কোনও নেশায় আসক্ত হওয়ার প্রাথমিক শর্ত কী? নেশার বস্তুটি কতখানি তীব্র, কতখানি আকর্ষক, অথবা পরিচিতদের মধ্যে সে নেশায় কত জন আসক্ত— এর কোনওটাই নয়। প্রথম শর্ত, নেশার দ্রব্যটির সহজলভ্যতা। পশ্চিমের দেশগুলিতে বিবিধ গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যে মহল্লায় ড্রাগ সহজে মেলে, সেখানে ড্রাগের নেশায় আসক্ত হওয়ার প্রবণতাও বেশি। ঠিক যেমন এক কালে কলকাতাতেই আফিমের নেশা বহুলবিস্তৃত ছিল, এখন অনেক কমে গিয়েছে— কারণ, এক কালে আফিম পাওয়া যেত সরকারি বিক্রয়কেন্দ্রে; আর এখন সে বস্তুটি নিষিদ্ধ, নেশা করতে হলে চোরাবাজার ভিন্ন উপায়ান্তর নেই। এ বার যদি প্রশ্ন করা হয়, এমন কোন নেশার দ্রব্য আছে, যা এখন কার্যত সবার কাছে বিনা বাধায় উপলব্ধ তো বটেই, অভিভাবকরা যা অবলীলায় নাবালক সন্তানের হাতে তুলে দেন— সে প্রশ্নের নির্বিকল্প উত্তর: মোবাইল ফোন। স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা জানাচ্ছে, মদ বা অন্যান্য নেশার দ্রব্য মগজের যে কার্যকারণ অনুসারে চলে, মোবাইল ফোনের নেশা (পরিভাষায়, প্রবলেমেটিক স্মার্টফোন ইউজ় বা পিএসইউ) বহুলাংশে সেই একই পথ অনুসরণ করে। দুই-ই কাজ করে মগজের রিওয়ার্ড সিস্টেমের মাধ্যমে, বিশেষত ডোপামিন পাথওয়ের মাধ্যমে। অন্যান্য নেশার মতোই মোবাইল ফোনের নেশারও উইথড্রয়াল সিম্পটম রয়েছে— নির্দিষ্ট সময় অন্তর নেশার খোরাক না-পেলে মানসিক ও শারীরিক অস্থিরতা কখনও কখনও অসহনীয় হয়ে উঠতে থাকে। সমস্যাটি কতখানি গভীর, সে বিষয়ে সামাজিক সচেতনতার এখনও ঘোর অভাব— অবশ্য, সচেতনতা ‘ক্রমে আসিতেছে’। অস্ট্রেলিয়ায় যেমন অনূর্ধ্ব ষোলো বছর বয়সিদের জন্য সমাজমাধ্যম ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হল এই জানুয়ারিতে। তবে, যত ক্ষণ না এই সচেতনতা পারিবারিক স্তরে আসছে, তত ক্ষণ অবধি রাষ্ট্রের ক্ষমতা সীমিত।
অন্য নেশার সামগ্রীর সঙ্গে অনলাইন দুনিয়ার একটি পার্থক্যও আছে— আর কোনও নেশার সাধ্য নেই নেশাড়ুর মন পড়ে নেওয়ার, মোবাইল ফোনের আছে। অ্যালগরিদমের চরিত্রই হল, যিনি যে ‘কনটেন্ট’ পছন্দ করেন, তাঁকে ক্রমাগত সেই ধরনের দৃশ্য-শ্রাব্য উপাদানের জোগান দিয়ে চলা। অবশ্য, নিরন্তর একই কনটেন্ট যে-হেতু একঘেয়ে হয়ে যায়, ফলে চেনা কনটেন্টের মধ্যে ঢুকে পড়ে অচেনা বিষয়বস্তুও। তার উপযোগিতা দ্বিমুখী— এক, তা একঘেয়েমি কাটায়; এবং দুই, সেই ‘বৈচিত্র’ থেকে তৈরি হয়ে যেতে পারে নতুনতর পছন্দের বিষয়, নতুনতর নেশা। সমাজমাধ্যম এই নেশার প্রধান আখড়া বটে, কিন্তু একমাত্র নয়। এমনকি ই-কমার্সের অ্যাপও নেশার উপাদান হয়ে উঠতে পারে। সেখানেও অ্যালগরিদম ক্রমাগত জোগান দিতে থাকে পছন্দের পণ্যের, এবং মাঝেমধ্যে নতুন পণ্যের। বস্তুত, ই-কমার্সের অ্যাপে নেশা আরও জমজমাট, কারণ এক দিকে সেখানে ‘সংঘাত’ নেই; আর অন্য দিকে, দ্রুত একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার উত্তেজনা আছে। কোনও পণ্যের ক্ষেত্রে ‘কেনা’ এবং ‘না-কেনা’, সিদ্ধান্ত মাত্র দু’টি— বেছে নেওয়ামাত্র মন পৌঁছে যায় সেই কাহিনির উপসংহারে, নেশার চূড়ান্ত পর্যায়।
মোবাইল ফোনের নেশার কাছে আত্মসমর্পণের একটা বড় কারণ হল, এই প্রক্রিয়াটি মূলত চালিত হয় মগজের স্বয়ংক্রিয় অংশ, মগজের ‘সিস্টেম ওয়ান’ দ্বারা। ফলে, এক বার মোবাইল ফোনের জগতে ঢুকে পড়লে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজটিও কার্যত স্বয়ংক্রিয়— আঙুল বুলিয়ে শুধু এক ছবি থেকে অন্য ছবিতে যাওয়া। আধুনিক জীবনের জটিলতা এবং নিরন্তর সংঘাত মস্তিষ্কের পরিশীলিত, বিবেচক ‘সিস্টেম টু’-কে ক্লান্ত করে রাখে— সেই ব্যবস্থাটি ছুটি চাইতে থাকে। মোবাইল ফোনের নেশা সেই ছুটির মোক্ষম পরিসর। এই নেশার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া কতখানি কঠিন, বিশ্বব্যাপী গবেষণায় তা ক্রমাগত স্পষ্ট হচ্ছে। মুক্তির প্রথম ধাপ, সমস্যাটিকে ‘সমস্যা’ হিসাবে চিহ্নিত করতে পারা। বোঝা যে, আপাতদৃষ্টিতে মোবাইল খোলা, স্ক্রিনে আঙুল চালানো, এমনকি কেনা না-কেনার সিদ্ধান্তও নিজের নেওয়া বলে মনে হতে পারে— কিন্তু, এ নেশা এমনই যে, সে বিষয়গুলির উপরেও অল্প দিনের মধ্যেই আর নিজের কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এবং, আর পাঁচটি নেশার মতো মোবাইলের নেশাও সেই অল্প দিনের মধ্যেই আর নতুন আনন্দের উপাদান থাকে না— তা হয়ে ওঠে নেশার অভাবে তৈরি হওয়া অসুবিধা দূর করার অপরিহার্য উপাদান। এই নেশা থেকে মুক্তির পথ খোঁজা প্রয়োজন। সবার আগে, শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দেওয়ার কু-অভ্যাসটি পরিত্যাজ্য।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে