Asha Workers harassment

সাদা বনাম বেগুনি

আশাকর্মীদের এই কার্যসূচি আগেও অনেক বার হয়েছে। এ বার যেন সাদা উর্দি বনাম বেগুনি শাড়ির সংঘাতের দৃশ্য ইচ্ছে করেই রচনা করা হল।

শেষ আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৫
Share:

আন্দোলনরত আশাকর্মীদের সঙ্গে যে ব্যবহার করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার, তা দেখে প্রশ্ন জাগে, এর কী প্রয়োজন ছিল? রাজ্য সরকারেরই অধীনে কর্মরত এই দরিদ্র, প্রান্তিক মহিলারা স্বাস্থ্যভবনের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন নানা দাবি নিয়ে। তাঁদের এই কর্মসূচি পূর্বঘোষিত, ২১ জানুয়ারি আলোচনার জন্য আশাকর্মীদের সময় দিয়েছিলেন স্বাস্থ্য কর্তারাই। তা সত্ত্বেও তাঁদের আটকাতে পুলিশ রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করল, ট্রেন-বাস থেকে তাঁদের টেনে নামাল, বহু আশাকর্মীকে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে রাখল থানায়। এত কিছুর পরেও আশাকর্মীদের একটি বড় অংশ পৌঁছলেন স্বাস্থ্য ভবনে, স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে আলোচনাতেও বসলেন। তা হলে কেন সরকার তার পীড়নশক্তির পরিচয় রাখল জেলায় জেলায়? সরকারের কাজে নাগরিকের ক্ষোভ থাকবে, সরকারের প্রতি প্রশ্ন, অভিযোগ থাকবে, তা তো অস্বাভাবিক নয়। তাঁদের কথা ধৈর্য ধরে শুনবে সরকার, অভিযোগ নিরসনের উপযুক্ত ব্যবস্থা করবে, অথবা দরদস্তুরের মাধ্যমে দু’পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনও অবস্থানে পৌঁছবে, এটাই প্রত্যাশিত। অথচ পরিবেশ সুরক্ষা, শিক্ষকদের যথাযথ নিয়োগ, নারী নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন— যে কোনও দাবিতে আন্দোলনরত নাগরিককে সরকার ‘প্রতিপক্ষ’ করে তুলেছে। পুলিশের আক্রমণের ফলে যে উত্তেজনা, বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিয়ে নাগরিককে ‘অপরাধী’ বলে দেখাতে চেয়েছে সরকার।

শান্তিপূর্ণ মিছিলের শেষে স্বাস্থ্য ভবনে জমায়েত— আশাকর্মীদের এই কার্যসূচি আগেও অনেক বার হয়েছে। এ বার যেন সাদা উর্দি বনাম বেগুনি শাড়ির সংঘাতের দৃশ্য ইচ্ছে করেই রচনা করা হল। যদি জনজীবনে শৃঙ্খলারক্ষাই আশাকর্মীদের বাধাদানের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তা হলে নিঃসন্দেহে ফল হয়েছে বিপরীত— ব্যারিকেড, ধরপাকড়ের মুখে আশাকর্মীরা রাস্তায়, ট্রেন লাইনে বসে পড়েছেন। তাতে যানচলাচল ব্যাহত হয়েছে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। অতএব আশঙ্কা হয়, জেলায় জেলায় পুলিশের বাধা দেওয়ার প্রধান কারণ, ন্যায়প্রার্থী মানুষদের ‘রাজনৈতিক বিরোধী’ এবং ‘আইনভঙ্গকারী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া। এই কৌশলে সরকারের লাভ— নাগরিকের দাবিগুলি ন্যায্য কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় এড়ানো যায়। সরকারের অপারগতা, তার ভ্রান্তি-বিচ্যুতি স্বীকার করার অস্বস্তি দায় এড়ানো যায়। তাই বার বার প্রশাসন তার ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ চেহারা দেখিয়ে প্রতিবাদীদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। প্রশ্নগুলি কিন্তু রাস্তাতেই থেকে যায়— কেন রাতের শহর মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়, কেন যোগ্য শিক্ষকদের তালিকা বার করতে এত বিলম্ব, কেন মিড-ডে মিল কর্মীরা ন্যূনতম মজুরি পান না? আশাকর্মীদের প্রশ্নগুলিও নির্দিষ্ট, ন্যায়সঙ্গত। কঠোর পরিশ্রম ও দায়িত্বপূর্ণ কাজের পরেও আশাকর্মীরা সরকারের চোখে ‘কর্মী’ বলে স্বীকৃতি পাচ্ছেন না কেন, কেন তাঁদের বেতন বকেয়া থাকছে, কেন মাতৃত্বের ছুটি দেওয়া হচ্ছে না— এ প্রশ্নগুলির সারা ভারতেই আশাকর্মীরা তুলেছেন। কেবল আন্দোলনকারী নয়, সমগ্র নাগরিক সমাজের কাছেই এ বিষয়ে নিজের অবস্থান জানাতে রাজ্য দায়বদ্ধ।

এ কথা ঠিক যে, যে কোনও সরকারের সাধ্য সীমিত, কিন্তু নাগরিকের চাহিদা অসীম। প্রতি দিনই নানা অন্যায়ের প্রতিকার, অপ্রাপ্তির ক্ষোভ উঠে আসে প্রশাসনের কাছে, শাসক দলের কাছে। নাগরিকের ন্যায়ের প্রত্যাশা, যথাযোগ্য প্রাপ্তির দাবিগুলিকে কোনও একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্তের দিকে চালিত করার কুশলতা প্রশাসনিক দক্ষতার অন্যতম পরিচয়। নাগরিক আর প্রশাসনের সংযোগের পথ আটকে দেয় পুলিশের ব্যারিকেড। পুলিশের লাঠি প্রশাসনের প্রতি সন্দেহ, অনাস্থার জন্ম দেয়। যাঁরা শিশু ও মায়ের প্রাণের সুরক্ষা নিশ্চিত করেন, সেই আশাকর্মীরা যদি নিজেদের অসুরক্ষিত মনে করেন, তা গোটা রাজ্যের লজ্জা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন