ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম ক্রমশ নাগরিকত্ব ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের প্রক্রিয়া হয়ে উঠছে— এমন একটি আশঙ্কা ও আতঙ্ক গত কয়েক মাস ধরেই পশ্চিমবঙ্গকে ছেয়ে ফেলেছে। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে প্রমাণিত, সেই আশঙ্কা ও আতঙ্ক এখন কতটাই বাস্তব, কত ভয়ঙ্কর তার তাৎপর্য। এই রাজ্যে প্রায় আশি লক্ষ মানুষ এখন দাঁড়িয়ে আছেন ভোটার-পরিচিতি, এবং সম্ভবত, নাগরিকত্ব পরিচিতির পরীক্ষার মহাসমুদ্রসমান অনিশ্চয়তার তীরে। চূড়ান্ত তালিকা বার করার সময়ের দ্বারপ্রান্তে এসেও নথিপত্র পরীক্ষার অর্ধেকও শেষ করে উঠতে পারেনি নির্বাচন কমিশন— অথচ দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার থেকে কমিশন নিয়োজিত বঙ্গপুত্র স্পেশ্যাল অফিসার সকলেই একনাগাড়ে বলে চলেছেন, কাজ নাকি সন্তোষজনক ভাবে এগোচ্ছে এবং যথাসময়ে তা শেষ করা যাবে। সত্যমিথ্যা বিবাদভঞ্জন হতে আর মাত্র তিনটি রাতই বাকি, বৃথা বাক্যবিস্তারে কী লাভ। তবে, একটি সতর্কবাণী পশ্চিমবঙ্গের জনস্বার্থে এখনই স্পষ্ট উচ্চারণ করা জরুরি। কোনও এক জন মানুষেরও বৈধ অধিকার যদি পদদলিত হয়, কোনও এক জন বৈধ ভোটারের নামও যদি বাদ পড়ে এই অগ্রপশ্চাৎবিবেচনাহীন কমিশনের দৌরাত্ম্যে— তা হলে সমগ্র রাজ্য, দেশ এবং বিশ্ব জানবে যে পশ্চিমবঙ্গের এ বারের ভোট সংঘটিত হতে চলেছে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। বাস্তবিক, অগণতান্ত্রিকতা আর নির্বাচন— দুই-ই যে হাতে হাত মিলিয়ে দিব্য চলতে পারে, তার প্রমাণ অনেক, বিশেষত সীমান্তপারের প্রতিবেশী দেশটি নিয়ে অনেক ভারতীয়েরই অনেক নিন্দামন্দ ব্যঙ্গবিদ্রুপ। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়লে কিন্তু বলতেই হবে, এখানেও এ বার এক অ-গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চলছে। কেবল জাতীয় নির্বাচন কমিশন নয়, ভারতীয় রাষ্ট্রকে সেই দায় স্বীকার করতে হবে। এবং স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে তা মাইলফলক হিসাবে খোদিত হবে।
প্রসঙ্গত, এসআইআর শুরুর সময় থেকেই শোনা গিয়েছে যে, কোনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়বে না, কেবল রাজ্য-জোড়া ‘অসংখ্য, অগণিত’ রোহিঙ্গা ও অন্যান্য অনুপ্রবেশকারীকে (কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বকৃত-ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অবৈধ মুসলমান অভিবাসীদের) বাদ দেওয়ার জন্যই এই প্রক্রিয়া। এখন প্রশ্ন করার সময় এসেছে— যাঁদের নাম বাদ পড়তে চলেছে, তাঁরা সকলেই রোহিঙ্গা তো? যে মুসলমানদের নাম বাদ পড়ছে, তাঁরা অবৈধ বলে প্রমাণিত তো? ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ নামক জালে অন্যবিধ দুর্ঘটনা ঘটেনি তো? এর উত্তরের দায় থেকে কিছুতেই নির্বাচন কমিশন মুক্ত হতে পারে না। সমধিক জরুরি— ঠিক সময়ে, প্রদত্ত তারিখের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ করে এ রাজ্যকে দুঃস্বপ্ন-পর্ব থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া। সেই দায়িত্ব থেকেও কমিশন ছাড় পেতে পারে না। নির্দিষ্ট সময়ে তা সম্পূর্ণত শেষ করার জন্য একান্ত জরুরি, রোহিঙ্গা-অনুপ্রবেশকারীর জালে বৈধ ভোটারদের না জড়িয়ে যাচাই-পর্বে বাস্তবোচিত নমনীয়তা দেখানো। নতুবা সময়সীমা অতিক্রান্ত হবে, এবং রাজ্যকে আরও ভয়ঙ্কর সমস্যায় ঠেলে দেওয়া হবে।
সমগ্র এসআইআর প্রক্রিয়া যে ভাবে চালানো হয়েছে— সঙ্গত বিবেচনা ছাড়া, প্রতি মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে, কৌশলের পরিভাষায় যাকে ‘শিফটিং গোলপোস্ট’ বলে, সেই পদ্ধতিতে, নির্দেশ ও আদেশের অস্পষ্টতা ও অস্বচ্ছতা রেখে— তার থেকে একটিই সিদ্ধান্ত সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গের উপর একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বৈরাচার চলছে। অথচ বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেস, প্রতি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা অর্জন ও ধারণের একটিই গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক শর্ত থাকতে পারে— গণতান্ত্রিক নির্বাচন। সব বৈধ ভোটারকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দেওয়াই তার প্রথম ও প্রধান শর্ত। সেই শর্ত থেকে যাতে এই রাজ্য ভ্রষ্ট না হয়, তা এ দেশের প্রতিষ্ঠানসমূহকেই নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে