Elderly Person

শতায়ুর বিশ্ব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতেও পাঁচ জনে এক জন হবেন বৃদ্ধ, যা ‘অতি বৃদ্ধ সমাজ’-এর সংজ্ঞা। প্রায় সব দেশই বৃদ্ধদের জীবন অর্থপূর্ণ, ফলপ্রসূ করে তোলার জন্য নীতির পরিবর্তন করছে, নানা প্রকল্প শুরু করছে।

শেষ আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:২১
Share:

ঈশোপনিষদ নির্দেশ দিয়েছে, “কুর্বন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেৎ শতং সমাঃ”— কাজ করে একশো বছর বেঁচে থাকার ইচ্ছা করবে। যে উপনিষদ শুরু হয়েছে জগৎ-চরাচরে ঈশ্বরের পরিব্যাপ্তি ঘোষণা করে, তা সঙ্গে সঙ্গে মনে করাচ্ছে, তা বলে ইহজগৎ অসার নয়। আয়ু পরম প্রার্থনীয়। তবু বয়স যত বাড়ে, দেশে যত বাড়ে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা, তত ঘনিয়ে ওঠে প্রশ্ন— দীর্ঘায়ু কি আশীর্বাদ, না অভিশাপ? ২০২৫ সালে জাপানে শতায়ু মানুষের সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ ছুঁয়েছে। জাপান সরকার যে বছর শতায়ু-সমীক্ষা শুরু করেছিল, সেই ১৯৬৩ সালে শতায়ু ছিলেন ১৫৩ জন। ১৯৯৮ সালেও ছিলেন দশ হাজার। আজ জাপানে শিশুদের ডায়াপার যত বিক্রি হয়, তার বেশি বিক্রি হয় বয়স্ক মানুষদের ডায়াপার। ১৯৫০ সালে বিশ্বের একটি মাত্র দেশে (লাক্সেমবার্গ) গড়ে এক জন মহিলার সন্তানসংখ্যা ছিল দুইয়ের কম। এখন বিশ্বের অর্ধেক দেশেই তাই। ভারতেও জন্মহার দ্রুত কমছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতেও পাঁচ জনে এক জন হবেন বৃদ্ধ, যা ‘অতি বৃদ্ধ সমাজ’-এর সংজ্ঞা। প্রায় সব দেশই বৃদ্ধদের জীবন অর্থপূর্ণ, ফলপ্রসূ করে তোলার জন্য নীতির পরিবর্তন করছে, নানা প্রকল্প শুরু করছে। অবসরের বয়স বাড়িয়ে কর্মজীবন আরও দীর্ঘ করা হচ্ছে, কর্মক্ষম বয়স্কদের পুনর্নিয়োগের নানা সুযোগ তৈরি হচ্ছে। জাপানে সত্তরোর্ধ্ব মানুষদের কিছু বিশেষ ধরনের কাজে উৎসাহ দিচ্ছে সরকার— টুর গাইড, টুরিস্ট বোট বা ট্যাক্সির চালক, পার্কের পরিচর্যাকারী, জাদুঘরের কর্মী, প্রভৃতি। শুধু রোজগারের জন্য নয়, দেহ-মনের স্বাস্থ্য সতেজ রাখার জন্যও কাজে যুক্ত থাকা অবশ্যই দরকার।

সত্যিই কি বার্ধক্য সুখের সময়? প্লেটোর রিপাবলিক-এ সক্রেটিস এই প্রশ্ন করেন ধনী বৃদ্ধ সিফেলাসকে। উত্তরে সিফেলাস বলেন, যৌবনের যৌনতাড়না, অপরিমিত পান-ভোজনের ইচ্ছা থেকে মুক্তি যেন এক উন্মত্ত, নিষ্ঠুর প্রভুর দাসত্ব থেকে ছাড়া পাওয়া। “যারা সুভদ্র, সন্তুষ্ট, তাদের কাছে বার্ধক্য খুব ভারী বোঝা নয়।” সক্রেটিস অবশ্য তাঁর স্বভাবসিদ্ধ তীক্ষ্ণতায় ছুড়ে দেন দ্বিতীয় প্রশ্ন, সিফেলাসের সন্তোষের কারণ কি বার্ধক্য, না কি বিত্ত? এর উত্তরটিও ভারী সুন্দর দিয়েছিলেন সিফেলাস— দরিদ্রের কাছে বার্ধক্য কঠিন, কিন্তু মন যদি তৈরি না থাকে, তা হলে ধনীও বার্ধক্যে শান্তি পাবে না। তিক্ত, বিষণ্ণ বার্ধক্য চারিদিকে। আ ম্যান কলড অটো (২০২২) ছবিতে দেখা মেলে তেষট্টি বছরের এক খিটখিটে মানুষের, স্ত্রীকে হারিয়ে বাঁচার কোনও কারণ খুঁজে না পেয়ে যিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বার বার, আর কেবলই ব্যর্থ হন। শেষে প্রতিবেশী এক পরিবারের সঙ্গে হৃদ্যতা গড়ে ওঠায় তিনি ফিরে আসেন জীবনে। এই ছবি বদলাতে বয়স্কদের বিনোদন, ভ্রমণ, শরীরচর্চার বিশেষ সুযোগ তৈরি হচ্ছে, গড়ে উঠছে বৃদ্ধাবাস। এমনই তো কাম্য। দেশের সমাজ, অর্থনীতিকে সচল রাখতে যাঁরা সারা জীবন পরিশ্রম করেছেন, নিজের পছন্দ-অপছন্দ পিছনে রেখে সামনে রেখেছেন সংসারের প্রতি, কর্মস্থলের প্রতি কর্তব্যকে, তাঁদের অবসর যদি আনন্দময়, শান্তিময় হয়ে না-ওঠে, তা হলে কিসের দেশ, কিসের পরিবার? বৃদ্ধ-বৃদ্ধার হাসিমুখের ছবি হল সমাজের সার্থকতার ছবি।

তবু অগণিত প্রবীণের প্রধান ব্যাধি একাকিত্ব। মৃত্যুর বেশ কয়েক দিন পর একাকী বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার দেহ আবিষ্কার জাপানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দূষিত ঘর পরিষ্কার করা একটি আলাদা পরিষেবা হয়ে উঠেছে। ভারতের দ্রুত বাড়ছে বাড়ির অভ্যন্তরে সিসিটিভি বসানোর চল— প্রবাসে বসে ছেলেমেয়ে ফোনের পর্দায় লক্ষ রাখছে অশক্ত পিতা-মাতার উপরে। কাছাকাছি থেকে দেখশোনাও অবশ্য সহজ নয়। একাধিক বৃদ্ধ-বৃদ্ধার চিকিৎসা, পরিচর্যা, ওষুধের ভার যখন একটি রোজগেরে ব্যক্তির উপর এসে পড়ে, তখন সচ্ছল পরিবারও আবশ্যক নানা খরচের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হয়। সংসারের যা সমস্যা, দেশেরও তাই। ইটালি, ফ্রান্স, গ্রিস তাদের জিডিপি-র ১৩-১৫ শতাংশ খরচ করে পেনশনে। ভারতীয় রেলে যত কর্মী, পেনশন-প্রাপকের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি। একে ‘সঙ্কট’ বলে দাগিয়ে দেওয়া সোজা। অথচ, এ কি মানবসভ্যতার সাফল্যের উজ্জ্বলতম স্বীকৃতি নয়? দুর্ভিক্ষ, মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি যুঝতে মানুষ সফল হয়েছে বলেই বিশ্বের নানা দেশে আজ এত শতায়ু মানুষ। এই সাফল্য বিজ্ঞান-প্রযুক্তির। এখন ভিতরে-বাইরে চলছে অন্য লড়াই— বার্ধক্যকে কী করে করা যায় শান্তিময়, সুন্দর।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন