—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
ডিজ়এবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার’ (ডিএএলওয়াই)-এর ধারণাটি আম ভারতীয়ের পরিচিত না-ও হতে পারে। শারীরিকই হোক বা মানসিক, যে কোনও রকম ‘অক্ষমতা’র কারণে বেঁচে থাকা অবস্থায় কিংবা অকালমৃত্যুতে এক জন মানুষের জীবন থেকে যে আনুমানিক সম্ভাবনাময় সময়কাল চিরতরে মুছে যায়, সেই বছরগুলির সমষ্টি হল ডিএলএলওয়াই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ভারতে জনসংখ্যার প্রতি দশ হাজারে ডিএএলওয়াই ২৪৪৩। ভারত সরকার এর কোনও রাজ্যওয়াড়ি হিসাব কষেছে কি না জানা নেই, কষেনি বলেই আন্দাজ করা যায়, কেননা ভারতীয় সমাজের মতোই রাষ্ট্রও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খুব উচ্চবাচ্য করে না, এই একুশ শতকেও না। এরই মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীরে সরকারি রিপোর্টেই উঠে এল তথ্য: উপত্যকার বাসিন্দা যুবসম্প্রদায়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ অবসাদের শিকার, বিষণ্ণতার উপসর্গ ৪১ শতাংশের মধ্যে। শ্রীনগরে ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেস কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন, গত কয়েক বছরে চিকিৎসার জন্য আসা ‘রোগী’র সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অনন্তনাগে সরকারি মেডিক্যাল কলেজেও ২০২০-২৫ সময়কালে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিষেবা ও চিকিৎসা পেয়েছেন প্রায় ৩ লক্ষ ৭০ হাজার মানুষ। স্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে বলছেন ‘নীরব মহামারি’।
কেন এই রোগ, তা অনুমান করা কঠিন নয়। যুদ্ধ, যুদ্ধ-পরিস্থিতি, সংঘর্ষ, রক্তক্ষয় নাগাড়ে চলতে থাকে যে দেশে বা অঞ্চলে, সেখানকার বাসিন্দাদের মানসিক স্বাস্থ্য হয়ে পড়ে দুর্বল ও ভঙ্গুর— পরীক্ষিত সত্য। ইউক্রেনে, গাজ়ায় একই পরিস্থিতি দেখা গেছে সম্প্রতি, আফ্রিকা মহাদেশের গৃহযুদ্ধ-পীড়িত নানা দেশেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস ঘাঁটলেও মিলবে তথ্য-প্রমাণ। জম্মু ও কাশ্মীরে সুদীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সন্ত্রাসের ইতিহাস নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই, কিন্তু তার দীর্ঘমেয়াদি ছাপ যে সেখানকার মানুষের মনে এখন অসুখ হয়ে হানা দিয়েছে, এই সত্যটি নতুন, এবং আতঙ্কের। যুবসম্প্রদায় এই অসুখে আক্রান্ত বেশি, কারণ উপত্যকার অশান্ত অতীত ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দুইয়েরই তাঁরা শিকার। ২০১৯-এ জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ হওয়ার আগে-পরে কখনও পুলওয়ামা, কখনও পহেলগাম কাণ্ড বুঝিয়ে দিয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি নেতা-মন্ত্রীদের বুক বাজিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরকে প্রকৃত ‘ভূস্বর্গ’ ঘোষণা কতটা অসার। আসল সত্য এই, পর্যটনের ভাসা-ভাসা সুযোগ-সুবিধাটুকু বাদ দিলে, এই অঞ্চলের প্রকৃত উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, আর্থিক সুরক্ষা থেকে জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজও হয়নি প্রায় কিছুই, অথবা এখনও অনেক বাকি। যে ভূখণ্ডে জনজীবন এখনও প্রতি পদে নিরাপত্তা বাহিনীর নজর-বন্দি, শরীর-তল্লাশি রোজকার অভিজ্ঞতা, সেখানে মনের মুক্তি হবে কোন পথে, কী করে!
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার জেরে ২০১২-৩০ সময়কালে ভারতের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১.০৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আজকের ভারতশাসকেরা মানসিক স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির যোগ সম্বন্ধে কতটা ওয়াকিবহাল তা অন্য প্রশ্ন, আপাতত যে মহামারি নীরবে ছড়িয়ে পড়ছে তাকে অবিলম্বে রুখতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের কাজটুকু পূর্ণ দায়বদ্ধতায় করে চলেছেন, কিন্তু ভারত সরকার কী করছে?
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে