বারো বছর, একটি যুগ: প্রাচীন ধারণাটি অধুনা হয়তো অলঙ্কারে পর্যবসিত হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতের গত বারো বছর কিন্তু অবশ্যই এক যুগান্তর— আলঙ্কারিক অর্থে নয়, সত্যতম অর্থে। ২০১৪ থেকে ২০২৬, বারো বছরে ভারত নামক দেশটির পরিবর্তনের মাত্রা, মান, এবং পরিবর্তন-কক্ষপথের দ্রুততা, দুই-ই কল্পনাতীত। অবশ্যই দেশের এই সামূহিক পরিবর্তনের জন্য কেন্দ্রীয় শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি এবং সেই শাসনের নেপথ্য কারিগর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বিরাট কৃতিত্বের দাবিদার। এ দাবি কেবল রাজনৈতিক নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এবং এক গুরুতর অর্থে— আস্তিত্বিক— পরিবর্তনের। হিন্দু ভারত প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে এই বারো বছরের অক্লান্ত শ্রমে, যত্নে ও কৌশলে, যে ভারতের অংশ এখন বাইশটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, ২০১৪-য় যা ছিল মাত্র সাত। বুঝতে অসুবিধা হয় না, কেন বিজেপি ও আরএসএস বারো বছর পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এ দেশে দীর্ঘতম প্রধানমন্ত্রিত্বের শিরোপাটিও হিন্দু ভারত শিরোমণি নরেন্দ্র মোদীকেই অর্পণ করতে উদ্যত। এর আগে দীর্ঘতম কাল, ষোলো বছর, প্রধানমন্ত্রী থাকার কৃতিত্ব ছিল প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর। কিন্তু স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েকটি বছর তিনি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। অবশ্যই উত্তর-উপনিবেশ কালের ইতিহাসে কোনও দেশই নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পায়নি, যে সব স্বাধীন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে, তাদের প্রথম নির্বাচন অবধি পৌঁছতে স্বভাবতই কিছু সময় লেগেছে। আন্তর্জাতিক প্রথায় কখনওই প্রধানমন্ত্রিত্বের বিচারে সেই মধ্যকালীন বছরগুলি বাদ দিয়ে হিসাব হয় না। তবে যুগান্তরের ভারতে এখন ইতিহাসের যুক্তি, তথ্য ও প্রথার জায়গায় সবল দাবির জোর বেশি। তা ছাড়া, স্বাধীন ভারতের সর্বাপেক্ষা দ্রুত পরিবর্তনশীল সময় হিসাবে মোদী-যুগ এমনিতেই ইতিহাসে অনস্বীকার্য স্থান করে নিয়েছে।
এই যুগকে কে কী ভাবে দেখবেন, তা নির্ভর করছে কোথা থেকে দেখা হচ্ছে, তার উপর। এই যেমন, ২০১৪ সালে ক্ষমতারোহণের পর প্রথমেই ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’-এর ‘মন্ত্র’ পরবর্তী কালে প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহে বেড়ে দাঁড়ায় ‘সবকা বিশ্বাস ও সবকা প্রয়াস’-এ। সেই প্রতিশ্রুতিবিন্দু থেকে দেখলে আজকের ‘ককরোচ’ আন্দোলনই বলে দেয় সাফল্য কতখানি অধরা। গভীর অর্থনৈতিক অস্থিতি ও কর্মসংস্থানের অভাব এখন দেশের সর্ববৃহৎ সঙ্কট। সাত শতাংশ উন্নয়নের দাবি অসার, বলছেন বিশেষজ্ঞরা, যার মধ্যে আছেন মোদী-আমলের প্রাক্তন ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক গভর্নর রঘুরাম রাজনও। ‘বিকাশ’ বা ‘প্রয়াস’-এর অবকাশ তাই নেহাত কম। ও-দিকে ‘সবকা সাথ’ অংশটি নিয়ে হয়তো বিজেপি নেতা-মন্ত্রীরাই এগোতে চাইবেন না। যদিও সমাজের অনগ্রসর অংশের জন্য আপাতভাবে বহু যোজনা ও নগদ অর্থ প্রকল্প চালু হয়েছে, গত এক যুগে দেশের অগণিত ঘটনায় স্পষ্ট, এবং পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিজেপি-বিজয়ের পর প্রতিষ্ঠিত, যে সেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে দেশের সংখ্যালঘু ও পশ্চাৎপদ সমাজের স্থান কেবলই প্রান্তিক।
গত এক যুগে বিশ্বের নিরিখে ভারত কোথায় এসে দাঁড়াল? সন্দেহ হয়, এ ক্ষেত্রেও আলো কমে আসছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক সাফল্যের পর ভারতের সঙ্গে নিকট প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্রমাগত অবনমন ঘটেছে, এবং প্রধান বিশ্বশক্তিসমূহের সঙ্গে সম্পর্কে দিল্লির নিয়ন্ত্রণ কমেছে। এই মুহূর্তে বিশ্ব-কূটনীতিতে ভারত যথেষ্ট একাকী। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ও বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত-তিক্ততা দেশকে ঠেলে দিচ্ছে উদ্বেগের মধ্যে। তবে ভারত ভূরাজনৈতিক ভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ, শেষ অবধি বহির্দেশীয় উদ্বেগ থেকে হয়তো উদ্ধার মিলতেও পারে। কিন্তু দেশের মধ্যেকার উদার গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রটি যুগান্তরের ভারতে যে ভাবে ধ্বস্ত হয়েছে, তার থেকে পুনরুদ্ধারের আশা দূর অস্ত্।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে