কী মুশকিল! আমি তো মিনিস্টার রে বাবা! তা হলে আমি স্পেশাল ট্রিটমেন্ট পাব না? মিনিস্টার মানে কী? প্রকাণ্ড খেটেখুটে তুঙ্গে পৌঁছনো একটা বিরাট লোক, যার কথায় শয়ে শয়ে মক্কেল প্রতি দিন উঠবে-বসবে, হাত কচলাবে রাম, পায়ে ধরবে শ্যাম, নৈবেদ্য অফার করবে যদু, মোসাহেবি করবে মধু। আমাদের নাম মন্ত্রী, কিন্তু আমরা ঘুরে বেড়াই রাজার মতো। একে ধমকাই তাকে চমকাই। আমাদের খুশি করার জন্যে সবার মুখ থেকে গলে গলে পড়ে ‘ধন্য হলেম’ গুঁড়ো, আমরা গাড়ি করে গেলে সাইরেন শুনে সব গাড়ি থমকে থেমে ট্র্যাফিক জ্যাম, আমাদের প্লেনে ওঠার কথা থাকলে প্লেন ঠায় গালে হাত দিয়ে ভোম যত ক্ষণ না প্রাইভেট কানখুসকি খুঁজে হেলেদুলে এয়ারপোর্ট পৌঁছচ্ছি। সোজা কথা, আমাদের রথ মাটির চেয়ে চুয়াল্লিশ আঙুল ওপর দিয়ে চলে। এটাই আমাদের দেশের ঐতিহ্য, প্রথা। তা হলে রিও-তে এসে আমি আচমকা অন্য রকম হয়ে যাব কেন? আমার হেঁক্কোরবাজি কমে যাবে কেন? বরং এটা তো ব্রাজিল সরকারের দায়, অলিম্পিক কমিটির কর্তব্য: খোঁজ নিয়ে জানা যে আমাদের দেশের মন্ত্রীরা কী রকম ব্যবহার পেয়ে অভ্যস্ত! যদি অতিথির চিংড়িমাছে অ্যালার্জি থাকে, তবে কি হোস্টেরই ওপর দায় বর্তায় না, চিংড়ি ছাড়াই ফ্রায়েড রাইস করার? না কি সে তড়পে বলতে পারে, এ বাড়ি এলে চিংড়ি খেতেই হবে, সে তোমার গায়ে যতই দাগড়া দাগড়া র্যাশ বেরোক!
এদের সাহস তো কম নয়, আমার নামে লিখিত নালিশ করে! সটান বলে দেয়, উনি যদি ওঁর চ্যালাচামুন্ডা নিয়ে যেখানে সেখানে ঢুকে পড়ার অভ্যাস সংবরণ না করতে পারেন, তা হলে ওঁর অ্যাক্রেডিটেশন ক্যানসেল করে দেব! আরে, মিনিস্টার কি একলা-একলা রাস্তা চলবে না কি, ফেকলু পার্টির মতো? জমিদার কখনও পাইক-বরকন্দাজ ছাড়া কোথাও যায়? গেলে, তার মান থাকে? বড় বড় লোক মানেই গুচ্ছ নন্দীভৃঙ্গী সারা ক্ষণ তাদের পাশে ভনভন করবে। এ বার, আমি যাব খেলোয়াড়ের সঙ্গে দেখা করতে, তারা যাবে না? তা হলে আমার প্রেস্টিজ কোথায় থাকবে? তারা তো টেনে টেনে টিটকিরি মারবে, দাদা, নিয়ম ভেঙে আমাকে ঢুকিয়ে নিতে পারলেন না তো কীসের মিনিস্টার!
হ্যাঁ, নিয়ম শেখাতে এসেছিল এদের যে স্টাফগুলো, তাদের সঙ্গে আমার কয়েকটা লোক বিচ্ছিরি ব্যাভার করেছে, ঠেলাঠেলি করেছে, তেড়িয়া কথাবার্তাও উগরেছে। করবে না-ই বা কেন? মিনিস্টারের সঙ্গে যাচ্ছে, মাথা নিচু করে ছেড়ে দাও, তা না, পথ আটকাচ্ছ, হ্যান পারমিশন নেই ত্যান কার্ড নেই! আরে নিকুচি করেছে তোর কার্ডের! যত্ত মাছিমারা কেরানি! ভদ্রতা জানবে না, নিয়মের যে অনেক ফাঁকফোঁকরও থাকে এবং সেগুলোকে এব্লা-ওব্লা শ্রদ্ধা করেই চলতে হয়, নশ্বর মানুষের নিয়ম যে কিছুতেই ক্ষমতাবান মানুষের বেলায় লাগু করা যায় না, এ সব বেসিক সেন্স থাকবে না— তা হলে আমার চ্যালার গোঁত্তা খাবে না! কী খাবে, অভিনন্দন-চুবুচুবু রসগোল্লা?
অনেকের কী আস্পদ্দা, টুইটারে ফেসবুকে জিজ্ঞেস করছে, আমি এখানে কেন। আরে, অলিম্পিক হচ্ছে, আমি যাব না? আমাকেই তো হিসেব রাখতে হবে, আমাদের ক্রীড়া এগোল না পিছোল, হোঁচট খেল না লং জাম্প দিল? যাদের মেডেল পাওয়ার আশা আছে, তাদের খেলা দেখতে যাচ্ছি, যাতে মেডেল পেলেই আমি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে পড়তে পারি, লোকে যাতে বুঝতে পারে আমার দেশের খেলোয়াড়দের পেছনে, পাশে, এমনকী সামনেও আমি আছি। নয়ই বা কেন? কত পয়সা খরচা করা হয়েছে এক একটা খেলোয়াড়ের জন্যে? তা তো বিনিয়োগ রে বাবা! এখন ওরা যদি ব্যর্থ হয় তা হলে যেমন ভারত গালাগাল খাবে (এই দেশটার দ্বারা কিস্যু হবে না, পরিকাঠামো নেই, সরকার ক্রীড়া-অজ্ঞ), তেমনই ওরা যদি সফল হয় তা হলে ভারত সরকারের গলাতেও যাতে মেডেলের গোল্লা ছায়াটুকু দোলে, লাভের গুড় যাতে আমিও পাঁউরুটিতে মাখাই, তার ব্যবস্থা করব না কেন?
সবচেয়ে বড় কথা, আমার সেলফি তুলতে দারুণ লাগে। এ কথা ঠিকই যে একটা বক্সার যখন হাঁপাচ্ছে, প্রায় টলে পড়ে যায় যায়, তখন তার সঙ্গে সেলফি তোলাটা কারও কাছে একটু নিষ্ঠুর মনে হতে পারে। কিন্তু বক্সার তো ক্লান্ত হবেই রে বাবা। ঘুসি খাওয়া তার কাজ! আর হ্যাঁ, জাপানের সঙ্গে আমাদের মহিলা হকি টিম অমন চমৎকার ড্র করতেই আমি হুড়হুড়িয়ে মাঠে নেমে গিয়ে তাদের সঙ্গে সেলফি তুললাম, তাতে তো নিন্দের কিছু নেই! একটা লোক তার দেশের কৃতিত্বে আবেগ-জবজবে হয়ে সব নিয়ম ছিটকে টপ-খুশিয়ালি মানাচ্ছে, সেই অ্যাঙ্গলটা কারও চোখে পড়ল না? শুধু আইনের গিঁট্টুটাই মিডিয়ার হাতে খড়খড়ে কড়া ফেলে দিল?
দেখো ভাই, আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা আমাদের মতো ব্যবহার করব, অন্যদের তা ঝেলতে হবে। এটাই স্বাধীনতার মানে। যে দেশে দুশো বছর ধরে সায়েবরা বলে এসেছে, আমরা যেখানে যাব তোরা শিরদাঁড়া নুইয়ে কুর্নিশের ভঙ্গিতে স্টিল থাকবি, কাঁকালে খিল ধরে গেলে যাবে, সেখানে আমরা গ্যালন গ্যালন রক্ত ঝরিয়ে স্বাধীনতা এনেছি, কেন? যাতে এ বার কয়েক জন কালো সায়েব বাকি কালো নেটিভদের ঠিক ওই ভাষায় ও ভঙ্গিতেই দাবড়াতে পারে। অন্য লোককে দিয়ে আমার জুতোর ফিতে খোলাব-বাঁধাব, নিজেদের মাইনে বাড়াব আর গরিবগুলোকে কাঁদাব। আরে বাবা, কষ্ট করে মিনিস্টার হলাম কী জন্যে? কিড়ে-মকোড়েগুলোকে তো দিনভর বোঝাতে হবে, কাদের পিছনে লেজ আর কাদের কোলে প্রিভিলেজ? স্বাধীনতা মানে আমার অভদ্রতা আছড়াবার স্বাধীনতা, আমার ঔদ্ধত্য দাবড়াবার স্বাধীনতা। সেটা শেখো, বদমাশ রিও, আওড়াও: ভারতীয় স্বাধীনতা যুগ যুগ জিও!
লেখাটির সঙ্গে বাস্তব চরিত্র বা ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্ত অনিচ্ছাকৃত, কাকতালীয়