একটি ইউনেস্কো-র স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’-এর উন্নয়নের প্রশ্নকে ঘিরে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে রাজনৈতিক তরজা— নতুন বছরের গোড়ায় সুন্দরবনের পরিস্থিতি আপাতত এমনটাই। সম্প্রতি সুন্দরবনের গোসাবায় ‘জাতীয় ব্যাঘ্র সংরক্ষণ প্রকল্প’ এবং ‘প্রোজেক্ট এলিফ্যান্ট স্টিয়ারিং কমিটি’র বৈঠকে যোগ দিতে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ভূপেন্দর যাদব। তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা ভোটে ‘নির্বাচন প্রভারী’ হিসাবেও নিয়োজিত করেছে বিজেপি। সুতরাং, নির্বাচনী আঁচটিকে উস্কে দিতে সুন্দরবনেরই মাটিতে দাঁড়িয়ে রাজ্যের অন্যতম ‘প্রাকৃতিক সম্পদ’টির হালহকিকত নিয়ে যে তিনি বক্তব্য রাখবেন, তা প্রত্যাশিত ছিল। সেইমতোই তিনি রাজ্যের সমালোচনা করে বললেন, সুন্দরবনে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও রাজ্য সরকার পরিকাঠামো উন্নয়নে তৎপর নয়।
কথাটি অগ্রাহ্য করার নয়। জলে-জঙ্গলে দিন কাটে এখানকার বাসিন্দাদের। বিকল্প জীবিকার অভাবটি এখনও তীব্র। জঙ্গলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে চাষবাস, মুরগি, শুয়োর পালনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ করা হলেও প্রাকৃতিক বিপর্যয় বার বারই এখানকার রুটি-রুজিতে আঘাত হেনেছে। অধিকাংশ মানুষই তাই নদী-জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল, নয়তো ভিন রাজ্যে পরিযায়ী জীবন বেছে নিয়েছেন। উন্নয়নের দেখা নেই চিকিৎসা ক্ষেত্রেও। বাঘ, কুমির, সাপের কামড়ে জখমদের দ্রুত চিকিৎসা শুরুর অবকাশ থাকে না। বহু মৃত্যু ঘটে শুধুমাত্র এই কারণেই। তদুপরি রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সম্প্রতি যার সংখ্যা এবং মাত্রা দুই-ই লক্ষণীয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে ভেঙেছে বাঁধ, রাস্তা। আগামী দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রটি। সামুদ্রিক জলস্তর বৃদ্ধি, শক্তিশালী ঝড়ের আঘাত থেকে পশ্চিমবঙ্গকে রক্ষার ক্ষেত্রে সুন্দরবন এক প্রাকৃতিক রক্ষাকবচের কাজ করে। সুতরাং, তাকে সুস্থ রাখা অবশ্যকর্তব্য। এক দিকে সুস্থায়ী পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের মাধ্যমে এখানকার জীববৈচিত্রকে রক্ষা করা, অন্য দিকে স্থানীয়দের জীবন-জীবিকাকে সুরক্ষিত করা— উভয়ই সমান জরুরি। দুর্ভাগ্যবশত, এর কোনওটিই এখনও যথাযথ ভাবে শুরু করা যায়নি।
কিন্তু মাননীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যে অর্থে ‘উন্নয়ন’-এর প্রসঙ্গটি তুলেছেন, তা কিঞ্চিৎ গোলমেলে। উন্নয়নই লক্ষ্য হলে বিশ্ব ব্যাঙ্কের সঙ্গে রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে সুন্দরবনের পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজে কেন্দ্রীয় ছাড়পত্র পেতে এত দীর্ঘ সময় লাগে কেন? মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, সুন্দরবনে বছরে গড়ে ৯-৯.৫ লক্ষ পর্যটক আসেন, যেখানে রণথম্ভোরে সংখ্যাটি প্রায় ১৯ লক্ষ। অবশ্যই, পর্যটনের প্রসার সুন্দরবনের বাসিন্দাদের আর্থিক উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সুন্দরবনের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য রণথম্ভোর বা মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলগুলির মতো নয়। জল-জঙ্গলে ঘেরা এই অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চলে পর্যটনের প্রসার কোন মাত্রা অবধি সম্ভব, তা সর্বাগ্রে স্থির করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক আরাবল্লী পর্বত, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, কিংবা তারও আগে উত্তরাখণ্ড-হিমাচল প্রদেশে বিজেপি সরকারের বিশেষ উদ্যোগে উন্নয়নের যে অপরিণামদর্শী ‘জোয়ার’ দেখা গিয়েছে, তার ছোঁয়া থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করা জরুরি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে