মূর্তি ও ভাবমূর্তির মধ্যে তফাতটি প্রভাব বিস্তারের মাত্রার। ব্যক্তিই হোক বা প্রতিষ্ঠান, যার প্রভাব সর্ববিস্তারী তার প্রত্যক্ষ রূপটি সর্বাঙ্গসুন্দর না-হলেও ভাবমূর্তিকে হয়েউঠতে হয় নিষ্কলঙ্ক; অন্যথা হলেই বিপদ। সে বিপদ যে কত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে তা সম্প্রতি বুঝেছে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের অধীন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এনসিইআরটি— অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য তাদের তৈরি সমাজবিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ে ‘আমাদের সমাজে বিচারব্যবস্থার ভূমিকা’ অধ্যায়টি পড়ে সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে শুধু এনসিইআরটি-কর্তৃপক্ষকে তলবই করেনি, সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে মুদ্রিত বইটির সব কপি বাজার থেকে তুলে নিতে বলেছে, নতুন কমিটি গড়ে তাদের তত্ত্বাবধানে নতুন করে অংশটি লিখতে বলেছে, সর্বোপরি যে তিন লেখক ওই ‘বিতর্কিত’ অধ্যায়টি লিখেছিলেন, ভবিষ্যতে তাঁদের সমস্ত সরকারি শিক্ষা-প্রকল্প বা ওই ধরনের কাজ থেকে বিযুক্ত করতে নির্দেশ দিয়েছে।
বিতর্কিত অধ্যায়টিতে দেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে সমালোচনার সুর ছিল; দেশের আদালতগুলিতে জমে থাকা পাহাড়প্রমাণ মামলা, এমনকি বিচারব্যবস্থায় দুনীর্তির কথাও লেখা হয়েছিল। শীর্ষ আদালতের মতে এই সবই পরিকল্পিত ভাবে ভারতের বিচারব্যবস্থার অসম্মান, উপরন্তু তা পড়ে অল্পবয়সি স্কুলশিক্ষার্থীদের মনে দেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব তৈরি হবে। এ নিয়ে কোনও সংশয় থাকতে পারে না যে, আজকের ভারতে গণতন্ত্রের অন্য দুই স্তম্ভ প্রশাসন ও আইনব্যবস্থা যেখানে প্রতি পদে বিতর্ক, আপস ও অসঙ্গতির জন্ম দিয়ে চলেছে, তৃতীয় স্তম্ভ বিচারব্যবস্থাই সেখানে মানুষের চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ ভরসাস্থল; গণতন্ত্র, সংবিধান, ‘আইনের শাসন’-এর রক্ষক হিসেবে তার সাম্প্রতিক ও সর্বকালীন ভূমিকাও সকলের বিলক্ষণ জানা দরকার— বিশেষ করে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী তথা ভবিষ্যতের নাগরিকদের। বর্তমান ভারতশাসকদের হাতে পড়ে স্কুলপাঠ্য বইয়ের কী দশা হয়েছে তা সবার জানা: ইতিহাস বইয়ে মোগল তথা ইসলামি যুগ সম্পর্কে নাগাড়ে অসত্য ও একপেশে লেখা, বিজ্ঞান-পাঠ্যে ডারউইনের বিবর্তনবাদের মতো জরুরি অধ্যায় নিয়ে কাটাছেঁড়া, ভূরি উদাহরণ মিলবে। আদালতের পর্যবেক্ষণ বা রায় রাজনৈতিক দল তথা সরকারের বিরুদ্ধে গেলে নেতা-মন্ত্রী বা তাঁদের উপদেষ্টা পর্যন্ত যখন সরাসরি বিচারব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলতে বাদ রাখছেন না, সেই পরিস্থিতিতে স্কুলের পাঠ্যবইয়ে বিচারব্যবস্থার কর্মমূর্তি ও ভাবমূর্তি দুই-ই টেনে নামানো ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য সুখবর নয়, বরং দুর্ভাগ্যের।
এর পরেও দু’-একটি প্রশ্ন থেকে যায়, শীর্ষ আদালতের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান রেখেই সেগুলির উত্থাপনও জরুরি। এনসিইআরটি-র সংশ্লিষ্ট গ্রন্থলেখকদের বিরুদ্ধে আদালতের কড়া পদক্ষেপে ‘অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা’র বিস্তার ও সীমারেখা নিয়ে বিদ্যাচর্চার পরিসরে প্রশ্ন ওঠা অসঙ্গত নয়। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে বিচারব্যবস্থার মতো ওজনদার বিষয় কী ভাবে, কতটা লেখা হবে বা লেখা যাবে তা অতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, পাশাপাশি তাতে সমালোচনার তিলমাত্র থাকবে না বা রাখা চলবে না, তা-ও কি বাঞ্ছনীয়? ভারতের আদালতগুলিতে মামলার স্তূপ অপ্রিয় হলেও সত্য। বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতির প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর নিশ্চয়ই, কিন্তু গত বছর বিচারপতির বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধারের মতো ঘটনাও তো বাস্তব সত্য। প্রতিটি ব্যবস্থা বা ‘সিস্টেম’-এরই আছে নিজস্ব খামতি, ব্যর্থতাও— তা সামলে বা অতিক্রম করে কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কী ভাবে বৃহত্তর কল্যাণপথে উত্তীর্ণ হচ্ছে, তা যুক্তি-বিচার সহকারে দেখা ও বোঝা-ই তো প্রকৃত শিক্ষা। ভারতীয় বিচারব্যবস্থার একটি উদার ও মহৎ ভাবমূর্তি ভারতবাসীর মনে এখনও প্রতিষ্ঠিত। বিদ্যালয়স্তরে পাঠ্যবইয়ের বিশ্লেষণে তা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে