জন্ম নেওয়া নারীর অধিকার জন্ম না-নেওয়া ভ্রূণের চেয়ে অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, জন্মের পরই মানবাধিকার স্বীকৃত হয়, গর্ভধারণের মুহূর্তে নয়— এই অমোঘ সত্যটি আরও এক বার পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সামনে দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দিল্লি হাই কোর্টের ভূমিকাটি প্রশংসার্হ। আদালতের এ-হেন পর্যবেক্ষণটি যে মামলার পরিপ্রেক্ষিতে, সেখানে সম্ভাব্য বিবাহবিচ্ছেদের চিন্তা করে ১৪ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে গর্ভপাত করিয়েছিলেন। এই পদক্ষেপের জেরে স্বামী তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন। সম্প্রতি উচ্চ আদালত সেই মামলাটিই খারিজ করে জানিয়েছে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ অনুযায়ী প্রজনন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ। এই রায়ের মধ্য দিয়ে এক দিকে যেমন প্রতিষ্ঠা হল যে গর্ভপাতের অধিকারের সঙ্গে মানবাধিকারের কোনও সংঘাত নেই, তেমনই নিজ দেহের উপর মেয়েদের অধিকারটিও নিঃসংশয়ে প্রতিষ্ঠিত হল।
গর্ভপাতের অধিকার শুধুমাত্র মাতৃত্বের অধিকারই নয়, নারীর অধিকারটিকেও প্রতিষ্ঠিত করে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নানা অছিলায় যা কুক্ষিগত রাখতে চায়। এ ক্ষেত্রে অন্তত আইনের দিক থেকে বিশ্ব মানচিত্রে ভারতের অবস্থানটি উজ্জ্বলতর। আমেরিকার অন্তত ১৭টি প্রদেশে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া গর্ভপাতে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমনকি গর্ভাবস্থার জটিলতার ক্ষেত্রেও গর্ভপাতে অনুমতি না মেলায় সংক্রমণে প্রসূতির প্রাণসংশয় ঘটেছে, সে উদাহরণও অনেক। ভ্রূণের বয়স চব্বিশ সপ্তাহ পেরোনোর পর গর্ভপাত করলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে গণ্য হত ব্রিটেনে। সম্প্রতি সেই আইন বাতিলের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট। যদিও এই সংশোধনীতেও ২৪ সপ্তাহের বেশি বয়সি ভ্রূণের গর্ভপাতে সহায়তাকারী চিকিৎসক এবং চিকিৎসাকর্মীদের বিচারের ব্যবস্থাটিকে অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে বলে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কিন্তু ভারত সেই পথে হাঁটেনি। প্রসঙ্গত, এ দেশে ২০২১ সালের ‘মেডিক্যাল টার্মিনেশন অব প্রেগন্যান্সি (সংশোধিত) আইন’ অনুযায়ী, গর্ভপাতের সময়সীমা কুড়ি সপ্তাহ থেকে বৃদ্ধি করে চব্বিশ সপ্তাহ করা হয়েছিল। এবং এ ক্ষেত্রে বিবাহিত ও অবিবাহিতদের মধ্যে যে পার্থক্য ছিল, তা তুলে দিয়ে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক নারীকেই সুরক্ষিত গর্ভপাতের অধিকার দেওয়া হয়েছিল। তার পরেও মায়ের প্রাণের ঝুঁকি থাকলে বা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ কারণে গর্ভপাত আইনসিদ্ধ— এমনটিও বলা হয়েছে।
কিন্তু আইন ও বাস্তবের মধ্যে পার্থক্যটিও এ দেশে উপেক্ষণীয় নয়। নারীর মা হওয়ার ইচ্ছা বা অনিচ্ছা— অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চায় এ দেশের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। এ দেশের আইনে নারীর নিরাপদ ও আইনসঙ্গত গর্ভপাতের অধিকার নিশ্চিত করার যে অভিপ্রায়টি রয়েছে, তা-ই বা কত দূর মানা হয়? পুত্রসন্তানের আশায় পরিবারের চাপে হাতুড়ে, বেআইনি গর্ভপাতের ক্লিনিকে মায়েদের ভিড় বাড়ে, শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যহানির ঝুঁকিকে সঙ্গী করেই। সমাজের যে স্তরটিতে নারী এখনও পুরুষের ইচ্ছার চাপে বলিপ্রদত্ত, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রের বাইরে তার কোনও সত্তা স্বীকৃত নয়, সেই স্তরটিতে ভারতীয় আইন এবং আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি প্রবেশ করতে পারেনি। তার অপেক্ষায় ভারতীয় নারীসমাজ।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে