বিরাট কোহলি। ছবি: পিটিআই।
ব্যাটিং ধরন বদলে ফেলেছেন বিরাট কোহলি। বোলারদের চাপে ফেলার জন্য ইনিংসের শুরুতেই পাল্টা-আক্রমণের রাস্তা বেছে নিয়েছেন। গত রবিবার নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম এক দিনের ম্যাচের পর নিজেই এ কথা জানিয়েছেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। সফল হবেন কি কোহলি?
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৭ বছর খেলে ফেলার পরও কোহলি নিজেকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করছেন। নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম এক দিনের ম্যাচে ৯৩ রান করে কোহলি বলেছেন, “পরিস্থিতি যদি কিছুটা কঠিন হয়, তা হলেও আমি শুধু ক্রিজে টিকে থাকার চেষ্টা না করে এখন পাল্টা আক্রমণ করার ওপর জোর দিচ্ছি। হাত খুলে মারার জন্য খুব বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করার কোনও মানে হয় না।” প্রথম ২০ বলের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন কোহলি।
তাঁর খেলার ধরন আগে অন্য রকম ছিল। শুরুতে সময় নিতেন। শেষ দিকে রান তোলার গতি বাড়াতেন। তবে এটা পুরোপুরি মানতে নারাজ রবিচন্দ্রন অশ্বিন। শেষ কয়েকটি ম্যাচে কোহলির শুরু থেকে আগ্রাসনের অন্য রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রাক্তন এই স্পিনার। বলেছেন, “যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন তো বলব, বিরাট কিছুই বদলায়নি। তবে ও এখন ব্যাট করতে নেমে চাপ নিচ্ছে না। উপভোগ করছে। ছোটবেলায় যে ভাবে খেলত, সে ভাবেই খেলছে।”
ব্যাটিংয়ের ধরন কতটা বদলেছেন কোহলি, তার থেকেও বেশি তাৎপর্যের, তিনি ব্যাটিং উপভোগ করছেন। রবিবার ৯৩ বল খেলেছেন, বুধবার ২৯ বল খেললেন। দেখে মনে হচ্ছে মনের সুখে ব্যাট করছেন। ঠিক এই কথাটাই বলছেন মহম্মদ কাইফ। ৩৭ বছরের কোহলি ভারতের জার্সিতে আরও ৫-৬ বছর খেলবেন বলে মনে করছেন তিনি। ভারতের এই প্রাক্তন ক্রিকেটার বলেন, “বিরাটকে দেখে মনে হচ্ছে দিল্লির স্থানীয় লিগে খেলছে। কোনও তাড়াহুড়ো নেই। সতীর্থদের সঙ্গে মজা করছে। সারা ক্ষণ মুখে হাসি লেগে আছে। কিন্তু ব্যাট করতে নেমে আগ্রাসী ক্রিকেট খেলছে। এ ভাবে খেললে ভারতের হয়ে আগামী ৫-৬ বছর ও খেলবে।”
প্রস্তুতিতে খামতি রাখেন না বিরাট কোহলি। —ফাইল চিত্র।
এর উল্টো কথাও শোনা গিয়েছে। কোহলিকে খোঁচা মেরেছেন ভারতের আর এক প্রাক্তন ক্রিকেটার সঞ্জয় মঞ্জরেকর। তাঁর মতে, কঠিন ফরম্যাট থেকে অবসর নিয়ে ক্রিকেটের সবচেয়ে সহজ ফরম্যাট খেলছেন কোহলি। এই ফরম্যাটে রান করা বিশেষ কঠিন নয়। তিনি বলেন, “এক দিনের ক্রিকেটে যারা টপ অর্ডারে খেলে, তারাই কিন্তু টেস্টে মিডল অর্ডারে নামতে চায়। ভারতীয় ক্রিকেটে এই দৃশ্য খুব পরিচিত। কারণ, এক দিনের ক্রিকেটে শুরুতে চার স্লিপ ও গালিতে ফিল্ডার থাকে না। বোলার আউট করার থেকেও বেশি চিন্তা করে ওভারে যাতে ১০-১৫ রান না দেয়। তাই এই ফরম্যাটে রান করা আহামরি কিছু নয়।” মঞ্জরেকরের সঙ্গে সবাই একমত না হলেও সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় সহমত হবেন।
আধুনিক ক্রিকেট যে টেকনিকের থেকেও অনেক বেশি মানসিক, তেমনটাই মনে করেন ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার অরুণ লাল। তিনি বললেন, “বিরাট যে মানের ক্রিকেটার, তাতে যে কোনও সময়ে ও টেকনিকে বদল করতে পারে। সচিনকেও শেষ দিকে টেকনিকে বদল করতে দেখেছি। তা ছাড়া বিরাটের ফিটনেসও ভাল। কিন্তু ক্রিকেটে এখন মানসিক জোর অনেক বেশি লাগে। বিরাট এই মানসিকতা নিয়ে কত দিন খেলতে পারবে, তার উপরেই ওর সাফল্য নির্ভর করবে। তাই ও কত দিন খেলবে তা এখন বলা মুশকিল।”
৩৭ বছরের পরেও যে সফল হওয়া সম্ভব তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সচিন তেন্ডুলকর। ৪০ বছরে অবসর নিয়েছিলেন তিনি। শেষ তিন বছরে টেস্টে আট ও এক দিনের ক্রিকেটে চারটি শতরান করেছিলেন সচিন। টেস্টে তাঁর সর্বাধিক স্কোর অপরাজিত ২০০ রানও এসেছিল ৩৮ বছর বয়সে। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক স্টিভ ওয় ৩৮ বছর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন। তাঁরা প্রমাণ করে দিয়েছেন, সাফল্যের খিদে থাকলে বয়স শুধুই একটি সংখ্যা মাত্র।
অবশ্য গত ১০ বছরে ক্রিকেট অনেকটাই বদলে গিয়েছে। এখন শুধু প্রতিভা বা দক্ষতা থাকলে হয় না, সাফল্য পেতে প্রয়োজন ফিটনেস। ক্রিকেট, ফুটবলের মতো দলগত খেলা হোক, বা টেনিস, গল্ফের মতো ব্যক্তিগত খেলা, ফিটনেসের কোনও বিকল্প নেই। জোকোভিচ যে এখনও নিজের অর্ধেক বয়সিদের সঙ্গে পাল্লা দেন, বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, লিয়োনেল মেসিরা যে এখনও দলকে ট্রফি এনে দেন, তার প্রধান কারণ তাঁদের ফিটনেস। কোহলি সেটা আগেই বুঝেছিলেন। ভারতীয় ক্রিকেটে ফিটনেসের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন তিনি। এখনও ৫০ ওভার ফিল্ডিং করার পর আরও ৫০ ওভার ব্যাট করার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর।
তবে শুধু কি ফিটনেসে ভর দিয়ে সফল হওয়া সম্ভব? ভারতীয় ক্রিকেট দলের সঙ্গে কাজ করেছেন স্ট্রেংথ ও কন্ডিশনিং কোচ রণদীপ মৈত্র। তিনি বললেন, “বিরাটের ফিটনেস নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। ও চাইলে এখনও ৫ বছর খেলতে পারে।” তবে পাশাপাশি তিনি এ-ও জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত খেলা ও দলগত খেলায় বিষয়টি আলাদা। তাই কিছুটা হলেও সংশয় রয়েছে কোহলিকে নিয়ে। রণদীপ বললেন, “টেনিস বা গল্ফে কে কত বছর খেলবে সেটা সম্পূর্ণ তার উপরেই নির্ভর করে। জোকোভিচ কত বছর খেলবে সেটা ওর ইচ্ছা। কিন্তু বিরাটের ইচ্ছার উপর সবটা নির্ভর করে না। ওকে প্রথম একাদশে থাকতে হবে। স্বাভাবিক ভাবেই ২৫ বছর বয়সে ওর যা ফিটনেস ছিল সেটা এখন নেই। পাশাপাশি নতুন প্লেয়ার উঠে আসছে। তাই দলে বিরাটের কতটা প্রয়োজন সেটাও দেখতে হবে। ওকে কিন্তু প্রতিটা ম্যাচে প্রথম একাদশে ঢোকার জন্য লড়তে হবে। সেটা জোকোভিচদের করতে হবে না।”
অর্থাৎ, কোহলির সবচেয়ে বড় লড়াই তাঁর বয়সের বিরুদ্ধে। কয়েক মাস আগে যখন টেস্টে তিনি রান পাচ্ছিলেন না, তখন বার বার তাঁর অবসরের প্রসঙ্গ উঠছিল। অনেকে বলেন, খানিকটা বাধ্য হয়েই লাল বলের ক্রিকেট ছেড়েছেন তিনি। ২০২৭ সালের বিশ্বকাপে কোহলি খেলবেন কি না, তার নিশ্চয়তা প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর বা নির্বাচক প্রধান অজিত আগরকরও দেননি। বিশ্বকাপে খেলতে হলে ধারাবাহিক সাফল্য দেখাতে দেখাতে হবে তাঁকে। সেই কারণেই হয়তো নিজের টেকনিক বদলেছেন কোহলি।
ফিটনেস বিরাট কোহলির সাফল্যের বড় মন্ত্র। —ফাইল চিত্র।
৩৮ বছরের জোকোভিচ এখনও বিশ্বের তৃতীয় সেরা পুরুষ টেনিস খেলোয়াড়। ৩৭ বছরের কোহলি এক দিনের ক্রিকেটে বিশ্বের এক নম্বর ব্যাটার। বয়সকে টেক্কা দেওয়ার লড়াই লড়ছেন তিনি।
টেনিস খেলোয়াড়দের দীর্ঘক্ষণ একই রকম স্ট্যামিনা নিয়ে খেলতে হয়। ফলে তাঁদের অলরাউন্ড এয়ারোবিক ফিটনেস দরকার। কারণ, যে ক্ষিপ্রতায় তাঁদের খেলতে হয় এবং তিন-চার ঘণ্টা ধরে টানা দৌড়তে হয়, তার জন্য তাৎক্ষণিক শক্তির প্রয়োজন। অন্য দিকে, ক্রিকেটারদের যেহেতু তুলনায় অনেক কম দৌড়তে হয় এবং তাঁরা প্রতিটি বল বা ওভারের মঝে সময় পান, তাই তাঁদের দরকার ইন্টারমিটেন্ট ফিটনেস (থেমে থেমে কাজ করার ক্ষমতা)। তবে টেনিস খেলোয়াড়দের মতোই ক্রিকেটারদেরও কোর ও কাঁধের শক্তি প্রয়োজন। উইকেটের মাঝে দৌড়ানোর জন্য তীব্র গতির স্প্রিন্টও দরকার। আধুনিক ক্রিকেট এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের সামগ্রিক ফিটনেস দাবি করে।