২০২৬ সালে দুই রাজ্যের বিধানসভা ভোটপর্ব— পশ্চিমবঙ্গ ও অসম— দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যে গভীর অন্তর্লীন সাদৃশ্যটি আবার স্পষ্ট করে দিয়ে গেল। দু’টি রাজ্যই বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন। দু’টি রাজ্যেই সীমান্ত-পারাপার সাম্প্রতিক রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। স্বাধীনতা ও দেশভাগের অনেক আগে থেকেই পূর্ব ভারতের জনবিন্যাসের বিশেষত্বের কারণে দু’টি রাজ্যেই সংখ্যালঘু মুসলমান সমাজ জনসংখ্যায় বড় স্থান অধিকার করে। দুই রাজ্যেই অনুপ্রবেশ স্লোগানের উপর ভর করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির দ্রুত উত্থান ও ক্ষমতালাভ। সাম্প্রতিক নির্বাচনে দুই রাজ্যেই ভারতীয় জনতা পার্টি বিপুল ভাবে জয়ী, যদিও তফাত এই যে পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথমই তাদের ক্ষমতারোহণ, আর অসম ২০১৬ সাল থেকে হিন্দুত্ব-রাজনীতির শাসনাধীন থেকে এ বার পেল তার তৃতীয় বিজেপি সরকার। জনগণনা না হয়েও দুই রাজ্যেই জনসংখ্যা ও জনবিন্যাস রাজনীতির তীব্র বিষাক্ত ঘূর্ণিপাক তৈরি করে তুলেছে, অসমে যার মূল কেন্দ্র জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি, আর পশ্চিমবঙ্গে মূল বিষয় বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর। অসমে বিরাট বাঙালি জনসংখ্যার উপস্থিতি সে রাজ্যের রাজনৈতিক-সামাজিক সঙ্কটের কারণ। এই সব দিক দিয়ে দুই রাজ্যের মধ্যে এক ঘনিষ্ঠ রাজনীতিসূত্র সব সময়েই ক্রিয়াশীল। তবে এই বার বিধানসভা ভোটের পর দুই রাজ্যের রাজনৈতিক সান্নিকট্য আরও বিশেষ লক্ষণীয় হয়ে উঠল।
তবে এই সাদৃশ্যমালার মধ্যেও দুই রাজ্যের যথেষ্ট দূরত্ব থেকে যাবে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে, এমন আশাও রইল। এ কথা হচ্ছে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার গত শাসনকালের শেষ পর্বের কার্যধারার সূত্রে। গত কয়েক মাসে সমগ্র ভারতে তিনি একটি উল্লেখযোগ্য নাম হয়ে উঠেছেন তাঁর তীব্র সংখ্যালঘু-বিদ্বেষী বক্তব্যের কারণে। বরাবরই তাঁর সংখ্যালঘু-বিরোধিতার তারটি অত্যুচ্চ স্বরে বাঁধা, কিন্তু এ বারের নির্বাচনী প্রচারে তিনি নিজেকেও ছাপিয়ে গিয়েছেন। এমন সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কথা বলেছেন, যা প্রত্যক্ষত অসাংবিধানিক। ‘মিঁয়া’ অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে আগত অনুপ্রবেশকারী মুসলমানদের লক্ষ করে বিদ্বেষভাষণ দিতে গিয়ে বারংবার সে রাজ্যের সমস্ত সংখ্যালঘুকে আক্রমণ করার নিদান দিয়েছেন। রাষ্ট্রের তরফে শুরু হওয়া ভোটার তালিকা সংশোধনকে তাদের সমাজকে লক্ষ্য করে ব্যবহার করার কথা বলেছেন। এ সব কথার প্রেক্ষিতে সর্বভারতীয় স্তরে বিরোধী নেতারা আপত্তি তুলেছেন। সেই প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার আচরণে বা বাগধারায় কোনও পরিবর্তন আসেনি: বরং নিজ রাজ্যে তিনি বিপুলতর জনপ্রিয়তায় ভূষিত হয়েছেন। নির্বাচনী জনসভায় এবং শেষ অবধি নির্বাচনী লড়াইতে তিনি সেই জনপ্রিয়তার অভ্রান্ত স্বাক্ষর রেখেছেন। নির্বাচনের পর এ কথা নিঃসংশয় যে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ও ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের যে গ্রহণযোগ্যতা, তার সঙ্গে এখন পাল্লা দেওয়ার দক্ষতা অর্জন করেছেন অসমের হিমন্তবিশ্ব শর্মা।
দক্ষতা ও নৈতিকতা এক বস্তু নয়, প্রশাসকের নৈতিকতা অবহেলার বিষয়ও নয়। তাই অসমের মুখ্যমন্ত্রী শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানেই পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে জড়িয়ে ধরে যে ছবি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করলেন, তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিপন্ন করতেই পারে। লক্ষণীয়, কিছু বিক্ষিপ্ত অশান্তি সংঘর্ষ ও দলীয় হিংসা বাদ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মিশ্র সমাজ এখনও মোটের উপর শান্তিপূর্ণ। উদ্বেগ ও আতঙ্ক, উস্কানিমূলক ছবি, বার্তা যাতে না ছড়ানো হয়, তা দেখা জরুরি। ইতিমধ্যে বিজেপি রাজ্যসভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্টোচ্চারণে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক শান্তি রক্ষার উপর জোর দিয়ে রাজ্যবাসীর বিশেষ ধন্যবাদার্হ হয়েছেন। নবগঠিত সরকারকেও মনে রাখতে হবে, শান্তি-স্থিতি ছাড়া আইন-শৃঙ্খলার শাসন বা উন্নয়ন, কোনওটিই অর্জনযোগ্য নয়।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে