Public Harassment of Accused

বন্ধ হোক

গণতন্ত্রে তো বটেই, কোনও সভ্য সমাজেও এ জিনিস চলতে পারে না, এমনকি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের যথেষ্ট ও সঙ্গত কারণ থাকলেও।

শেষ আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ ০৬:৩৪
Share:

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

মাথা মুড়িয়ে, ঘোল ঢেলে, গাধার পিঠে চড়িয়ে গ্রামের সীমানার বাইরে দোষীকে বার করে দেওয়ার কথা লেখা থাকত রূপকথার শেষে। সেটাই ছিল চরমতম সামাজিক অপমান, প্রকাশ্য লাঞ্ছনার শেষ কথা। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে সেই রূপকথাই যেন সত্যি হয়ে উঠেছে— প্রায় প্রতি দিনই খবরে উঠে আসছে কোথাও না কোথাও, কোনও না কোনও অভিযুক্তের উপরে উগ্র ক্রুদ্ধ জনতার চড়াও হওয়ার খবর। ডিম ছোড়া, চড়-থাপ্পড় ও ধাক্কা মারা, অকথ্য গালিগালাজ তো চলছেই, তদুপরি উঠছে জনতার হাতে অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি— আইন ও শাস্তি তাঁরাই বুঝে নেবেন, এই তর্জন। সমাজমাধ্যমে যে ছবি ও ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ছে তা দেখে শিউরে উঠতে হয়, এই সম্মিলিত হিংসা আর একটু মাত্রা ছাড়ালেই চরম দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়া অমূলক নয়। আরও উদ্বেগের কথা, এই সবই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘটছে পুলিশ, আধাসেনা, নিরাপত্তাকর্মী বা কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে, এবং তাঁরাও সেখানে প্রায় নীরব দর্শক। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশই অভিযুক্তকে কোমরে দড়ি পরিয়ে, অন্তর্বাস পরা অবস্থায় জনসমক্ষে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে; মানুষের ক্রোধ যাতে সহজেই তার লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পায় তা নিশ্চিত করতেই হয়তো।

এই পরিস্থিতি শুধু দুর্ভাগ্যেরই নয়, অত্যন্ত উদ্বেগ ও আতঙ্কেরও। গণতন্ত্রে তো বটেই, কোনও সভ্য সমাজেও এ জিনিস চলতে পারে না, এমনকি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের যথেষ্ট ও সঙ্গত কারণ থাকলেও। ‘জনরোষের বহিঃপ্রকাশ’ বলে এই অরাজকতাকে এক রকমের মানসিক ও সামাজিক বৈধতা দেওয়া চলছে, সমাজমাধ্যমে উল্লসিত সমর্থন ও ক্রমাগত ইন্ধন জোগানোও চোখে পড়ছে। মনে রাখা দরকার, গণতন্ত্র দাঁড়িয়ে থাকে যে আইনের শাসনের উপরে, এই আচরণ তার পরিপন্থী। তদুপরি, অভিযুক্তের বিচার করার ভার যে জনতার নয়, তার জন্য নির্দিষ্ট এক বিচার কাঠামো, প্রক্রিয়া-সহ সামগ্রিক বিচারব্যবস্থাও এ রাজ্যে ও দেশে রয়েছে, এ কথাও বিস্মৃত হওয়া চলে না। এখানেই এসে পড়ে প্রশাসন তথা সরকারের দায়িত্বের প্রশ্নটিও। রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন সরকার গঠনও সম্পন্ন, পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক সুস্থিতি ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাই এখন হওয়া দরকার প্রথম ও প্রধান কাজ। অথচ গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রাজ্যের নানা প্রান্তে উন্মত্ত জনতার তাণ্ডব যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা ঘটছে পুলিশ-প্রশাসনের নাকের ডগায়। বিপুল জনসমর্থনে ভর করে ক্ষমতায় আসা দল জনতার একাংশের বিশৃঙ্খলা সামলাতে পারছে না— এ কি সরকারি সামর্থ্যের অভাব না কি সদিচ্ছার, এমন পরিস্থিতিতে এই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।

এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন উপযুক্ত পদক্ষেপ করবে, প্রয়োজনে কঠোর হবে, এমনটাই এই মুহূর্তে প্রত্যাশিত। স্বাধীনতার আগে ও পরে, অদ্যাবধি পশ্চিমবঙ্গ কম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখেনি। এ রাজ্যে জমানা-নির্বিশেষে রাজনৈতিক দুষ্কৃতীদের দাপট দেখা গেছে, কিন্তু রাজনীতির ইন্ধনে উন্মত্ত ও হিংস্র জনতার এমন দাপাদাপি বিরল ঘটনা। অচিরেই পদক্ষেপ করা না হলে এই বিশৃঙ্খলা রাজনীতি ছাপিয়ে সমাজজীবনেও এসে পড়বে। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, বিহার-সহ ভারতের নানা রাজ্যে এমন অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিনিয়ত প্রচারমাধ্যমে উঠে আসছে— এক বা অনেক মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, সামাজিক মেলামেশা, উৎসব-অনুষ্ঠান ইত্যাদির কিছু একটা পছন্দ না হলেই তাদের বিরুদ্ধে চড়াও হচ্ছেন অনেক মানুষ, শারীরিক হেনস্থা, হুমকি, ঘরবাড়ি-দোকানপাট ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া, মানসিক অত্যাচার থেকে প্রাণহানি, কিছুই বাদ যাচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার অদূরেই অতি সম্প্রতি দেখা গেছে, বিবদমান ছাত্রদের বচসার সূত্র ধরে উগ্র জনতা বিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বার ভেঙে হইহই করে ঢুকে পড়ছে ভিতরে। সুস্থ ও সভ্য সমাজের স্বার্থে এই অরাজকতা-তন্ত্র এখনই বন্ধ করতে প্রশাসন সক্রিয় হোক।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন