেকে পরিচিত বুদ্ধিজীবী হিসেবে, তাঁদের অনেকেই বর্তমান শাসক দলের ছায়াসঙ্গী হয়েছিলেন পূর্ববর্তী শাসক দলের অপশাসনের থেকে নিষ্কৃতি পেতে। তাঁরা আজ সরে এসেছেন ধীরে ধীরে কিংবা বর্তমান শাসক দলের নিকট ব্রাত্য হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বাঙালির যে সম্মান ছিল, সেটা ছিল মূলত এই ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির আধিপত্যের কারণেই। বাংলার রাজনীতি থেকে এই ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণি যত সরে এসেছেন, ততই কমেছে ‘বাঙালি’ পরিচিতির আত্মগৌরব। বাঙালির গর্ব করার মতো যে কয়েকটি জিনিস ছিল, তার মধ্যে একটি যদি হয় সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ তা হলে পরবর্তীটি রাজনৈতিক সচেতনতা। সরকারি স্কুলে প্রবল দুরবস্থা, জনগণের করের টাকায় ধর্মস্থান নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভয়ের বাতাবরণ— বহুবিধ কারণে মানুষ বিরক্ত হলেও মধ্যবিত্ত বাঙালি আজ কোনও প্রশ্ন করে না। সৃষ্টি হয়েছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির। সঙ্কীর্ণ রাজনীতির নাগপাশে, সেটি বাঙালি পরিচিতি হোক বা নিম্নবিত্ত বাংলাভাষী মানুষকে ভিন রাজ্যে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দেওয়ার প্রচেষ্টা হোক, হারিয়ে যেতে চলেছে সাংস্কৃতিক চিহ্নের গৌরবান্বিত বাঙালি সত্তা।

সুপ্রিয় দেবরায়, বরোদা, গুজরাত

দূষণের ক্ষতি

প্রচণ্ড শীতের দাপটে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে খোলা জায়গায় বর্জ্য জ্বালিয়ে হাত-পা সেঁকার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তা এক বিপদসঙ্কেত বিশেষ। প্লাস্টিক, পলিথিন, রবার, পুরনো কাপড় কিংবা মিশ্র বর্জ্য জ্বালিয়ে আগুন ধরানো অনেকের কাছেই সহজ সমাধান মনে হয়, কিন্তু এই অভ্যাসের ফলে যে ক্ষতির বীজ আমরা বপন করছি, তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে পুরো সমাজকে দীর্ঘদিন ধরে। প্লাস্টিক বা পলিথিন পোড়ালে বাতাসে বিষাক্ত কণা ছড়িয়ে পড়ে, যা নিঃশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখ ও গলার জ্বালা, মাথাব্যথার মতো সমস্যা সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে এই দূষণ ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ ও স্নায়ুর সমস্যার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। শীতকালে বাতাস স্বাভাবিক ভাবেই ভারী ও স্থির থাকে, ফলে বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে না-পেরে একই এলাকায় জমে থাকে এবং দূষণের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আশপাশের মানুষের উপর। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, এবং যাঁরা আগে থেকেই শ্বাসযন্ত্রজনিত রোগে ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ধোঁয়া মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

পরিষ্কার বাতাস শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। শীতের মোকাবিলায় নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প রয়েছে, যা অনুসরণ করলে পরিবেশ দূষণ ছাড়াই শীতের কষ্ট অনেক কমানো যায়। একই সঙ্গে প্রশাসনের উচিত খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা, যাতে মানুষ বুঝতে পারে যে এই অভ্যাস শুধু আইনবিরুদ্ধ নয়, নিজের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর।

সন্দীপন সরকার, পাল্লা রোড, পূর্ব বর্ধমান

থমকে উন্নয়ন

জয়ন্ত বসুর প্রবন্ধ ‘চিত্ত যেথা ভয়পূর্ণ’ (৫-১) প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই। নির্বাচন এলে শাসক ও বিরোধী দলের উন্নয়ন নিয়ে তরজা চিরকালীন। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব সুন্দরবনের যথাযথ উন্নয়ন না হওয়ার জন্য রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের দিকেই আঙুল তুললেন। সুন্দরবন রাজ্যের এমন একটি অংশ, যেখানে প্রতি বছর নিয়ম করে শক্তিশালী সাইক্লোন তছনছ করে দেয় গরিব মানুষের জীবন। কাঁচা মাটির নদী বাঁধগুলি ভেঙে ঢোকা নোনা জল নষ্ট করে দেয় চাষের জমি। পানীয় জলের অভাব হয়। অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ অরণ্য যথেচ্ছ ধ্বংস করে চিংড়ি চাষের জলাশয় তৈরি করা হয়েছে লাগামহীন ভাবে। এই সব অপকর্মের মূল কারিগর হল পার্টির আশ্রয়ে, প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা কর্মীরা। বহু পরিবারের মেয়েরা ছ’-আট ঘণ্টা নোনা জলে মীন ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। নোনা জলে তাঁদের নানা জটিল রোগের সম্মুখীন হতে হয়। বহু মানুষ পাড়ি দিয়েছেন ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে। বছর তিনেক আগে বেড়াতে গিয়েছিলাম জি প্লট গোবর্ধনপুরে। সেখানে টিম-টিম করে জ্বলে বিজলি বাতি, সন্ধ্যা নামলে জনজীবন একেবারে স্তব্ধ। একটি স্কুল আছে। সেখানেই পড়াশোনা করে সব শিশু। এই রকম পরিস্থিতিতে পর্যটনের উন্নয়নের চেয়েও জরুরি মানবোন্নয়নের ব্যবস্থা করা।

দিলীপ কুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন