Impatience

তাৎক্ষণিকের ফাঁদে

খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, আর্থ-সামাজিক, বৌদ্ধিক ও নান্দনিক অবস্থান-নির্বিশেষে, নানা বয়সের মানুষই এখন এই ধৈর্যহীনতার, কোনও একটি শিল্প-অভিজ্ঞতাকে যথেষ্ট সময় দিতে ব্যর্থ হওয়ার ‘অসুখ’-এ আক্রান্ত।

শেষ আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:৪৮
Share:

ধরা যাক, অপুর সংসার ছবিটা দেখতে বলে সিনেমার ক্লাসে মাস্টারমশাই পরে পড়া ধরলেন, এ ছবির একেবারে শেষে কী হয়? আজকালকার প্রশ্নপত্রের ধরনে হয়তো চারটে ‘অপশন’ও দিলেন; এক: কাজলের সঙ্গে তার পিসি দুর্গার দেখা হয়, দুই: অপু কাজলকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, তিন: মুক্তিযুদ্ধে অপু মারা যায় ও কাজল অনাথ হয়, চার: কাজল আমেরিকায় চলে যায়। এটুকু শোনা ইস্তক শিক্ষিত রুচিশীল শিল্পচর্চাকারী বাঙালিমাত্রেই হাঁ-হাঁ করে উঠবেন: বলিহারি প্রশ্ন বটে! ছবিটা কে না দেখেছে, সিনেমার ছাত্রছাত্রীরা তো আরওই মন দিয়ে দেখে থাকবে— এমন সব হাস্যকর উত্তরে কি তাদের বোকা ঠাওরানো হচ্ছে? ভারতের অবস্থা জানা নেই, তবে আমেরিকার নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যার শিক্ষকেরা কিন্তু অনুযোগ করছেন— সিনেমার ছাত্ররা এখন একটা গোটা সিনেমা বসে দেখতে পারছে না, অধৈর্য হয়ে যাচ্ছে, বারংবার মোবাইল ঘাঁটছে, এবং সহজতম প্রশ্নেরও উদ্ভট ভুল উত্তর দিচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা ব্যাপী দীর্ঘ ছবির কথা ছেড়েই দেওয়া যাক, এমন দেখা যাচ্ছে হরেদরে ১০০ মিনিটের ছবির ক্ষেত্রেও। সাদা-কালো ছবি, সাবটাইটল-সম্বলিত ছবি তাদের মন ও মগজ নিতে পারছে না; ক্লাসে বা প্রেক্ষাগৃহে এক সঙ্গে সিনেমা দেখার ক্ষেত্রেও আপত্তি: ‘ঘরে দেখে নেব’ বলেও দেখছে না, অথবা দেখছে ‘ফাস্ট ফরোয়ার্ড’ করে! বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্তৃপক্ষ মোবাইল-সহ বৈদ্যুতিন যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করছেন, আর যাঁরা তা পারছেন না তাঁরা আপস করছেন সিলেবাসে সিনেমার অংশবিশেষ দেখিয়ে ও অন্যতর পথে, নইলে ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকাররা ক্লাসেই আসছে না!

স্রেফ ‘জেন-জ়ি সমস্যা’ বলে দাগিয়ে দিলেই এর সুরাহা মিলবে না। খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, আর্থ-সামাজিক, বৌদ্ধিক ও নান্দনিক অবস্থান-নির্বিশেষে, নানা বয়সের মানুষই এখন এই ধৈর্যহীনতার, কোনও একটি শিল্প-অভিজ্ঞতাকে যথেষ্ট সময় দিতে ব্যর্থ হওয়ার ‘অসুখ’-এ আক্রান্ত। গতির এই যুগে সব কিছুই ছোট ও দ্রুত: প্রেক্ষাগৃহে সিনেমার পর্দার জায়গা নিয়েছে কয়েক ইঞ্চি স্ক্রিনের মোবাইল, এবং সেখানেও একটানা, আদি-মধ্য-অন্তবিশিষ্ট কোনও কিছু আগাগোড়া দেখার অভ্যাস পাল্টে গিয়েছে নিরন্তর স্ক্রোলিং ও শর্ট রিল-ভিডিয়ো দেখার প্রবণতায়। আর্ট গ্যালারিতে এক-একটি চিত্রকৃতি বা ভাস্কর্যকে আপনমনে সময় নিয়ে দেখার মানুষ কমছে, গানের রিয়ালিটি শো-এ প্রতিযোগীরা সচরাচর গোটা গানটুকুও গাইছেন না, বিরতি-সহ দু’ঘণ্টা চল্লিশ মিনিটের নাটক দেখতে গেলে দর্শক উসখুস করছেন। অথচ সময় মাপলে দেখা যাবে, সমাজমাধ্যমে এই মানুষরাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অল্প সময় ও স্বল্প দৈর্ঘ্যের ‘কনটেন্ট’ দেখে চলেছেন। অর্থাৎ, দীর্ঘ ও তুলনায় মন্থর কোনও কাজ, কিংবা মস্তিষ্ক সঞ্চালনা করতে হয় এমন কোনও শিল্প-অভিজ্ঞতায় আজকের মানুষেরা আকৃষ্ট হচ্ছেন কম; চোখের সামনে চটজলদি আনন্দ (বা দুঃখও) দিচ্ছে, এমন দৃশ্যশ্রাব্য অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠছে আলোচ্য, উদ্‌যাপনীয়।

এর সমাধান কোথায় সে কথা পরে, আগে সমস্যাটিকে ‘সমস্যা’ বলে স্বীকার করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় ও সিনেমার ছাত্রদের উদাহরণটিকে বৃহত্তর অর্থে বিচার করলে তা আজকের শিক্ষণ-ব্যবস্থাকে এক গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। শিক্ষা, বিশেষত উচ্চশিক্ষা একটি সময়সাধ্য, ধৈর্যলব্ধ প্রক্রিয়া; বিজ্ঞানই হোক কি কলাবিদ্যা, সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা উপসংহারে পৌঁছনোর পথটি সুদীর্ঘ, কষ্টপ্রদ, ক্লান্তিকরও। এই ক্লেশ ও ক্লান্তি, এই সময় ও শ্রম দান ‘শেখা’রই অঙ্গ, একে স্বীকার ও বরণ করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষালাভ করেছে। ‘যা চাই তা এক্ষুনি চাই’ বললে শিক্ষায় কাজ হয় না, রসায়নাগারে দু’টি বা ততোধিক রাসায়নিকের বিক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সময়টুকু না দিলে ভুল ফলাফল আসবে, ভুল শিক্ষা হবে। আবার, শিক্ষার পর্ব পেরিয়ে যে কোনও জীবনাভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও রসাস্বাদন একটা বড় ব্যাপার— প্রেমেই হোক কি শিল্পে, এক সঙ্গে অনেকটা পথ চললে, অনেকটা সময় দিলে তবেই শেষে মিলতে পারে বাঞ্ছিত ধন। সমাজমনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিকতা আজকের সভ্যতার একটা বড় ফাঁদ, তার এমনই একটা মোহ আছে যে অতি বুদ্ধিমান থেকে অবিমৃশ্যকারী সকলেই তাতে বাঁধা পড়ে যেতে পারেন, এবং এক বার তাতে জড়ালে জাল কেটে বেরিয়ে আসা মুশকিল। সিনেমার যে ছাত্রটি আজ একটা গোটা ছবি পর্যন্ত একলপ্তে দেখে উঠতে পারছে না, দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত ফিল্ম-অংশ দেখে পরীক্ষায় উতরাতে চাইছে, বৃহত্তর জীবনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কঠিন পরীক্ষায় সে বিপাকে পড়বে না, কে বলতে পারে!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন