Road Accidents

বড় অসুখ

কলকাতার পথ-দুর্ঘটনাগুলির মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট ধরন লক্ষ করা যায়। যেমন, দুই বাসে রেষারেষি; রাস্তায় নামার কথাই নয়, এমন বেহাল বাস বা ট্রাকের পথে নিয়ন্ত্রণ হারানো; ট্র্যাফিক সিগনাল অমান্য করা; মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো; হেলমেটবিহীন বাইক সওয়ারি, বা দু’চাকায় বিপজ্জনক কারিকুরি ইত্যাদি।

শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:০১
Share:

পরিসংখ্যান বলছে, অন্তত ২০ লক্ষ মানুষের বাস, ভারতে এমন ১৯টি শহরের মধ্যে পথ-দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কলকাতার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভাল। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে কলকাতায় পথ দুর্ঘটনায় হতাহতের মোট সংখ্যা ১১২৯— মৃত ২০৪, আহত ৯২৫। তুলনায়, সে বছর পথ দুর্ঘটনায় দিল্লিতে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৪৫৭ জন, বেঙ্গালুরুতে ৯১৫ জন, মুম্বইয়ে ৫০৩ জন। দুর্ঘটনার মোট সংখ্যা না দেখে প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যায় মৃত বা আহতের সংখ্যা, অথবা শহরের যান-ঘনত্বের অনুপাতে হতাহতের সংখ্যা বিচার করলে কলকাতার ছবিটি সামান্য মলিন হবে, তবে ক্রম-অবস্থান পাল্টাবে না। শহরবাসী এখানেই একটি আপাত-ধাঁধার সম্মুখীন হবেন— প্রায় প্রতি দিনই যেখানে সংবাদপত্রে কোনও না কোনও পথ-দুর্ঘটনার খবর মেলে, সেখানে পরিসংখ্যানের নিরিখে কলকাতার পথঘাটকে এমন নিরাপদ মনে হয় কোন যুক্তিতে? তার সহজ উত্তর— সাধারণ মানুষ সচরাচর গোটা বছরের দুর্ঘটনার সংখ্যা মনে করে যোগ করেন না; সাম্প্রতিক কালে যদি কোনও বড় মাপের দুর্ঘটনা ঘটে, তবে তার অভিঘাতে মনে হতে থাকে যে, বছরভর দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রচুর। আচরণবাদী অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই প্রবণতাটি অতিপরিচিত। ফলে, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এনসিআরবি-র পরিসংখ্যানকেই গ্রাহ্য করা বিধেয়। কিন্তু অন্য বড় শহরের তুলনায় কলকাতার পথ নিরাপদতর মানে এ কথা ধরে নেওয়ার কোনও কারণ নেই যে, শহরের রাস্তা সত্যই নিরাপদ— অতি মন্দের সঙ্গে তুলনা করলে মন্দকেও ভাল মনে হতে পারে, কিন্তু তা মন্দের মন্দত্ব ঘোচায় না।

কলকাতার পথ-দুর্ঘটনাগুলির মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট ধরন লক্ষ করা যায়। যেমন, দুই বাসে রেষারেষি; রাস্তায় নামার কথাই নয়, এমন বেহাল বাস বা ট্রাকের পথে নিয়ন্ত্রণ হারানো; ট্র্যাফিক সিগনাল অমান্য করা; মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো; হেলমেটবিহীন বাইক সওয়ারি, বা দু’চাকায় বিপজ্জনক কারিকুরি ইত্যাদি। ধরনগুলির মধ্যে দু’টি নির্দিষ্ট সূত্র রয়েছে— এক, দুর্ঘটনাগুলি ঘটেছে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে; এবং দুই, পুলিশ-প্রশাসন চাইলে এর প্রতিটিই রোধ করা যেত। তার জন্য প্রয়োজন নজরদারি, এবং যে কোনও গাফিলতির ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় প্রত্যাশার ভিত্তিতে— এবং, সেই প্রত্যাশা তৈরি হয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। মানুষ যদি চেনাপরিচিতদের মুখে নিয়মিত শুনতে থাকে যে, ট্র্যাফিক সিগনাল না-মানায় অনেকেরই মোটা জরিমানা হচ্ছে, অথবা রেষারেষি করায় দুই চালকের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে, অথবা হেলমেট ছাড়া বাইক চালালে সোজা থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা হলে প্রায় সবাই নিজের ক্ষেত্রে তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক হবে। এবং, সেই সতর্কতাই দুর্ঘটনা কমাবে।

কথাগুলি এমনই সরল যে, অনুমান করা চলে কলকাতা পুলিশও তা জানে। তবুও এই কাজগুলি করা হয় না কেন, সে প্রশ্নের একটি উত্তর হল পুলিশের স্বভাবগত আলস্য ও অপারদর্শিতা; কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় উত্তর হল, পুলিশ জানে যে, এ সবে কোনও লাভ হবে না। কাউকে ধরার সঙ্গে সঙ্গেই ফোন আসতে শুরু করবে দাদা-দিদিদের কাছ থেকে; এবং প্রায় ব্যতিক্রমহীন ভাবে অভিযুক্তকে ছেড়ে দিতে হবে। এই রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের সংস্কৃতি কলকাতাকে আইনভঙ্গকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে— এখন আর কার মাথায় রাজনৈতিক হাত আছে, সে বিচারেরও প্রয়োজন হয় না, সবার জন্যই ছাড়। বস্তুত, রাজ্যব্যাপী অবৈধ খাজনা আদায়ের মনসবদারি ব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গ হিসাবে যে কোনও অন্যায়কেই ছাড় দেওয়ার যে পাইকারি ব্যবস্থা পশ্চিমবঙ্গে চালু রয়েছে, রাজপথের অরাজকতা তার প্রত্যক্ষ ফসল। পথ দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে আসলে এই বড় অসুখের চিকিৎসা প্রয়োজন। প্রশ্ন হল, রাজ্যব্যাপী বিস্তৃত এই মনসবদারি ব্যবস্থা ভাঙার রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রশাসনের আছে কি?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন