Kaliachak Incident

গুরু দায়িত্ব

ই মুহূর্তে রাজ্যের অধিকাংশ প্রশাসনিক উচ্চপদেই যে-হেতু নির্বাচন কমিশন দ্বারা সদ্য-নিযুক্ত নতুন ব্যক্তিরা অধিষ্ঠিত, ফলত পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন স্বভাবোচিত ভাবেই নিজের দায় স্বীকার করতে নারাজ।

শেষ আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৭
Share:

মালদহে ভোটার তালিকা থেকে ‘নাম বাদ পড়ার’ প্রতিবাদে বিক্ষোভ স্থানীয় বাসিন্দাদের। — ফাইল চিত্র।

এ বারের রাজ্য বিধানসভা ভোটের অতি-ঘটনাবহুল সময়েও কালিয়াচক একটি বিশেষ উদ্বেগের মুহূর্ত হয়ে রইল। ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিচারবিভাগের সুরক্ষা একটি অতি সংবেদনশীল বিষয়। পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন কি এই গোড়ার কথা বিস্মৃত হয়েছিল? হলে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক— বিশেষত যখন পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়ার ষাট লক্ষ ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের বিষয়ে সিদ্ধান্তগ্রহণের ভার বিচারবিভাগের কর্তাদের উপর ন্যস্ত করার সময়ে সর্বোচ্চ আদালত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিল যে, কর্তব্যরত বিচারকদের সুরক্ষার জরুরি দায়িত্বটি রাজ্য প্রশাসনকে নিতেই হবে। তা সত্ত্বেও কী ভাবে মালদহের কালিয়াচকে গত বুধবার এমন ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটতে পারল, যেখানে টানা নয় ঘণ্টা বিডিও অফিসে এসআইআর-এর কাজে নিযুক্ত সাত পুরুষ-মহিলা বিচারককে আটকে রাখা হল, এবং গভীর রাতে তাঁরা বার হওয়ার সময়ও গাড়ির উপর অবিশ্রান্ত আক্রমণ চলল? অমার্জনীয় এবং কঠোর শাস্তিযোগ্য এই ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের তীব্র ভর্ৎসনা শোনা গিয়েছে, বেশ কিছু প্রশাসনিক আধিকারিকের উপর শো-কজ় নির্দেশ আরোপিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে এখন তদন্তের ভার, সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে। এই আক্রমণ বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের উপর ঘটেছে, কেবল সেটুকুই তো নয়। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশক্রমে তাঁরা কাজ করছিলেন— ফলত আক্রমণের গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।

নির্বাচন সমাগত, এই মুহূর্তে রাজ্যের অধিকাংশ প্রশাসনিক উচ্চপদেই যে-হেতু নির্বাচন কমিশন দ্বারা সদ্য-নিযুক্ত নতুন ব্যক্তিরা অধিষ্ঠিত, ফলত পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন স্বভাবোচিত ভাবেই নিজের দায় স্বীকার করতে নারাজ। স্পষ্টতই, নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। ফলে এসআইআর-এর কাজ করতে গিয়ে বিচারকরা বিপদে পড়লে কমিশন অবশ্যই দায় এড়াতে পারে না— তাদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তবে, শেষ অবধি বিষয়টি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, তাই রাজ্য সরকারের সতর্কতাও বাঞ্ছনীয়। এই অতীব বিপজ্জনক হিংসা-তাণ্ডব কিন্তু সমগ্র রাজ্যেরই স্বার্থবিরোধী হয়ে উঠতে পারত, নির্বাচনের ঠিক আগে জনক্রোধের এ-হেন প্রকাশ গোটা রাজ্যকেই বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারত। সংখ্যালঘু-সম্প্রদায় অধ্যুষিত এই অঞ্চলটিতে এ বার এসআইআর-চলাকালীন ক্ষোভ-প্রতিবাদ সঙ্গত ভাবেই এত গভীর ও ব্যাপক যে, যে কোনও মুহূর্তে বৃহত্তর অশান্তির সম্ভাবনা মোটেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সব দিক বিচার করে রাজ্যের নাগরিক সমাজের দাবি, কেন্দ্রীয় বাহিনী নিজের কাজ সুষ্ঠু ভাবে করুক, নির্বাচন কমিশন পরিস্থিতি শান্ত ও উপদ্রববিহীন রাখার প্রয়াস করুক, রাজ্য প্রশাসনও মনে রাখুক যে প্রাক-নির্বাচনী সময়ের গুরু দায়িত্ব থেকে এক চুলও স্খলন চলতে পারে না। প্রত্যেকের সম্মেলক দায়— রাজ্যবাসীর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখা।

অবশ্যই, দায় ও দায়িত্বের প্রশ্নে রাজ্যবাসীর স্বার্থের কথাটিও উঠে আসে। কালিয়াচকের উত্তেজনা গোটা রাজ্যের পক্ষেই বিপদবার্তা, তার সঙ্গে ভোটার অধিকার বাতিল হওয়া মানুষের গভীর বিপদের বিষয়টিও বিতর্কোর্ধ্ব। তালিকা থেকে বাদ-পড়া অগণিত সাধারণ মানুষ এখন অত্যন্ত অসহায় ও নিরাপত্তারহিত বোধ করছেন। কেন তাঁরা অধিকার হারালেন, কোন পথে প্রতিকার সম্ভব, কিছুই জানা নেই, এবং নির্বাচন কমিশন এ সব প্রশ্নের উত্তরদানে নারাজ। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক স্বার্থসন্ধানীরা সুযোগ নিতে ব্যগ্র। মানুষের এই পরিব্যপ্ত অসহায়তার কথা মাথায় রেখে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আরও একটি জরুরি দাবি— নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে দায়িত্বশীল ভাবে এবং মানবিক ভাবে নিজ নিজ কর্তব্য পালন করতে হবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন