রাজ্যবাসীকে আশ্বস্ত করতে পূর্বতন সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি চালু রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই প্রকল্পগুলির একটি প্রধান লক্ষণ ছিল সর্বজনীনতা। খাদ্যসাথী, লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, কৃষকবন্ধু প্রভৃতি প্রকল্পের কিছু প্রাথমিক শর্ত অবশ্যই ছিল, কিন্তু শেষ বিচারে প্রাপক নির্ধারিত হয়েছে ‘স্বনির্বাচন’-এর ভিত্তিতে। তাতে অযোগ্যদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ উঠেছে অবশ্যই। কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করিয়েছেন, কেবল রোজগারের তারতম্যে সব রকম বৈষম্য-বঞ্চনা ধরা পড়ে না। সম্পন্ন পরিবারেও মহিলারা নিজস্ব টাকার অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, অসম্মানিত হন। কাগুজে প্রমাণের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও প্রকল্পের লক্ষ্যপূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জমির নথি না থাকায় ভূমিহীন চাষি বঞ্চিত হন সরকারি সহায়তা থেকে, ভর্তুকি-অনুদানের গুড় খেয়ে যান ব্যবসাজীবী বা চাকরিজীবী জমির মালিক। দ্বিতীয় সমস্যাটি প্রশাসনিক— ‘যোগ্য’ প্রাপকের তালিকা তৈরি করতে গেলে প্রায়ই বাস্তবিক দাবিদার বাদ পড়েন, তালিকায় জায়গা জুড়ে বসেন প্রভাবশালীরা। দলীয় সমর্থনের শর্তও ছায়া ফেলতে চায় সরকারি তালিকাতে। দুর্নীতি এবং অপচয় প্রতিরোধ করা অবশ্যই সরকারের কাজ, কিন্তু মনে রাখতে হবে সাধারণ মানুষের বিপন্নতার বহুমাত্রিকতা। একমুখী, একমাত্রিক শর্তের আরোপ জনকল্যাণের পরিপন্থী হতে পারে।
কেন্দ্রীয় প্রকল্পের রূপায়ণের ক্ষেত্রেও একই ভাবে সতর্ক থাকতে হবে। নাবালিকা বিবাহ, গর্ভধারণ সরকারের চোখে অপরাধ, তাই নাবালিকা মায়েদের ও তাদের শিশুদের সরকারি স্বাস্থ্য, পুষ্টি প্রভৃতি প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকার বাইরে রাখা হচ্ছে। তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে এই ভয়ানক সঙ্কটকে খারিজ করতে চেয়েছে তৃণমূল সরকার। ডিজিটাল তথ্যের উপরে অতিরিক্ত নির্ভরতা সেই অন্যায়কে আরও গভীর করতে পারে। গর্ভবতী মহিলাদের জন্য ‘প্রধানমন্ত্রী মাতৃবন্দনা যোজনা’-র মতো প্রকল্পকে রাজ্যে রূপায়ণের সময়ে তাই সতর্ক থাকা দরকার। যেখানে চাহিদা, সেখানে পৌঁছতে কী কৌশল নিতে হবে, তা সহানুভূতি এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে স্থির করতে হবে রাজ্যকে। সমস্যাগুলিকে অস্বীকার করলে অন্যায় হবে। কেবল নতুন প্রকল্পের ঘোষণা নয়, সামগ্রিক ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। অর্থ এবং কর্মীর অভাবে এ রাজ্যের অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি ‘খিচুড়ি ইস্কুল’-এ পরিণত হয়েছে। অবিলম্বে এই ব্যবস্থাটির সংস্কার ও উৎকর্ষসাধন দরকার। জাতীয় শিক্ষা নীতি (২০২০)-তে প্রাক্-প্রাথমিক স্তরের শিশুদের শিক্ষার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হলেও, এ রাজ্যে সেই ব্যবস্থা কাজ করছে না— না অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে, না স্কুলগুলিতে। কর্মনিযুক্ত মায়েদের সন্তানদের দেখাশোনার জন্য কেন্দ্রের ‘পালনা’, ‘মোবাইল ক্রেশ’ প্রকল্পগুলিকে এ রাজ্যে এখনই শুরু করা দরকার।
রাজ্য-কেন্দ্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পশ্চিমবঙ্গ বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা পায়নি। পানীয় জল, আবাস, স্বাস্থ্য বিমা, মৎস্যজীবী, হস্তশিল্পী ও কারিগরদের সহায়তার কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি যথার্থ প্রাপকদের কাছে পৌঁছতে হবে। অগ্রাধিকার প্রাপ্য গ্রামীণ রোজগারের প্রকল্পের। ২০২১ সাল থেকে মনরেগা বন্ধ থাকার জন্য গ্রামীণ মজুরি নিম্নমুখী হয়েছে, দ্রুত বেড়েছে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা। কেন্দ্রের নয়া প্রকল্প, ভিবি-জিরামজি-র রূপায়ণ পশ্চিমবঙ্গে অত্যন্ত প্রয়োজন। সেই সঙ্গে মনরেগা-র বকেয়া টাকা মেটানো দরকার। কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের হিসাব অনুসারে তিন হাজার কোটি টাকা প্রাপ্য পশ্চিমবঙ্গের। মনরেগা-র বকেয়া মেটানোর জন্য এ বছর কেন্দ্রীয় বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অতএব পশ্চিমবঙ্গের শ্রমজীবী, দরিদ্র মানুষের দীর্ঘ দিনের প্রাপ্য (অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা) তাঁদের হাতে তুলে দিয়ে যাত্রা শুরু করতে পারে বিজেপি সরকার। তাতে নতুন শাসকের প্রতি রাজ্যবাসীর আস্থা শক্ত হবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে