Attack on Abhishek Banerjee

চক্রবৎ

দলীয় সমর্থকদের হরেক অন্যায়কে তৃণমূলনেত্রী ‘ছোট ঘটনা’ হিসাবে দেখিয়েছেন, গুরুত্ব দেননি। প্রশাসনও সেই রাজনৈতিক নির্দেশ পালন করেছে অক্ষরে অক্ষরে।

শেষ আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ ০৭:৫৩
Share:

গণতন্ত্রের পরিসরে কোনও অবস্থাতেই, কারও প্রতিই, হিংসা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বহু ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়, কিন্তু ক্ষমতার প্রবল প্রতাপের বিরুদ্ধে তার প্রকাশের পথ থাকে না— আগের জমানার প্রভাবশালী রাজনৈতিক পালাবদলের পরে যখন ক্ষমতাহীন হন, তখন মানুষ আগের হিসাব বুঝে নিতে চান। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেও সে ঘটনাই ঘটেছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা চলতে পারে। কিন্তু, বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান নেতা প্রকাশ্যে আক্রান্ত হলে বিনা অজুহাতে সে ঘটনার নিন্দা করা প্রশাসনের কর্তব্য। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, কোনও অবস্থাতেই এমন হিংসা চলতে পারে না। এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, এবং দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মনে রাখা বিধেয় যে, তাঁদের দল ক্ষমতায় থাকাকালীন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ অন্যরা কী কী করেছিলেন, সে সব কথাই গুরুতর, এবং অবশ্য-বিবেচ্য— কিন্তু, সেই যুক্তি দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে আক্রমণকে ন্যায্য বা নিদেনপক্ষে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করার যে কোনও চেষ্টা বর্জনীয়। গণতন্ত্রে নৈরাজ্যের কোনও স্থান নেই। দেশের আইন যে সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, এই কথাটি বিক্ষুব্ধ জনতাকেও বুঝতে হবে— এবং, তা বুঝিয়ে বলার দায়িত্ব সরকার ও প্রশাসনের উপরে বর্তায়। বস্তুত, বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান নেতার উপরে যদি এ-হেন আক্রমণ ঘটে, তবে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করতে পারেন যে, অবস্থার সুযোগ নিয়ে বর্তমান শাসকরা অতীত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছেন। এমন অভিযোগ যাতে না ওঠে, কোনও অবস্থাতেই যাতে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার গণ্ডি লঙ্ঘিত না হয়, তা নিশ্চিত করাই রাজধর্ম।

এ কথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে, তাদের শাসনকালে তৃণমূল কংগ্রেস এই রাজধর্ম পালনের চেষ্টামাত্র করেনি। দলীয় সমর্থকদের হরেক অন্যায়কে তৃণমূলনেত্রী ‘ছোট ঘটনা’ হিসাবে দেখিয়েছেন, গুরুত্ব দেননি। প্রশাসনও সেই রাজনৈতিক নির্দেশ পালন করেছে অক্ষরে অক্ষরে। সুদীপ্ত গুপ্ত নামক যুবকের কথা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মরণে না-ও থাকতে পারে— নামটি যখন সংবাদ শিরোনামে এসেছিল, অভিষেক তখন রাজনীতিতে নবাগত। কিন্তু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিলক্ষণ মনে পড়বে, সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে এসে প্রাণ হারিয়েছিলেন যুবক। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু প্রকৃত শোকপ্রকাশের সৌজন্য দেখাননি। তাঁদের জমানায় ক্ষমতা হারানো বহু বাম নেতাকে হেনস্থা হতে হয়েছিল স্থানীয় স্তরে— তখনও তাঁরা রাজধর্মের কথা স্মরণ করেননি। ফলে, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে যে অমানবিকতার অভিযোগ ভূতপূর্ব মুখ্যমন্ত্রী করেছেন, সেই একই অভিযোগ তাঁর জমানার সম্বন্ধেও প্রযোজ্য। বস্তুত, বহু গুণে প্রযোজ্য, কারণ তিনি দীর্ঘ দেড় দশক সময় পেয়েছিলেন রাজধর্ম অনুশীলনের জন্য, কিন্তু সে পথে হাঁটার উদ্যোগমাত্র করেননি। তাঁর অভিযোগও ঠিক সেই কারণেই বড় অন্তঃসারশূন্য শোনাচ্ছে।

কিন্তু, আরও এক বার বলা প্রয়োজন যে, তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায় রাজধর্ম অনুশীলনের অভাব বর্তমান জমানাকেও সেই একই পথে হাঁটার অনুমতি দেয় না। বরং, এই উদাহরণটিকে একটি শিক্ষণীয় মুহূর্ত হিসাবে দেখা সম্ভব— মাত্র কয়েক দিন আগে অবধিও যাঁরা রাজ্যের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ছিলেন, আজ তাঁরাই ক্ষমতার অক্ষের দুর্ভাগ্যজনক প্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আজ যাঁরা ক্ষমতায়, গণতন্ত্রের চাকার ঘূর্ণন এক দিন তাঁদেরও সেখানেই নিয়ে যাবে। সময়ের ধর্মই এই। এই পরিস্থিতি পাল্টানোর দায়িত্ব সবারই, কিন্তু যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, পাল্টানোর সুযোগ তাঁদের বেশি। রাজধর্ম অনুশীলনের কাজটি শাসককেই করতে হয়। রাজনৈতিক অভ্যাস পাল্টাতে সময় লাগে ঠিকই, কিন্তু অভ্যাস পাল্টায়ও বিলক্ষণ। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখন প্রবল রকম দূষিত। তার শোধনের কাজটি এখনই শুরু হোক।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন