ভারতে কত মানুষ গরিব? বিশ্ব ব্যাঙ্কের একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট (২০২৪-২৫) বলছে, ভারতে চরম দারিদ্র (‘একস্ট্রিম পভার্টি’) অনেকটাই কমেছে। দৈনিক ৩ আমেরিকান ডলার বা তারও কম ব্যয়ক্ষমতায় বেঁচে রয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ (২০১১-১২) থেকে নেমেছে ৫.৩ শতাংশে (২০২২-২৩)। এই হিসাবে সাড়ে সাত কোটি ভারতীয় এখন দারিদ্রসীমার নীচে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, দারিদ্র মাপার এই পদ্ধতি কি ঠিক? দৈনিক ৩ ডলারের দারিদ্রসীমা কোনও মতে বেঁচে থাকাকে বোঝায়, তাই একে দারিদ্রের সংজ্ঞা ধরলে এমন বহু মানুষ বাদ পড়ে যাবেন, যাঁদের যথেষ্ট আহার জোটে না, আবাস নেই, শিক্ষা বা চিকিৎসার নাগাল যাঁদের নেই। অসুস্থতা, কর্মহীনতা বা মূল্যবৃদ্ধির জন্য যে কোনও মুহূর্তে তাঁরা ফের চরম দারিদ্রে পিছলে যাবেন। এঁদের ‘দরিদ্র’ বলে না ধরলে দেশ কী করে দারিদ্রের প্রকৃত ছবি তৈরি করতে পারবে? গরিব মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় দারিদ্রের সংজ্ঞা এক রকম— বর্ধমানের বিঘড়া-বামুনিয়ার গ্রামবাসীরা গ্রাম উন্নয়নের পরিকল্পনা (২০০২) করতে গিয়ে স্থির করেছিলেন, যে পরিবারের প্রত্যেক দিন পেট ভরে খাবার নিশ্চয়তা আছে, এবং স্নান করে উঠে পরার মতো অন্তত আর এক প্রস্ত শুকনো কাপড় রয়েছে, সেই পরিবারকে দারিদ্রসীমার উপরে বলা যেতে পারে। কিন্তু অর্থনীতিতে এমন সংজ্ঞা চলে না, সেখানে প্রয়োজন সংখ্যা। বিশ্ব ব্যাঙ্ক নানা মাপ ধরে গরিবের নানা সংখ্যা নির্ণয় করেছে। যেমন, ভারতের মতো নিম্ন থেকে মধ্য আয়ের দেশের ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য পরিমাপ হল দৈনিক ৪.২০ ডলার ব্যয়ক্ষমতা। তা দিয়ে বিচার করলে জনসংখ্যার ২৩.৯ শতাংশই দরিদ্র। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, তা হলে গরিবের সংখ্যা ৭.৫ কোটি, না কি ৩৪.২ কোটি? কোন সংখ্যাটি ভারতে দারিদ্রের প্রকৃত চিত্রকে তুলে ধরে?
দরিদ্রের সংখ্যা নিয়ে সংশয়ের তত গুরুত্ব থাকত না, যদি না কেন্দ্রীয় সরকার মানুষের আয় কিংবা ব্যয়ক্ষমতা ধরে দারিদ্র নিরূপণের কাজটি এড়িয়ে যেত। এখন দারিদ্রের বহুমাত্রিক সূচকের (মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি ইন্ডেক্স) ভিত্তিতে তথ্য জোগাচ্ছে সরকার। গত দু’বছরে লোকসভা এবং রাজ্যসভায় দরিদ্রের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বহু বার প্রশ্ন উঠেছে। সরকার হয় নিরুত্তর থেকেছে, না হলে জানিয়েছে যে দারিদ্র মাপতে বহুমাত্রিক সূচকটিই কেবল ব্যবহৃত হচ্ছে। বহুমাত্রিক সূচকটি জরুরি, কারণ তা দিয়ে বোঝা যায় যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাস, শৌচাগার-সহ মৌলিক পরিষেবাগুলি মানুষ কতখানি ব্যবহার করছেন। এর ফলে নীতি তৈরির কাজে সুবিধে হয়, কারণ সরকার বুঝতে পারে কারা এই সুবিধাগুলো থেকে বাদ পড়ছেন, কেন বাদ পড়ছেন। কিন্তু অর্থের অঙ্কে, অর্থাৎ আয় বা ব্যয়ক্ষমতার নিরিখে দারিদ্রকে মাপার প্রয়োজন থেকেই যায়। কত জন স্কুলে যেতে পারছে, ক’টা বাড়িতে শৌচাগার রয়েছে, এমন সব প্রশ্নের উত্তর থেকে বোঝা যাবে না যে নিজের দৈনন্দিন চাহিদাগুলি মেটানোর মতো খরচের সামর্থ্য রয়েছে কত জনের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক সূচকের প্রয়োজন দারিদ্র সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য জানতে। কোনও সূচক অপর একটি সূচকের বিকল্প হতে পারে না। অতএব ব্যয়ক্ষমতা-ভিত্তিক দারিদ্র পরিমাপকে এড়ানো উচিত নয়। ইতিপূর্বে পারিবারিক ভোগব্যয় সমীক্ষা (এইচসিইএস) নিয়মিত প্রকাশিত হত, এবং তার ভিত্তিতে দারিদ্র নিরূপণ হত। আক্ষেপ, ওই সমীক্ষার তথ্য বহু দিন হাতে আসেনি। সাম্প্রতিকতম সমীক্ষা (২০২২-২৩) প্রকাশিত হলেও, তার ভিত্তিতে দরিদ্রের অনুপাতটি জানা যায়নি। শেষ প্রকাশিত তথ্য (২০১১-১২) অনুসারে ভারতে দরিদ্র ২৭ কোটি, যদিও সরকার বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে খাদ্যশস্য দিচ্ছে ৮১ কোটি মানুষকে। এমন নানা সংখ্যা সাধারণ মানুষের কাছে ভারতে দারিদ্রের ছবিকে ঝাপসা করে দিতে চায়। সত্য বস্তুটি সরকারকে বিব্রত করতে পারে, তাই সংখ্যার এত কারসাজি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে