India-Euprope

নতুন সম্ভাবনা

গত কয়েক বছরে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের আমেরিকা-নির্ভরতা বিপজ্জনক ভাবে বেড়েছিল। তার পরিণতি হল, আমেরিকার দরজা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ামাত্র থরহরিকম্প। ফলে, বাণিজ্যসঙ্গী হিসাবে অন্য দেশ বা অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা ছাড়া ভারতের সামনে বিকল্প নেই।

শেষ আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:৪৮
Share:

বাস্তবায়নের জন্য এখনও অনেকগুলি ধাপ পেরোতে হবে, কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তিকে ঐতিহাসিক বললে অত্যুক্তি হবে না। বাজারের আয়তনের জন্যই এই চুক্তির গুরুত্ব বিপুল— যে দু’টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে চুক্তি হচ্ছে, বিশ্বের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ২৫ শতাংশ আসে সেই অঞ্চল থেকে। ভারত থেকে রফতানি করা পণ্যের যত রকম গোত্র আছে (যাকে বলা হয় ট্যারিফ লাইন), তার ৯৭ শতাংশের ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতকে ‘প্রেফারেনশিয়াল অ্যাক্সেস’ দিচ্ছে; উল্টো দিকে, ভারতও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৯২% পণ্যকে ‘প্রেফারেনশিয়াল অ্যাক্সেস’ দিচ্ছে। ফলে, চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে দু’পক্ষের জন্যই এক বিপুল বাজার খুলবে। কিন্তু, এই চুক্তিকে প্রাথমিক ভাবে ‘ঐতিহাসিক’ করে তুলেছে বর্তমান সময়টি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে ভারতের প্রতি খড়্গহস্ত— এবং, সাম্প্রতিক শুল্ক হ্রাসের সিদ্ধান্তটিতেও স্পষ্ট যে, আমেরিকা ভারতের সঙ্গে সমানে-সমানে নয়, বরং তুলনামূলক শক্তির জায়গা থেকেই বাণিজ্য করতে চায়। এমন বাণিজ্য-সঙ্গীর উপরে অতি-নির্ভরতা ভারতের পক্ষে ভয়ঙ্কর হতে পারে। অন্য দিকে, গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত জটিলতায় তিনি দীর্ঘ দিনের অতি ঘনিষ্ট কূটনৈতিক দোসর ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও প্রবল চটিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই বিপুল বাণিজ্য চুক্তিতে আবদ্ধ হলে বিশ্বমঞ্চে যে বার্তাটি যায়, তাকে অবজ্ঞা করার উপায় স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও নেই— প্রয়োজনে আমেরিকাকে বাদ দিয়েই বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা চলতে পারে। বার্তাটি প্রেরণ করার গুরুত্বও অপরিসীম— ট্রাম্প যে ভঙ্গিতে উদার বাণিজ্যের নীতিকে ধ্বংস করে আমেরিকার আর্থিক শক্তির অপব্যবহার করতে চাইছেন, তা বৈশ্বিক ব্যবস্থার পক্ষে প্রাণঘাতী। তাঁকে সংযত করার জন্য এই পথটি তাৎপর্যপূর্ণ।

ভারতের ক্ষেত্রেও এই বাণিজ্য চুক্তি পরিবর্তনের বার্তাবহ। গত কয়েক বছরে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের আমেরিকা-নির্ভরতা বিপজ্জনক ভাবে বেড়েছিল। তার পরিণতি হল, আমেরিকার দরজা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ামাত্র থরহরিকম্প। ফলে, বাণিজ্যসঙ্গী হিসাবে অন্য দেশ বা অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা ছাড়া ভারতের সামনে বিকল্প নেই। এ বছরের অর্থনৈতিক সমীক্ষাও জোর দিয়েছে আরও বেশি উদার বাণিজ্যের পথে হাঁটার উপরে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তির পরে ভারতকে আরও নতুন সঙ্গীর সন্ধান করতে হবে। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে যে, বাণিজ্যিক সম্পর্ক মজবুততর করতে হলে শুধু বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না— কূটনৈতিক মঞ্চেও বন্ধু হওয়া প্রয়োজন। আলোচ্য উদার বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সামরিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির কথা বলেছে। এই সহযোগিতার গুরুত্ব বিপুল। বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে যদি নিজের প্রকৃত গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে আন্তর্জাতিক স্তরে কৌশলগত বন্ধুর পরিমাণ বাড়াতে হবে। সেই কাজটি সম্ভব তখনই, যখন ভারত শুধু একটি বৃহদায়তন বাজার হিসাবে নয়, দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্যবাহী একটি শান্তিকামী শক্তি হিসাবে নিজের ভূমিকার কথা বিশ্বমঞ্চে সফল ভাবে মনে করিয়ে দিতে পারবে। বর্তমান শাসকরা মনে রাখতে পারেন, ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে কূটনীতির মঞ্চে দেশের গৌরবময় অতীতকে অস্বীকার করা কোনও কাজের কথা নয়। তবে, বাণিজ্যে সাফল্য অর্জনের জন্য যে শুধু চুক্তি রূপায়ণই যথেষ্ট নয়, সে কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন। বিদেশের বাজারে ‘প্রেফারেনশিয়াল অ্যাক্সেস’ পাওয়া এক কথা, সে বাজারে সত্যই পণ্য বিক্রিতে সক্ষম হওয়া আর এক। তার জন্য ভারতকে বৈশ্বিক মঞ্চে প্রতিযোগিতার যোগ্য হয়ে উঠতে হবে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। এবং, বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে ক্রমশ উপরের দিকে উঠতে হবে। সেই চেষ্টা শুরু করতে হবে এখনই।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন