ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল মাকরঁ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছবি: রয়টার্স।
যখন বিশ্ব রাজনীতি আরও বেশি চাপ এবং অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, তখন এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ভারত এবং ফ্রান্স আরও গভীর সহযোগিতার পথই বেছে নিয়েছে। দীর্ঘ কাল ধরে ফ্রান্স ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদারদের অন্যতম, যে সম্পর্ক গত এক বছরে নতুন গতি অর্জন করেছে। প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি, স্বাস্থ্য— দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আজ বিবিধ ক্ষেত্রে ব্যাপ্ত। সহযোগিতার এই উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিকে ‘স্পেশ্যাল গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এ উন্নীত করেছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ-র সাম্প্রতিক ভারত সফরকালে উভয় পক্ষ মোট ২১টি চুক্তি স্বাক্ষর করল, যার অন্যতম ভারতীয় এবং ফরাসি সংস্থার মধ্যে ভারতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের একটি যৌথ উদ্যোগ। পাশাপাশি কর্নাটকের ভেমাগাল-এর মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতায় উড়তে সক্ষম বিশ্বের প্রথম হেলিকপ্টার এইচ-১২৫’এর ‘ফাইনাল অ্যাসেম্বলি লাইন’ (কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপ)-এর উদ্বোধন করলেন দুই রাষ্ট্রনেতা। পরবর্তী কালে এই হেলিকপ্টার বাকি বিশ্বে রফতানি করতে চায় ভারত।
তবে বৃহত্তর ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের গভীর ভিত্তি নির্ভর করছে ভারতের জন্য ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য ৪০০০ কোটি ডলারের চুক্তির বিশদ বিবরণের উপর, যা ডিফেন্স অ্যাকুইজ়িশন কাউন্সিল (ডিএসি) ফরাসি প্রেসিডেন্টের সফরের ঠিক আগে অনুমোদন করেছে। লক্ষণীয়, ২০১৬ সালে কেনা ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান এবং গত বছর নৌ-বাহিনীর জন্য ভারত যে ২৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার জন্য চুক্তি করেছিল, তার অতিরিক্ত সাম্প্রতিক চুক্তিটি। এই ১১৪টির মধ্যে ১৮টি তৈরি অবস্থায় পাবে ভারত। বাকিগুলি তৈরি হবে এ দেশেই, বিদেশের সঙ্গে ভারতীয় প্রযুক্তিও ব্যবহার করে। সে ক্ষেত্রে দেশের বেসরকারি সংস্থাগুলির এই বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা থাকার কথা, যা কেন্দ্রীয় সরকারের ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করবে। শুধু তা-ই নয়, ফ্রান্সের এই সহযোগিতা প্রধান সামরিক সরবরাহকারী হিসেবে রাশিয়ার উপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা আমদানিতে বৈচিত্রও বাড়াতে পারে।
প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন বর্তমানে যে কোনও দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি। ভারত-ফ্রান্স উদ্ভাবন বর্ষের সূচনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ এবং উন্নত উপকরণের ক্ষেত্রে দুই তরফের সহযোগিতার অঙ্গীকার এই স্বীকৃতির ইঙ্গিতবাহী যে আজকের কৌশলগত প্রতিযোগিতা যতটা প্রযুক্তিগত, ততটাই আঞ্চলিক। বলা বাহুল্য, আমেরিকা-চিন প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহে, এই ধরনের সহযোগিতা উভয় দেশের পক্ষেই সুসংবাদ। জানুয়ারিতে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ়-এর ভারত সফর, এই বছরের প্রজাতন্ত্র দিবস উদ্যাপনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর নেতৃত্বের উপস্থিতি এবং দীর্ঘ দিন ধরে আলোচিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর ভারতের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় ইউরোপের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরই প্রতিফলন। এমন এক সময়ে যখন ভারতও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির সূক্ষ্ম বিষয়গুলি নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে দর কষাকষিতে লিপ্ত, তখন এই সংযোগ দিল্লির কাছে অমূল্য প্রমাণিত হতে পারে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে