নরেন্দ্র মোদি। —ফাইল চিত্র
মহাকাশ থেকে পাকিস্তানের আকাশ। উপগ্রহ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র থেকে পাকিস্তানের উপর সার্জিকাল স্ট্রাইক: প্রভূত তোফা কুড়িয়েছেন নরেন্দ্র মোদীর সরকার। তার প্রতিফলন ঘটেছে ২০১৯-এর ইভিএম-এও। বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে। বলিউড তড়িঘড়ি ‘উরি: দ্য সার্জিকাল স্ট্রাইক’ বানিয়ে ৩৪২ কোটি টাকার ব্যবসা করে ফেলেছে, এসেছে খান চারেক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও।
মার্কিন মুলুকের ‘হাউডি মোদী’র ইতিমধ্যেই ইতিহাসে স্থান পেেয়ছে। তাবড় রাষ্ট্রনায়ক ট্রাম্প সাহেব মোদীর সঙ্গে একই বেদিতে দাঁড়িয়ে আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ভোট ভিক্ষা সেরে ফেলেছেন। সিএএ নিয়ে অনেক আলোড়ন হলেও শেষ পর্যন্ত ইউরোপ-আমেরিকার বন্ধুতা ভারত হারিয়েছে বলে মনে হয় না।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জন্য গত পাঁচ বছরে অনেক সময় দিয়েছেন মোদী। বাংলাদেশের শেখ হাসিনার সঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছেন। আং সান সু চি-কে কথা দিয়েছেন মায়ানমারের উন্নতির জন্য আর্থিক অনুদান দেবেন তার পরিবর্তে প্রতিশ্রুতি চেয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যাতে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকে না পড়েন সে দিকে সু চি-র প্রশাসন কড়া নজর রাখবে। পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করে রাশিয়ার পূর্ব প্রান্তের বিকাশের জন্য মোটা অঙ্কের অর্থনৈতিক সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। চিনের প্রেসিডেন্টকে দেশে এনে মমল্লপুরমে বন্ধুত্বপূর্ণ বৈঠক সেরেছেন। শুধু দক্ষিণ এশিয়ার ভূখণ্ডেই যে ছড়ি ঘুরিয়েছেন, তা-ই নয়। সুদূর পশ্চিম এশিয়ার সৌদি রাজা ও রাজপুত্রের সঙ্গেও বাণিজ্যের খসড়া তৈরি করেছেন।
বিভিন্ন দেশের দেওয়া একাধিক পুরস্কারে শোভিত হয়েছেন মোদী। সোল শান্তি পুরস্কার থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ পুরস্কার, ‘স্বচ্ছ ভারত’ কায়েম করার জন্য গেটস ফাউন্ডেশনের স্বীকৃতি ছাড়াও, রাশিয়া-সহ গোটা কয়েক মুসলিম দেশ যেমন সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, আফগানিস্তান, প্যালেস্তাইন ও মলদ্বীপ নিজেদের দেশের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেছে মোদীকে।
দেখেশুনে মনে হতেই পারে ‘অচ্ছে দিন’-এর ধ্বজা উড়িয়ে প্রতিবেশীদের শুভেচ্ছা কুড়িয়ে চমৎকার আছে আমাদের দেশ। উপরের ছবির তলায় গেলেই আবার ভিতরের ছবিটা অন্য রকম। বিমুদ্রাকরণ ও জিএসটি-র চাবুক, কর্মসংস্থানের অভাব, ব্যবসায় চূড়ান্ত মন্দা, চাষির মৃত্যু, মানুষের ক্রয় ক্ষমতায় ধস, সামগ্রিক ভাবে নাগরিকদের রুটিরুজিতে টান— এ সব কথা আমাদের জানা। গত ছয় বছরে সর্বনিম্ন ৪.৫ শতাংশ জিডিপি নিয়ে চলছে মোদীর ‘অচ্ছে দিন’-এর ভারত। অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির (পাকিস্তান, বাংলাদেশ) জিডিপিও ভারতের তুলনায় ভদ্রস্থ।
ভারতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ ভারতীয়দের তাদের দেশে বিনা ভিসায় ঢোকার ছাড়পত্র দিতে রাজি নয়। ‘হেনলে পাসপোর্ট ইনডেক্স’-এর হিসেব বলছে ভারতের স্থান ২০১০-এ ৭৪ থেকে চলতি বছরে নেমে
এসেছে ৮৬-তে। তবে কি এটাই ভারতের প্রতি পৃথিবীর অন্য দেশগুলির শ্রদ্ধার প্রকৃত ছবি, না কি কাশ্মীর নীতিতে আন্তর্জাতিক মহলকে নাক গলাতে দিতে নারাজ হওয়ার কারণে ভারতকে স্থানচ্যুত করে বার্তা দেওয়া?
‘গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স’-এর সাম্প্রতিক ফল ভারতের পক্ষে উদ্বেগজনক। সরকারের নীতির সঙ্গে বিষয়টা ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে, এই কথা মনে না রেখে উপায় নেই। পৃথিবীর খাদ্যাভাবের নিরিখে ভারতের স্থান যেখানে ২০১৪ সালে ছিল ৫৫, সেখানে ২০১৯-এর সমীক্ষায় ১১৭ দেশের মধ্যে ভারতের স্থান নেমে দাঁড়িয়েছে ১০২-এ। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল ভারতের থেকে এগিয়ে ।
ভারত যে ‘অচ্ছে’ নেই, ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট’-ও তা-ই বলছে। এই সমীক্ষায় ১৫৬ দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ২০১৫-য় ছিল ১১৭, আর ২০১৯ সালে ছিটকে গিয়েছে ১৪০-এ। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চিন— ভারতের তুলনায় সন্তোষজনক অবস্থায়। তথৈবচ দশা ‘গ্লোবাল কম্পিটিটিভ ইনডেক্স’-এও। ১৪১ দেশের মধ্যে ভারতের স্থান আগের সমীক্ষার ফল থেকে ১০ ধাপ নেমে দাঁড়িয়েছে ৬৮-তে। ‘ওয়ার্ল্ড ফ্র্যাজিলিটি ইনডেক্স’ বলে দেয়, কোন দেশের সরকারের শাসনক্ষমতা দুর্বল, যার ফলে দেশে অভ্যন্তরীণ বিভাজন বা গৃহযুদ্ধ বাধার সম্ভাবনা প্রবল। ‘এলিভেটেড ওয়ার্নিং’-এর আওতায় ভারত, তার স্কোর ৭৪.৪। যে বিদেশিরা এ দেশে কর্মসূত্রে বসবাস করেন, তাঁদের কাছে কতটা নিরাপদ ভারত? ২০১৯ সালের ‘এক্সপ্যাট ইনসাইডার সার্ভে’-র মতে, ভারতের পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর। ৬৪ দেশের মধ্যে ভারত রয়েছে শেষ পাঁচে। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট ফর উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিয়োরিটি-র সমীক্ষায় প্রকাশ, ১৬৭টি দেশের মধ্যে ভারত ১৩৩— অর্থাৎ একদমই নিরাপদ নয়। গত বছর থম্পসন রয়টার্স-এর চালানো সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, ভারত বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক বিপজ্জনক এলাকা।
শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানই নয়, খোদ ভারত সরকারের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরোর (এনসিআরবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭’য় ভারতে ৩৩,৬০০ জন মহিলা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ১৫৩ দেশের মধ্যে ভারত ১১২। বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কায় অবস্থা ভারতের চেয়ে ভাল। ইন্ডিয়া করাপশন সার্ভে (২০১৯) বলছে, দুর্নীতিতে ভারত ১৮০ দেশের মধ্যে ৭৭টি দেশের পিছনে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজ়েশন বলছে পরিবেশ দূষণের সঙ্গে শিশুমৃত্যু সম্পৃক্ত। আইকিউ এয়ার ভিসুয়াল (২০১৮) রিপোর্ট জানাচ্ছে বিশ্বের ৩০টি শহরের মধ্যে বাতাস দূষণে আক্রান্ত ভারতের ২২টি শহর। ভারতে ৫ বছরের কমবয়সি প্রায় এক লক্ষ শিশু প্রতি বছর মারা যায় পরিবেশ দূষণের কারণে। ভারত কতটা ‘স্বচ্ছ’ বলাই বাহুল্য।
বেশি কথা নিষ্প্রয়োজন। ভারতকে চাঙ্গা করতে, প্রথম সারির দেশগুলোর পাশে আনতে চাই বাস্তবসম্মত নীতি প্রণয়ন। চাই বিশেষজ্ঞদের মতামত। তারও আগে চাই আত্মসমালোচনা। এ সবের সম্ভাবনা আছে কি?