ED Raid at I-PAC Office

উদ্বেগ-চিত্র

এই দুই মামলার শুনানি শুরু হলে উঠে আসতে পারে কতগুলি বিস্ফোরক প্রশ্ন।

শেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৬
Share:

ফাইল হাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

গত সপ্তাহান্তে, আরও এক বার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমগ্র দেশের রাজনৈতিক চিত্রপটের মুখ্য কেন্দ্র হয়ে উঠলেন। এক ধাক্কায় কলকাতা থেকে দিল্লি— সর্বত্র নাটকীয় দৃশ্যপট তৈরি হয়ে উঠল তাঁকে ঘিরে। ঘটনাবলি ইতিমধ্যে সর্বজ্ঞাত— আইপ্যাক সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে ও অফিসে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি-র আকস্মিক তল্লাশি, সংবাদ পেয়ে অকুস্থলে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর আবির্ভাব, তার পর নিজের হাতে কিছু ফাইল নিয়ে বেরিয়ে আসা। টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরে এই কুনাট্য— ঘটনাবহুল ভারতীয় রাজনীতিতেও এর তুল্য দৃশ্যপট দুর্লভ। পরের দিন দিল্লিতেও উচ্চপর্দার নাটিকা। প্রতিবাদকারী তৃণমূল কংগ্রেসের নেতানেত্রীদের রীতিমতো চ্যাংদোলা করে আটক করার ছবি ইতিমধ্যে দেশময় প্রচারিত। বলা বাহুল্য, এমন দৃশ্যাবলি গৌরবজনক নয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের কাজের যে যুক্তিই দিন না কেন, একটি বেসরকারি সংস্থার তল্লাশির সময় উপস্থিত হয়ে কেন্দ্রীয় সংস্থার নির্দেশ অমান্য করে সেখানে প্রবেশ করা— একটি বড় মাপের দুর্নীতি-দৃষ্টান্ত হয়ে রইল, বিশেষত তিনি যখন এমন কাজ এই প্রথম বার করছেন না। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের অফিসে সিবিআই তদন্তে একই ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল তাঁকে। অর্থাৎ, পদাধিকারবলে এমন আকস্মিক অভিযান তাঁর রাজনীতির অভিজ্ঞান, যা গণতন্ত্রের নিরিখে অবাঞ্ছিত। আপাতত হাইকোর্টে দুটি মামলা, ইডি-র মামলা মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে, এবং রাজ্য সরকার ও আইপ্যাকের তরফে মামলা ইডি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে।

এই দুই মামলার শুনানি শুরু হলে উঠে আসতে পারে কতগুলি বিস্ফোরক প্রশ্ন। যেমন, কেন ইডি-র এমন তল্লাশির আগে নিয়মমাফিক স্থানীয় পুলিশকে অবহিত করা হয়নি। পাঁচ বছর পর, বিধানসভা নির্বাচন যখন সমাসন্ন, কেন ঠিক সেই সময়টিই বেছে নেওয়া হল ইডির হাওয়ালা তল্লাশির জন্য, যখন ২০২২ সালের পর এ বিষয়ে আর কোনও অগ্রগতি হয়নি। স্বভাবতই, নাগরিক সমাজে প্রশ্নচিহ্ন ঘুরে চলেছে, ইডি অভিযান কি পাঁচ বছর আগের কয়লা পাচারের মামলার জন্যই, না কি ভোটের আগে তৃণমূল-নিয়োজিত সংস্থা আইপ্যাকের কাছ থেকে অন্য কোনও তথ্য বাজেয়াপ্ত করার লক্ষ্যে। ইডির কব্জা থেকে মুখ্যমন্ত্রী যে সকল ফাইল ‘রক্ষা’ করেছেন বলে শোনা গিয়েছে, সেগুলিই বা কী। কী সেই বিষয়, যা বাঁচানোর জন্য স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকে সব কাজ ফেলে তড়িঘড়ি একটি বেসরকারি সংস্থার দরজায় ছুটে আসতে হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবিমতো তা যদি নিছক দলীয় তথ্য হয়, তবে তাতে আদৌ কেন ইডি-র আগ্রহ থাকবে, সেটাও বড় প্রশ্ন বইকি।

এই কুনাট্য দেখিয়ে দেয়, পশ্চিমবঙ্গ এখন কত বড় সাঁড়াশি সঙ্কটে গ্রস্ত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যকলাপের ধারাবাহিক অনৈতিকতা যেমন ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত, ইডি তথা কেন্দ্রীয় সরকারের কাজকর্মেও যুক্তরাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার প্রভূত আশঙ্কা। গত এক দশকে সিবিআই এবং ইডি-র মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সি বারংবার সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক দলস্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হতে দেখা গিয়েছে। গত মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট ইডির মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার বিষয়ে বিজেপি সরকারকে সতর্ক করেছে। দশ বছরে ইডি-র তল্লাশির পরিমাণ বেড়েছে ৫০ গুণ, যার প্রায় সবই বিরোধী রাজনীতিক বা বিরুদ্ধভাবাপন্ন গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে সংঘটিত। বিজেপি-শাসিত রাজ্যে বহু দুর্নীতি দুরাচার সত্ত্বেও এমন পদক্ষেপ দেখা যায় না। ফলত সঙ্কট এখন দুই স্তরে। শক্তিশালী কেন্দ্র ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তা তীব্র আশঙ্কাজনক। আবার রাজ্য সরকারের শীর্ষনেত্রী সমস্ত প্রশাসনিক রীতিনীতি ভেঙে নিজ হাতে নৈরাজ্য সৃৃষ্টি করলে, যুগপৎ রাজ্য ও দেশের জন্য তা আতঙ্ককর। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক কুনাটিকার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার তাই অতীব জরুরি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন